২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লোকজ গানে আত্মদর্শন গাইবেন পাঁচ দেশের শতাধিক শিল্পী সাধক

লোকজ গানে আত্মদর্শন গাইবেন পাঁচ দেশের শতাধিক শিল্পী সাধক
  • আজ শুরু ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট

মোরসালিন মিজান ॥ গান গাই আমার মনরে বোঝাই/ মন থাকে পাগলপারা/ আর কিছু চায় না মনে গান ছাড়া...। গান ছাড়া সত্যি কিছু চাননি বাংলার বাউলরা। ভোগ সুখ থেকে দূরে ছিলেন। বিমুখ ছিলেন। আর তাই সংসার বিবাগী হয়েছেন। জাগতিক কোনকিছুই তাদের ঘরে বেঁধে রাখতে পারেনি। গানের টানে ছুটে বেড়িয়েছেন। তাঁদের মরমি চিন্তা দর্শন মানবিক সুখ দুঃখের অনুভূতি প্রকাশিত হয়েছে সঙ্গীতে। এভাবে লোকসঙ্গীত হয়ে উঠেছে বাঙালীর আত্মদর্শন। অহঙ্কারের মূল ভিত্তি। কিন্তু অন্যের অনুকরণে গড়ে ওঠা শহুরে সংস্কৃতি এই সঙ্গীতের তেমন কদর করেনি। পাশ কাটিয়ে চলেছে। পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসেনি। এভাবে বহু বহু কাল। আর তার পর কিছুটা ব্যতিক্রমী প্রয়াস। প্রয়াসটির নাম- ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট। দেশ-বিদেশের একঝাঁক লোকসঙ্গীত শিল্পী ও সাধক নিয়ে বর্ণাঢ্য এই উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে রাজধানী ঢাকায়। আজ বৃহস্পতিবার থেকে আর্মি স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য শুরু। লোকসঙ্গীতের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে তিন দিনব্যাপী উৎসবের আয়োজন করছে মাছরাঙা টেলিভিশন এবং সান ইভেন্টস।

রাজধানী শহরে লোকগানের এমন বিপুল আয়োজন এবারই প্রথম। প্রথমবারের মতো অভিজাত উপস্থাপনা। এক মঞ্চে বহু শিল্পী, বহু সাধকের গান শোনার সুযোগ করে দেবে উৎসব। দেশের বিখ্যাত শিল্পীরা যেমন গাইবেন, তেমনি যোগ দিচ্ছেন বিদেশী বাউলরা। উভয় অংশের সম্মিলনে অনবদ্য এক ফোক ফেস্ট আশা করছেন ঢাকার শ্রোতা।

আয়োজকরা জানান, উৎসবের প্রথম দিনে আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠান শুরু হবে সন্ধ্যা ৬টায়। চলবে রাত ১২টা পর্যন্ত। উদ্বোধনী দিন বাংলাদেশের বিখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পীরা মঞ্চে থাকবেন। সেইসঙ্গে গাইবেন ভারত ও পাকিস্তানের কয়েক নামকরা বাউল। বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে বিশেষভাবে বলতে হবে বিখ্যাত শিল্পী ফরিদা পারভীনের কথা। মহান সাধক লালনের গান তাঁর কণ্ঠে কী চমৎকারভাবে বেঁচে আছে! সেসব গান শ্রোতাদের শোনাবেন তিনি। কিরণচন্দ্র রায় ও চন্দনা মজুমদারের কণ্ঠে লালন ছাড়াও থাকেন বাউল আবদুল করিম, বিজয় সরকারসহ বিখ্যাত লোককবিদের গান। সেগুলো থেকে শোনাবেন তাঁরা। লোকসঙ্গীতের পরিবেশনা নিয়ে আসবেন রব ফকির, শফি ম-ল। যোগ দেবেন শহুরে শিল্পী প্রজন্ম কামালও। একই দিন থাকবে পল্লবী ডান্স গ্রুপের দলীয় পরিবেশনা। ভারতের শিল্পীদের মধ্যে গাইবেন পাপন ও তার দল দ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। অর্ক মুখার্জী মাঝে মাঝেই ঢাকায় আসেন। গাইবেন তিনিও। পাকিস্তান থেকে এসেছেন সাঁই জহুর। আজ শোনা যাবে তাঁর গান।

প্রায় একই রকম আয়োজন থাকবে উৎসবের দ্বিতীয় দিন। শুক্রবার গান গাইতে মঞ্চে উঠবেন জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী মমতাজ। লোকজ ধারার গানের বিশেষ উপস্থাপনা নিয়ে আসার কথা রয়েছে তাঁর। এদিন শোনা যাবে বাংলার কিংবদন্তি শিল্পী আবদুল আলীমের গান। মহান শিল্পীর পুত্র আজগর আলীম, জহির আলীম, নূরজাহান আলীম বাবার গান থেকে গেয়ে শোনাবেন। গানে গানে শ্রদ্ধা জানানো হবে ভাওয়াইয়া গানের রাজা আব্বাস উদ্দীনকে। তাঁকে উৎসর্গ করে গাইবেন নাতনি নাশিদ কামাল। উকিল মুন্সির গানের জন্য বিশেষ খ্যাতি বারি সিদ্দিকীর। গাইবেন তিনিও। আধুনিক শহুরে প্রজন্মের একটি অংশ বাউল গান নিয়ে নানা ধরনের নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেই প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করবে অর্ণব এ্যান্ড ফ্রেন্ডস। গাইবেন বাউলিয়ানার শিল্পীরা। এদিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে পারেন পবন দাশ বাউল। ভারতের এই বাউল ফিউশনের জন্য পৃথিবীব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছেন। বাংলাদেশে তাঁর অগণিত ভক্ত শ্রোতা। তাঁদের জন্য গাইতে বৃহস্পতিবার ঢাকায় এসে পৌঁছে গেছেন তারকা শিল্পী। একই দিন গাইবে নুরান সিস্টার্স। এই দুই বোনের পরিবেশনাও শ্রোতাদের মুগ্ধ না করে পারে না। চিনের ইউনান আর্ট ট্রুপের পরিবেশনাটিও বিশেষ উপভোগ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তৃতীয় দিন শনিবার শেষ হবে উৎসব। এদিনের বিশেষ আকর্ষণ হতে পারে বাংলাদেশের নৃত্যদল সাধনার পরিবেশনা। বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী লুবনা মরিয়মের দলটি লোকনৃত্যের ধারায় মুগ্ধ করে রাখবেন দর্শকদের। থাকবে বাংলার ঐতিহ্যবাহী পালাগান। পরিবেশন করবেন ইসলাম উদ্দিন পালাকার। লোকগানের শিল্পীদের মধ্যে একটু আলাদা পরিচিতি কাঙ্গালিনী সুফিয়ার। চমৎকার গান করেন শিল্পী। শেষ দিন শোনা যাবে তার গান। একই দিন থাকছে শহুরে দল জলের গানের পরিবেশনা। তরুণ প্রজন্মের কাছে খুব জনপ্রিয় এই দলটি এবারও মঞ্চ মাতাবে বলে আশা। শেষ দিন অনবদ্য পরিবেশনা নিয়ে আসবেন আয়ারল্যান্ডের নিয়াভ নি কারা। গাইবেন ভারতের পার্বতী বাউল। ব্যান্ড ইন্ডিয়ান ওশানের পরিবেশনাও আজকের প্রজন্মের জন্য দারুণ উপভোগ্য হতে পারে। উৎসবের একেবারে শেষভাগে রাখা হয়েছে উপমহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পী আবিদা পারভীনকে। পাকিস্তানের এই বিখ্যাত গায়িকার পরিবেশনার মধ্য দিয়ে ভাঙাবে মিলনমেলা।

সব মিলিয়ে অনবদ্য একটি উৎসব উপভোগের অপেক্ষা। একই আশাবাদ ব্যক্ত করে আয়োজকদের পক্ষে অঞ্জন চৌধুরী বলেন, লোকসঙ্গীত বাঙালীর প্রাণের স্পন্দন। এ সঙ্গীত দেশজ সংস্কৃতির ভিত গড়ে দেয়। লোকগানের প্রতি মানুষের প্রেম তাই সহজাত। অথচ বরাবরই আমরা শহুরে মানুষরা তা ভুলে থাকার চেষ্টা করেছি। অস্বীকার করেছি। কিন্তু এমন প্রয়াস আমাদের শেকড়হীন করে দেয়। এই বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ওঠা জরুরী। এমন উপলব্ধি থেকেই রাজধানী শহরে বিপুল উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা। আগামী প্রজন্মের সামনে বাংলা লোকসঙ্গীতের ভা-ার তুলে ধরার পাশাপাশি এই উৎসব দেশ-বিদেশের বাউলদের অভূতপূর্ব মিলনমেলা হিসেবে পরিচিতি পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।