২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জেএমবিই বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে

  • রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে গ্রেফতার জঙ্গীদের কাছ থেকে

শংকর কুমার দে ॥ নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন জামা‘আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে উগ্র মৌলবাদী ধর্মান্ধতা থেকে ধর্মীয় মতাদর্শ বিরোধী হত্যাকা-গুলো সংগঠিত করছে বলে তথ্য পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রাজধানীর শাহবাগে প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন খুন, মোহাম্মদপুরে অপর প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল, ব্লগার তারেক রহিম ও লেখক রণদীপম বসুকে কুপিয়ে জখম, হোসেনী দালানে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিতে গ্রেনেড হামলা, দুই পুলিশ খুন, রাজাবাজারে মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী, গোপীবাগে কথিত পীর লুৎফর রহমান, তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়িতে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু ও বাড্ডায় প্রকৌশলী খিজির খান হত্যাকা-ের ঘটনা অন্যতম। ভিআইপি ব্যক্তিদের হত্যা, হামলা, অপহরণ, অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হতাহত, প্রগতিশীল লেখক, ব্লগার, প্রকাশক খুন, নাশকতা, অরাজকতা, নৈরাজ্য সৃষ্টির ছক কষে মাঠে নামানো হয়েছে জঙ্গীগোষ্ঠী জেএমবিকে। রাজধানীর উত্তরার এয়ারপোর্ট এলাকা, আশুলিয়া, আবদুল্লাপুরে দুই দিনের পৃথক অভিযানে ১৮ জেএমবির জঙ্গীকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে ধর্মীয় মতাদর্শ বিরোধী হত্যাকা- সংগঠিত করার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ডিবি সূত্র জানান, সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানাধীন আব্দুল্লাহপুরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে জেএমবির ১১ সদস্যকে গ্রেফতার করার পর তাদের কাছ থেকে জিহাদী বই, বিস্ফোরকদ্রব্য ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারকৃত ১১ জেএমবির সদস্যরা হচ্ছেন, বাবু মুন্সী ওরফে মাসুদ রানা, আরিফ ইবনে খায়ের ওরফে রিফাত, খোরশেদ আলম, ওমর ফারুক, আলহাজ মিয়া, হেলাল উদ্দিন, আব্দুল বাসেত, মোহাম্মদ সুজাত, ফরহাদ হোসেন, মিজানুর রহমান ও আজহার আলী। এর আগে গত ৬ নবেম্বর রাজধানীর উত্তরার এয়ারপোর্ট এলাকায় পৃথক অভিযানে গ্রেফতার হয় নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন জেএমবির সঙ্গে জড়িত পাকিস্তানের নাগরিক ইদ্রিস আলী (৫৭), মোঃ শাকিল (৩৯), খলিলুর রহমান (৪৯) ও ইকবাল (৩৭) এবং বাংলাদেশের নাগরিক গ্রেফতারকৃত পাকিস্তানীদের সহযোগী জেএমবি সদস্য মোঃ ফরমান (৩৫), মোঃ বাবুল খান (৪৫) ও শহীদ (৪০) গ্রেফতার হয়। জেএমবির জঙ্গীগোষ্ঠীটি আল কায়েদা, আইএসের মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গীগোষ্ঠীর সঙ্গে কানেকশন করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। জেএমবির পক্ষ থেকেই জঙ্গী সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) দায় স্বীকার করার ঘটনা ঘটানো হচ্ছে এবং জঙ্গীগোষ্ঠীর ইন্টারনেটভিত্তিক তৎপরতা নজরদারি করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়েবসাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের নামে আবারও রিটা কাৎজ-এর সঙ্গেও কানেকশন গড়ে তোলা হয়েছে কিনা সেই বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো, অরাজকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির কাজে মাঠে নামানোর বিষয়টিও রিমান্ডে আনা জেএমবি সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এর একজন কর্মকর্তা বলেন, জেএমবিসহ জঙ্গীগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযানের অংশ হিসেবেই দুটি পৃথক অভিযানে ১৮ জেএমবির জঙ্গীকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এতে জট পাকিয়ে থাকা অনেক চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হতে পারে। তবে জেএমবিকে কোন অদৃশ্য মহল থেকে সংগঠিত করে তৎপরতায় নামানো হয়েছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এমনই আভাস দিয়েছে গ্রেফতারকৃত ১৮ জেএমবির জঙ্গী সদস্য। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে তারা সফল হতে পারছে না এবং জঙ্গীগোষ্ঠীটি বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

