২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নতুন ছন্দে চাই রেল

মোঃ রফিকুল ইসলাম

মানুষের মনে ছন্দ জাগায়, দেহে ও মনে দোলা দেয় এমন একটি যানবাহনের কথা উঠলে রেলগাড়ির নামটিই আগে আসবে। তাই রেলগাড়ি নিয়ে- রেলগাড়ি ঝমাঝম, পা পিছলে আলুর দম। বা ঝিকির ঝিকির রেলগাড়ি, চল যাই তাড়াতাড়ি। কিংবা আইকম বাইকম তাড়াতাড়ি/ যদু মাস্টার শ্বশুরবাড়ি ইত্যাদি কত ছড়াই না প্রচলিত আছে ! এতে চড়তেও যেমন মজা, তেমনি এর শব্দ ও চলাচলের সর্পিল দৃশ্যও কম মজার নয়। এ এক নস্টালজিক কাব্যিক যানবাহন। সত্যজিৎ রায় পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রেও অপু ও দুর্গার রেলগাড়ি দেখার আকর্ষণীয় দৃশ্যটি অন্তর্ভুক্ত করে এক ভিন্নমাত্রা যোগ করেছেন। এ যেন আমাদের শৈশবের রেলগাড়ি দেখার কমন দৃশ্য। প্রথম রেলগাড়ি দেখা ও চড়া সবার জন্যেই এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। ১৯৭২ সালে জারিয়া থেকে ময়মনসিংহগামী লোকাল ট্রেনটি ছিল আমার দেখা প্রথম রেলগাড়ি। এর কিম্ভূতকিমাকার কালো বাষ্পীয় ইঞ্জিনটির দানবীয় রূপ ও আওয়াজ দেখে অন্তরাত্মা কেঁপে গিয়েছিল। এক মহিলাকে দেখেছিলাম ভয়ে মাটিতে অবনত হয়ে একে প্রণাম করতে। ট্রেন চালুর পর ভয় রূপ নেয় আনন্দে। মনে হচ্ছিল, আমি এক দোলনায় বসে আছি আর পৃথিবীর সব মোহনীয় দৃশ্য আমার সামনে দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে; গরু-ছাগল, মানুষজন, ধানক্ষেত, গাছপালা, ঘর-বাড়ি, আকাশের মেঘ, সবকিছু। ফেরিওয়ালাদের গান গেয়ে বা বক্তৃতা দিয়ে রকমারি পণ্য বিক্রি করার কৌশল দেখে মনে হচ্ছিল এ যেন এক চলন্ত মেলা।

এখনও মনে পড়ে- ট্রেনটিতে টয়লেট, বাতি ও পর্যাপ্ত পাখা ছিল। আশ্চর্যের বিষয়, স্বাধীনতার চুয়াল্লিশ বছরে দেশ অনেক এগুলোও এ লোকাল ট্রেনগুলোর মারাত্মক অবনতি হয়েছে। নেই জানালার শাটার, টয়লেটের দরজা, পানি সরবরাহ, বাতি ও পাখা; সিটগুলো ভাঙ্গা বা ছেঁড়া-ফাড়া, ফ্লোর অপরিচ্ছন্ন, এ যেন এক গোয়াল ঘর। অথচ, ভারতসহ বিশ্বব্যাপী লক্ষ করা যাচ্ছে, উৎপাদনের উপকরণের গতিশীলতা বৃদ্ধি, জনবহুল নগরীগুলোর ওপর চাপ কমানো, পর্যটনের বিকাশ ও সাশ্রয়ী জনপ্রিয় গণপরিবহনের প্রাপ্যতা বৃদ্ধির জন্য রেলপথ ও রেলগাড়ির যে আধুনিকায়ন হয়েছে, সেই তুলনায় আমরা যেন অন্ধকারে। ১৯৪৭ সালে এদেশে রেলপথের দৈর্ঘ্য ছিল ২,৭০৬.০০ কিলোমিটার আর বর্তমান বাংলাদেশে ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশে এর দৈর্ঘ্য মাত্র ২৮৮০.০৭ কিলোমিটার। জনসংখ্যাবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং অন্যান্য পরিবহনের উন্নয়ন-অনুপাতে এ খাতে পরিকল্পিত ও সমন্বিত উন্নয়ন মোটেই হয়নি। আশির দশকে কিছু আন্তঃনগর ট্রেন চালু ও বঙ্গবন্ধু সেতুকে কেন্দ্র করে যমুনা নদীর দু’পাড়ে সংযোগ রেলপথ ছাড়া আর কী অগ্রগতি আছে? বাংলাদেশ সফরে আসা এক অস্ট্রেলীয় বিশেষজ্ঞ ট্রেনে যাত্রীদের ভিড় দেখে নাকি বলেছিলেন, অস্ট্রেলিয়াতে ট্রেনে এ পরিমাণ যাত্রী পেলে পুরো রেললাইনকে তারা স্বর্ণ দিয়ে মুড়িয়ে দিতেন।

বাংলাদেশে রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, অসাধুতা দূর করে রেলপথের আরও সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন, বিদ্যুতায়িতকরণ, পর্যটন-ট্রেন চালুকরণ এবং মহানগরগুলোয় মেট্রো ও মনোরেল চালু করলে একদিকে যেমন গণপরিবহন সমস্যা দূরীভূত হবে, তেমনি তা একটি লাভজনক ও আকর্ষণীয় পরিবহন খাতেও পরিণত হবে। রচিত হবে রেলগাড়ির নতুন ছন্দ।

দুর্গাপুর, নেত্রকোনা থেকে