২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রেলগাড়ি ঝমাঝম

সেলিনা জাহান

মানুষের ভাল লাগার কল্পনায় যখন কিছু থাকে তা হয় সাধারণত ফুলের মতো রঙিন সুন্দর আর সুরোভিত। কিন্তু রেলগাড়ির মতো বিরাট একটা ধাতব যান যে মানুষের মনের ভাল লাগার মণিকোঠায় জমা থাকতে পারে তা হয়ত ভাবা যায় না। কিন্তু সবার জীবনের সুখের স্মৃতিতেই রেলগাড়ি যে একটা বিরাট জায়গা করে আছে তা হয়ত অনেকেই স্বীকার করবেন। রেলগাড়ির কুঝিকঝিক ঝিকঝিক মাতাল করা ছন্দে জীবনে অন্তত একবারের জন্য হলেও বিমোহিত হয়নি এমন মানুষ হয়ত খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে।

পৃথিবীতে যত রকমের যানবাহন আছে তাদের ভিতর রেলগাড়ি যদি শ্রেষ্ঠ বলা হয় তাহলে হয়ত অনেকেই নাক সিটকাবেন। এটা ঠিক বর্তমানে মানুষের দুরন্ত গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে রেলগাড়ির চলা আর সম্ভব নয়। হয়ত রেলগাড়ির অনেক রকম সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছুটে চলাই কি মানুষের জীবনের সব। এই ছুটে চলার ভিতর মনের খোরাক কতখানি জমা হলো তার কি কোন মূল্য নেই? রেলে চলতে চলতে মানুষের মনে যত বিচিত্র ভাবের সমাহার হয় অন্য কোন যানবাহনে কি তা হওয়া সম্ভব?

আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঘটিবাটি নিয়ে রেলস্টেশনে আসাটা কিন্তু একটা বিরাট রোমাঞ্চকর ব্যাপার। চারদিকে নানা রকমের লোকজনের চলাফেরা। বিভিন্ন পসার নিয়ে ফেরিওয়ালাদের বিচিত্র হাঁকডাক। কুলিদের মাত্রাতিরিক্ত ব্যস্ততা। সব মিলিয়ে একটা ভীষণ মন ভাল করা অনুভূতি। আবার স্টেশনে যখন কোন গাড়ি থাকে না তখন চারদিক বেশ ফাঁকা হয়ে যায়। চারদিকে নেমে আসে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা, গভীর রাতের গা ছমছম করা আলো আঁধারীর রেলস্টেশন কিন্তু এক সাংঘাতিক ভুতুড়ে অভিজ্ঞতা।

সে যাই হোক রেলগাড়িতে উঠে সব জিনিসপত্র গুছিয়ে আরাম করে হাঁফ ছেড়ে বসার মধ্যে কিন্তু আলাদা একটা আনন্দ আছে। আশপাশের অন্যান্য সহযাত্রীর সঙ্গে তখন আস্তে আস্তে পরিচিত হওয়া যায়। রেলের সহযাত্রীরা যত সহজে সবার সঙ্গে মিশতে পারে অন্য কোন যানবাহনে কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। যেহেতু অনেকটা সময় একসঙ্গে থাকতে হয় সবাই বেশ প্রাণ খুলে হাত-পা ছড়িয়ে পরস্পরের সঙ্গে খোশ গল্পে মেতে ওঠে। মাঝে মাঝে এর ভিতরেই চলে নানা রকমের খেলাধুলা। কিছুক্ষণ পর সবাই মিলে টিফিন ক্যারিয়ার খুলে ভাগাভাগি করে খেয়ে নেয়। রেলগাড়ির মৃদুমন্দ ঝাঁকুনিতে আয়েশ করে খাবারের কিছুক্ষণের মধ্যেই সবার ভিতর একটা ঢুলুনি ভাব চলে আসে। আস্তে আস্তে কামরার লাইটও বেশ নিভু নিভু হয়ে যায়। এই রকম একটা পরিবেশে যখন চারদিক নীরব হয়ে যায় তখন জানালার ধারে বসে বাইরের দিকে তাকালে মনের অবস্থা কেমন হয়?

উড়োজাহাজে চড়ে আমরা যখন নিচের দিকে তাকাই, তখন নিজেকে বেশ একটা উঁচু দরের মানুষ বলে মনে হয়। চারদিকে, ঝকঝকে তকতকে লোকজন। বিদেশি ম্যানার্স! পাশের যাত্রীকে বাঙালী মনে হলেও তার সঙ্গে ইংরেজীতে কথা বলা, বেশ একটা সুখ জাগানিয়া পরিবেশ। কিন্তু এই সমস্ত কিছু খুব একটা আত্মিক কি?

জাহাজে স্টিমারে ভ্রমণ করার অভিজ্ঞতাও কিন্তু খারাপ নয়। বেশ আরামদায়ক। তবে বেশ একঘেয়ে।

কিন্তু রেলগাড়ি? এখানে একঘেয়েমির কোন অবকাশ নেই। নিজেকে হামবড়া ভাবারও সুযোগ নেই। যখন চারদিকে নিস্তব্ধতা নেমে আসে, আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নামে তখন জানালার পাশে বসে অনেকটা সময় নিজের মতো করে কাটানো যায়। বাইরের জগৎটাকে নিমেষে আপন করে নেয়া যায়। গ্রামের সবুজ প্রান্তর দিয়ে ছুটে চলা ট্রেনে বসে নতুন করে উপলব্ধি করা যায় মানুষ এই ধরীত্রিরই একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ। তখন মনে হয় চারদিকের সব কিছুই ভীষণ আপন। এই উদার প্রকৃতির ভিতরই তো থাকে মায়ের কোলের উষ্ণতা। অনুভব করা যায় নাড়ির টান। কিন্তু এরই ভিতর ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলা ট্রেন যেন বুঝিয়ে দেয় সামনের দিকে এগিয়ে চলার নামই জীবন। থেমে যাওয়া নয়।

পৃথিবীতে অনেক ক্লাসিক সাহিত্য এবং ছায়াছবি কিন্তু সৃষ্টি হয়েছে এই রেলগাড়িকে কেন্দ্র করে। তার বর্ণনা দেয়া স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন অমর ছায়াছবি নধষষধফ ড়ভ ধ ঝড়ষফরবৎ এর নাম উল্লেখ না করলেই নয়। এই ছায়াছবির একটা বড় ইমোশনাল অংশ জুড়ে আছে এই রেলগাড়ি, নানারকম এ্যাডভেঞ্চারের কাহিনী, ট্রেন ডাকাতি, ডিটেকটিভ গল্পও তৈরি হয়েছে এই রেলগাড়িকে কেন্দ্র করে। আর লোমহর্ষক ভৌতিক গল্প কাহিনী তো আছেই।

আমাদের দেশে বহু প্রত্যাশিত মেট্রোরেলের কাজ শুরু হয়েছে। ২০১৯ সাল নাগাদ এর আংশিক ব্যবহারও শুরু হয়ে যাবে। এর থেকে সুখের খবর আর কি হতে পারে? এর ফলে ভয়াবহ যানজট নামক সমস্যা থেকে উদ্ধার পাবে আমাদের রাজধানী। আসলে এ যাবত আমাদের দেশের রেল ব্যবস্থার কিন্তু তেমন কোন উন্নতি হয়নি। তার ওপর এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাহাড় সমান দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার অভিযোগ। মাল পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতের এই মাধ্যমটি যদি উপেক্ষিত হয় অথবা দুর্নীতির আখড়া হয় তবে একটা দেশের উন্নতি কি সম্ভব? আখড়া যারা এই সমস্ত দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থেকে নিজেদের আখের গোছায় তাদের কি মানুষ নামে আখ্যায়িত করা যায়?

মহাখালী, ঢাকা থেকে