২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাশিয়ার পুনরুত্থান

  • এনামুল হক

রাশিয়ার পুনরুত্থান ঘটেছে। এক নতুন শক্তি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে দেশটি। এই পুনরুত্থানের সূচনা ঘটেছে ২০১৪ সালের মার্চ মাসে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া দখলের মধ্য দিয়ে। তারপর গত ৩০ সেপ্টেম্বর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশারের পক্ষ নিয়ে সেখানকার আইএস ঘাঁটিগুলোতে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে রাশিয়ার পেশীশক্তির আরেক প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। বিশ্ব দাবার বোর্ডে নিজের সামরিক শক্তিকে কৌশলে ছড়িয়ে দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। আর তাতে শঙ্কার ছায়া পড়েছে পেন্টাগনের চেহারায়। প্রমাদ গুনছে ওয়াশিংটন।

তেমনটা হবে না-ই বা কেন। রাশিয়া সিরিয়ায় বাশার বিরোধীদের ওপর হামলা চালানোর জন্য শুধু যে যুদ্ধবিমান ও অস্ত্র পাঠিয়েছে তা-ই নয়, ৯শ’ মাইল দূরে কাস্পিয়ান সাগরে মোতায়েন তার নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ থেকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও ছুড়ে মেরেছে। এর পাশাপাশি পুতিন আইসিসের ওপর গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের জন্য ইরান, ইরাক ও সিরিয়ার সঙ্গে চুক্তিও সম্পাদন করেছেন, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নয়।

এটাই শেষ কথা নয়। অস্ত্রশস্ত্র ফেরিতেও নেমে পড়েছে রাশিয়া। অস্ত্র বিক্রি করছে মিসর, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে। আফগানিস্তান এখন রুশ আর্টিলারি ও হেলিকপ্টার গানশিপ চাইছে। এ অবস্থায় ওবামা আফগানিস্তানে এখনও যে ৯৮০০ মার্কিন সৈন্য রয়ে গেছে তাদের প্রত্যাহার মন্থর করে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রুশ নৌবাহিনী সাগর তলদেশে চষে দেখছে ইন্টারনেট কেবলগুলো। তা থেকে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে যে বিশ্ব উত্তেজনা তুঙ্গে উঠলে রুশরা একদিন এই কেবলগুলো কেটে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। তাতে করে বিশ্বব্যাপী দৈনিক যে ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসাবাণিজ্য চলছে তা বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে এবং সম্ভবত মার্কিন সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে দাঁড়াবে।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার নয়া ভূমিকাই আমেরিকাসহ পাশ্চাত্যকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলেছে। পুতিন এমন এক সময় সিরিয়ায় পেশীশক্তি প্রদর্শন করছেন যখন যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। সিরিয়ায় আইএস টার্গেটে রুশ বিমান হামলা হচ্ছে প্রায় ত্রিশ বছরের মধ্যে সোভিয়েত সীমান্তের বাইরে রাশিয়ার প্রথম সামরিক অভিযান। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকা সরে যাচ্ছে আর তার জায়গা নিয়ে নিচ্ছে রাশিয়া। প্রায় ৭ বছর ধরে ওবামা প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকাকে বের করে নেয়ার চেষ্টা করেছে। এতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে তা পূরণ করতে এগিয়ে আসছে রাশিয়া।

রাশিয়ার সিরিয়া অভিযানে দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ডলার ব্যয় হচ্ছে। বলাবাহুল্য, রাশিয়ার বাজেটের অন্যান্য খাত সঙ্কুচি হয়ে এলেও সামরিক বাজেট ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ক্রিমিয়ার পর এখন সিরিয়া অভিযানের ফলে পুতিনের জনপ্রিয়তা সর্বকালের তুঙ্গে উঠেছে। ওটা দাঁড়িয়েছে ৮৯ দশমিক ৯ শতাংশে। আমেরিকানরা এখন রণক্লান্ত। আর সেই সুযোগ নিচ্ছে রাশিয়া। তবে সে খুঁজে খুঁজে বেছে নিচ্ছে এমন জায়গাগুলো যেখানে আমেরিকার দিক থেকে পাল্টা আঘাত আসার সম্ভাবনা কম। তাছাড়া সেখানে বড় ধরনের স্থলবাহিনী জড়িত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার এখনকার হাল কি দাঁড়িয়েছে তা নিচের এক ছোট্ট ঘটনা থেকে বোঝা যাবে। ৩০ সেপ্টেম্বর সিরিয়ায় বিমান হামলা শুরু করার আগে রাশিয়ার এক থ্রি-স্টার জেনারেল বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে গিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে এসেছিলেন : এক ঘণ্টা পর আমরা সিরিয়ায় বিমান হামলা চালাব। ওখান থেকে সরে থাক। যুক্তরাষ্ট্র ঐ হুঁশিয়ারি অনুযায়ী নিজ বিমান বহরকে গুটিয়ে রেখেছিল।

এটা ঠিক যে পুতিন সশস্ত্রবাহিনীর ব্যয় ২০০৫ সাল থেকে দ্বিগুণ করে ফেললেও যুক্তরাষ্ট্র এখনও তার ১০ গুণ অর্থ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করছে এবং মস্কোর একটির জায়গায় ওয়াশিংটনের ১০টি বিমানবাহী রণতরী সাগরে চলছে। কিন্তু তারপরও রাশিয়া দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা বিমান ও নৌশক্তি কাজে লাগিয়ে স্থলভিত্তিক উন্নততর শক্তিকে নামাতে পারে। রাশিয়ার অর্থনীতি ও অস্ত্রভা-ার দুর্বলতর হয়ে পড়েছে। তারপরও যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে নিকট মেয়াদে সবচেয়ে বিপজ্জনক হুমকি হিসাবে দেখছে-চীনকে নয়।

পেন্টাগন কর্মকর্তারা এই ভেবে উদ্বিগ্ন যে, রাশিয়া সিরিয়ায় একটি তৃতীয় প্রতিরক্ষা অঞ্চল গড়ে তুলছে সে ধরনের অঞ্চল ইতোমধ্যেই বাল্টিক সাগরের কাছে এবং কৃষ্ণসাগরে আছে। বাইরের প্রবেশ নিরোধ এই অঞ্চলগুলোতে সাধারণত শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন থাকে যার লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য শত্রুদের দূরে সরিয়ে রাখা। এ হলো এমন এক কৌশল যা চীনের মতো দেশগুলো উত্তরোত্তর অনুসরণ করে চলেছে। যারা বিমান শক্তি বা নৌশক্তির দিক দিয়ে আমেরিকার সমকক্ষ না হলেও মার্কিন সামরিক শক্তিকে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। সিরিয়ার টারটুস নগরীতে রয়েছে রাশিয়ার একমাত্র ভূমধ্য সাগরীয় ঘাঁটি। এই ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ রাশিয়া কিছুতেই হারাতে চাইবে না। তাছাড়া আরও একটা ব্যাপারও আছে। আইসিস নিয়ে আমেরিকার যত না মাথাব্যথা তার চেয়ে বেশি মাথাব্যথা রাশিয়ার। কারণ এই সংগঠনে ইতোমধ্যে রাশিয়ার আড়াই হাজারেরও বেশি নাগরিক যোগ দিয়েছে। কাজেই সিরিয়ায় আইসিসের সঙ্গে একটা হেস্তনেস্ত না করে রাশিয়ার উপায় নেই। শুধু বাশারকে রক্ষা করতেই নয়, রাশিয়ার নিজের জন্যও এটা প্রয়োজন।

সূত্র : টাইম