জেএমবির গ্রেফতারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তকারী ডিবি সূত্রকে জানায়, মাওলানা সাইদুর রহমানের সমর্থিত গ্রুপটিই এখন শক্তিশালী ও মূল গ্রুপ বলে জানা যাচ্ছে। জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা আমির শায়খ আবদুর রহমানসহ পাঁচ শীর্ষস্থানীয় নেতাকে ২০০৭ সালে ফাঁসি দেয়ার পর মাওলানা সাইদুর রহমান জেএমবির আমির হন। ২০১০ সালে তিনি গ্রেফতার হন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। এর কয়েকদিন পর তার ছেলে আবু তালহা মোহাম্মদ সায়েম ওরফে ফাহিম ওরফে পাখীকে রাজশাহী থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। ৯ মাসের মাথায় জামিনে বেরিয়ে আসেন মাওলানা সাইদুর রহমানের ছেলে ফাহিম। এরপর ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব দেয়া হয় ফাহিমকে। এরপর তিনি অনুসারীদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছিলেন। গত ২৭ জুলাই রাজধানীর উত্তরার একটি মেস থেকে ৮ সহযোগীসহ তাকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। তিনিও কারাগার থেকে বাইরে থাকা অনুসারীদের এখনও দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন কিনা সেই বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জেএমবির আরেকটি অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন সালাহ উদ্দিন ওরফে সালেহীন ওরফে বোমা মিজান। গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশের প্রিজনভ্যানে আক্রমণ করে এ গ্রুপটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর কাড়ে। হামলার পর জঙ্গীরা বোমা মিজান, সালাহ উদ্দিন ও হাফেজ মাহমুদকে ছিনিয়ে নেয়। ওই হামলায় একজন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছিলেন। পরে হাফেজ মাহমুদ একইদিন সন্ধ্যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন ও ক্রসফায়ারে নিহত হন। এখনও পর্যন্ত পালিয়ে পলাতক দুই দুর্ধর্ষ জঙ্গীকে গ্রেফতার করা যায়নি। জেএমবির তৃতীয় গ্রুপটি ছিল সবচেয়ে বেশি উগ্রবাদী। তাদের বেশিরভাগই মুফতি জসিম উদ্দিন রাহমানীর নেতৃত্বে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে। রাহমানী গ্রেফতার হওয়ার পর ইরাক ও সিরিয়া ভিত্তিক আইএসের প্রতি তাদের আগ্রহ বেড়ে যায়। আনসারুল্লাহ ও আইএসের কর্মী হিসেবে তাদের অনেককেই গ্রেফতার হয়েছে।

তদন্তকারী সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাতে গ্রেফতার হওয়া জেএমবির ১১ জঙ্গী জেএমবির নেতা সাইদুর রহমানের অনুসারী। তবে এ গ্রুপটির নেতা আরিফ ইবনে খায়ের ওরফে রিফাত। তার নেতৃত্বে এই গ্রুপের সদস্যরা বিভিন্ন হত্যাকা-, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ কার্যক্রমে ভাড়াটে হিসেবেও কাজ করছিল। তার নেতৃত্বেই জেএমবির গ্রেফতারকৃত অপর সদস্য ঢাকায় জড়ো হয়েছিল এবং বিভিন্ন হত্যাকা-ের সঙ্গেই তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা সেই বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ব্যাংকে ডাকাতি, এনজিও অফিসে হামলা, ডাকাতি, ছিনতাইসহ চুক্তিতে মানুষ খুন করে অর্জিত টাকা দিয়ে নিজেদের আর্থিক উন্নতি ও জঙ্গী সংগঠনকে অর্থায়ন করাই মূল লক্ষ্য এখন এই জঙ্গী গ্রুপটির। অন্যান্য কিলিং গ্রুপের সঙ্গে এই গ্রুপটির যোগাযোগ রয়েছে। তাদের আটক করতে পারায় অন্যান্য হত্যাকা- ও ঘটনাগুলোর সঙ্গে আর কারা জড়িত তাদের খুঁজে বের করা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ভিভিআইপিদের ওপর হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে উচ্চাভিলাসী আকাক্সক্ষা রয়েছে জঙ্গীগোষ্ঠীটির। এই জঙ্গীগোষ্ঠীটির আরও শক্তি সঞ্চয় করে এবং সংগঠিত হয়ে এমন হামলা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে আটককৃতদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে।