২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ব্লগার-প্রকাশকসহ সব হত্যার দ্রুত বিচার চায় ইইউ

  • ঢাকায় যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের বৈঠক

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ব্লগার, প্রকাশক হত্যা এবং শিয়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। সংস্থাটি দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করেছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ এবং মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা চেয়েছে ইইউ। বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে ইইউ-বাংলাদেশ যৌথ অর্থনৈতিক সভায় এ দাবি করেছে ইইউ। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহউদ্দিন এবং ইইউর পক্ষে নেতৃত্ব দেন জোটের এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউগো অসটোটো। অর্থ মন্ত্রালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য, আইন, ইআরডিসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে ইউগো অসটোটো বলেন, ব্লগার, প্রকাশক হত্যা এবং শিয়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলা খুবই অনাকাক্সিক্ষত। যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। ব্লগার এবং সুশীল সমাজসহ সকলের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। এসব মানুষের নিরাপত্তা সরকারকে দিতে হবে।

সাম্প্রতিক হত্যাকা-ের বিষয়ে আইএসের সম্পৃক্ততা আছে কিনাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। সেটি শেষ হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আন্তরিকভাবে বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। সংবাদ সম্মেলনে এ সময় ইআরডির অতিরিক্ত সচিব (ইউরোপ উইং) আবুল মনসুর মোঃ ফয়জুল্লাহ বলেন, ব্লগার এবং প্রকাশক হত্যা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সরকার আন্তরিকভাবে বিষয়টি তদন্ত করছে। দোষীদের কোন ধরনের ছাড় দিচ্ছে না সরকার।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সুশাসন, মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং অভিবাসী সেশনের শুরুতে ইইউ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, ব্লগার হত্যা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়ে জানতে চায়। এ সময় ইইউ জানতে চায়, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নেই। সম্প্রতি বিচারপতিদের অভিশংসন ক্ষমতা সংসদের হাতে দিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে। এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করেছে। সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বিচার বিভাগ কাজ করছে। উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অভিশংসন ক্ষমতা সংসদের হাতে দেয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, বৈঠকে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বাল্যবিয়ের সুযোগ দেয়া হয়েছে কিনা, সেটিও জানতে চাওয়া হয়। তখন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরকার বাল্যবিয়ে রোধে ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছে। এখনও ১৮ বছরের কম বয়সীদের বিয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। সরকার বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে আইনী পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে।

সভায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে লেখক-প্রকাশক হত্যা এবং মুক্তচিন্তার প্রতি হুমকির বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। এ সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সরকার খুনী সন্ত্রাসী ধরতে খুবই আন্তরিক। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার কারণে মুক্তচিন্তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না। আইসিটি আইন নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনার বিষয়ে জানতে চায় ইইউ। এ সময় তাদের জানানো হয় আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বজায় রেখেই এ আইন করছি। এতে মুক্তচিন্তা বাধাগ্রস্ত হবে না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে এর উত্তরে বলা হয়, বিচার বিভাগ পূর্ণ স্বাধীন। বিচারপতি নিয়োগ ও অভিশংসন ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকারের কোন হস্তক্ষেপ নেই। বিচারপতিরা পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছেন।

বৈঠকে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের অন্যতম রফতানির বাজার ইইউভুক্ত দেশগুলো। সেসব দেশে মূলত পোশাক, হিমায়িত খাদ্য ও চামড়া জাতীয় পণ্য রফতানি করা হয়। রফতানি আরও কিভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে দু’পক্ষের মধ্যে কর্মকৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। ইইউর নতুন বাণিজ্য কৌশল, বাংলাদেশের শ্রম আইন, ট্রেড ইউনিয়ন, পোশাক কারখানায় কর্মপরিবেশ, সেবা খাতে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই), বাংলাদেশ থেকে জাহাজ রফতানি বিষয়ে সভায় আলোচনা হয়েছে।

সূত্র জানায়, বৈঠকে পাঁচটি প্রকল্পে অর্থায়ন করতে অনুরোধ জানানো হয় ইইউকে। এগুলো হলো গ্রাম আদালতের কার্যক্রম সম্প্রসারণ, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচী (তিন), জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা এবং জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে দক্ষতা বাড়ানো প্রকল্প। মাল্টিলেভেল ইন্ডিকেটর প্রোগ্রামের (এমআইপি) আওতায় ইইউ বাংলাদেশকে ২০২০ সাল নাগাদ ৬৯ কোটি ইউরো দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এখনও চূড়ান্ত চুক্তি সই হয়নি। পাঁচটি প্রকল্পে এসব অর্থ খরচ করার কথা ভাবছে সরকার। এ বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। বৈঠকের আলোচ্যসূচী থেকে জানা গেছে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) বাস্তবায়ন এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইইউর কাছে আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা চাওয়া হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি, সে বিষয়েও একটি অংশে আলোচনা হয়েছে।

সূত্র জানায়, প্রতি দুই বছর পর বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে যৌথ কমিশনের সভা হওয়ার নিয়ম রয়েছে। ২০১২ সালে ব্রাসেলসে দুই পক্ষের মধ্যে সর্বশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বুধবারের সভায় তিনটি আলোচ্যসূচী ছিল। এর মধ্যে প্রথমেই ছিল সুশাসন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও অভিবাসন। দ্বিতীয় অধ্যায়ে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা। আর তৃতীয় অধ্যায়ে দু’পক্ষের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা।