২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দুর্যোগে মানুষের পাশে থাকুন বন্ধুর মতো

  • ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

বিডিনিউজ ॥ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও সাহসের সঙ্গে কাজ করছে বলেই এ বাহিনী জনগণের ‘আস্থা অর্জন করেছে’। আস্থার জবাবে এ বাহিনীর সদস্যরা যে কোন দুর্যোগে জনগণের পাশে থেকে ‘বন্ধুর মতো সেবা’ দেবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। বুধবার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে সরকারপ্রধান এ আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘সীমিত সম্পদের মাঝেও আমাদের সরকার ফায়ার সার্ভিসের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সচেষ্ট। আপনারা জানেন, আপনাদের পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। যে কোন দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় আপনারা জনগণের পাশে দাঁড়াবেন, বন্ধুর মতো সেবা দেবেন।’ মিরপুরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ট্রেনিং কমপ্লেক্সে এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী যে কোন দুর্যোগের পর উদ্ধার কর্মকা-ের জন্য স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে উদ্ধার কাজে বিশেষ দল গঠনের তাগিদ দেন। এবারের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহের মূল প্রতিপাদ্য ‘দুর্যোগ-দুর্ঘটনার ঝুঁকি হ্রাসে প্রয়োজন জনসচেতনতা ও প্রশিক্ষণ’। আর এ কাজে জনসাধারণের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার প্রত্যাশা সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা এ উদ্দেশ্য অর্জন করতে সক্ষম হব।’

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর সরকারের জরুরী সেবাধর্মী একটি প্রতিষ্ঠান- এ কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশে অনেক বড় বড় অগ্নি, নৌ ও সড়ক দুর্ঘটনায় এবং ভূমিধস ও ভবনধসে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা অত্যন্ত সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন।’ এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী রানা প্লাজা ধস, নিমতলীর অগ্নিকা-, তাজরীন গার্মেন্টের অগ্নিকা- এবং বসুন্ধরা শপিং মলের অগ্নিকা- নিবারণ ও পরবর্তী উদ্ধার কাজে ফায়ার সার্ভিসের কাজের প্রশংসাও করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমাদের দেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাছাড়া নগরায়ন, শিল্পায়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের কারণে রয়েছে অগ্নিকা-সহ অন্যান্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি।’ এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭২ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর থেকে এই বাহিনীর উন্নয়নে নেয়া পদক্ষেপ তুলে ধরেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর এই বাহিনীর আধুনিকায়নে নেয়া পদক্ষেপও উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।

২০০৯ সালের পর ১০০টি নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণ ও চালু করা হয়েছে। সারাদেশে ২৯৮টি ফায়ার স্টেশনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। চারটি প্রকল্পের আওতায় ২০১৬ সালের মধ্যে আরও ২৫১টি ফায়ার স্টেশনের নির্মাণ কাজ চলছে। প্রকল্পগুলো শেষ হলে দেশে মোট ফায়ার স্টেশন হবে ৫৪৯টি এবং জনবল ৮ হাজার ৩৫৪ জন থেকে বেড়ে প্রায় ১৫ হাজার হবে। বহুতল ভবনের আগুন নেভানোকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ কাজে ইতোমধ্যে ২শ’ কোটি টাকার সর্বাধুনিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়েছে। আরও যন্ত্রপাতি সংগ্রহের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।’

গত বছর হওয়া সমঝোতা স্মারকের আওতায় চীন বাংলাদেশের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে ৫০টি এ্যাম্বুলেন্স, ১শ’ টোয়িং ভেহিকেল (পাম্প টানা গাড়ি), দেড় শ’ ফায়ার ফাইটিং মোটরসাইকেল, একটি বড় পানিবাহী গাড়ি, একটি ফোমের গাড়ি এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় অন্যান্য উদ্ধার যন্ত্রপাতি দিয়েছে। অনুষ্ঠানে এ জন্য চীন সরকারকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।

ভূমিকম্প মোকাবেলায় বিশেষ করে বিধ্বস্ত ভবনে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় পাঁচটি আন্তর্জাতিক মানের ‘আরবান সার্চ এ্যান্ড রেসকিউ টিম’ গড়ে তোলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের দেশে ও বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সহায়ক শক্তি হিসেবে সারাদেশে ৬২ হাজার কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে, যারা ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।’

দেশের মহাসড়কগুলোতে ৭৯টি দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানে ‘ভ্রাম্যমাণ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স র‌্যাপিড রেসকিউ স্কোয়াড’ দায়িত্ব পালন করছে। নৌ-দুর্ঘটনায় আধুনিক উদ্ধারকারী ‘রেসকিউ ফ্লোট, রেসকিউ স্পিডবোট, জেমিনি বোট’ ইত্যাদি সংগ্রহের মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স তাদের সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে। পোশাকসহ সব শিল্প খাতে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত ও জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন শিল্প-কারখানার প্রায় দুই লাখ ১০ হাজার কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। পরিদর্শন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সম্প্রতি ২১৮টি পরিদর্শক পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উন্নয়নে সপ্তম পঞ্চমবার্ষিকী পরিকল্পনায় পোশাক শিল্প অধ্যুষিত এলাকায় নয়টি আধুনিক ফায়ার স্টেশন স্থাপন, ডুবুরি ইউনিট সম্প্রসারণ, ১০টি বিশেষায়িত অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার ইউনিট স্থাপন, ওয়্যারলেস ও টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ, ১০তলা প্রশাসনিক ভবন এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। জাইকার সহযোগিতায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের ১০তলা প্রশাসনিক ভবন এবং পূর্বাচলে বিশ্বমানের ফায়ার ট্রেনিং একাডেমি হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সকল কর্মীকে পূর্ণাঙ্গ রেশন দেয়া হচ্ছে। ৩০ শতাংশ ঝুঁকি ভাতা চালু করা হয়েছে।’ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্মীদের সাহসিকতাপূর্ণ কাজের স্বীকৃতির পদক সংখ্যা ৮টি থেকে ৫০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। পদকের সম্মানী পাঁচ হাজার ও ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার, ৭৫ হাজার এবং এক লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়া মাসিক ভাতা ৫০ ও ১শ’ টাকার স্থলে এক হাজার ও দেড় হাজার টাকা করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান তাকে স্বাগত জানান। এরপর প্রধানমন্ত্রী দুর্যোগপরবর্তী উদ্ধার কাজের মহড়া এবং নতুন সরঞ্জামের কার্যক্রম দেখেন।