১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কাটছে না অডিও শিল্পের মন্দাভাব

পাইরেসির দিকেই সবচেয়ে বেশি আঙ্গুল তাক করে আছেন সংশ্লিষ্টরা। মানহীন গানের ছড়াছড়ি, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর লোভ, মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর দুর্নীতি ছাড়াও আছে আরও বিভিন্ন মত, বিভিন্ন কারণ। কোন্টা বেশি যৌক্তিক? একটুক্ষণ তো ভাবাই যেতে পারে দেশের অডিও শিল্প নিয়ে! লিখেছেন- মাহবুবুর রহমান সজীব

এম এ শোয়েবকে মনে আছে তো? তাঁর গান নিয়েই বেরিয়েছিল দেশের প্রথম অডিও ক্যাসেট। তখন ১৯৮১। ৩৪ বছর আগের কথা। গেয়েছিলেন ‘আজ থেকে বারোটি বছর’, ‘বেস্ট অফ এম এ শোয়েব’ এ্যালবামে। গানটি যে কী ভীষণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, তা ওই এ্যালবামটির বিক্রিত সংখ্যা মনে করলেই বুঝা যায়। কত হতে পারে আনুমানিক?

ভাবুন.. পাঁচশ, পাঁচ হাজার, কিংবা পঞ্চাশ হাজার নয়; সংখ্যাটি ৩৮ লাখ। মনে পড়লে আজও চোখ চড়ক গাছ হয়ে যায়, কপালে কয়েকটি ভাঁজ পড়ে। একেকটি ভাঁজ যেন একেকটি ট্রেনের রাস্তা।

এখন কিন্তু তখনকার চেয়েও জনসংখ্যা বেশি, গানের শ্রোতা বেশি। অথচ, অনেক শিল্পীদেরই দেখছি পাঁচশ’ থেকে হাজার কপি সিডি করে নিজস্ব বন্ধুমহলেই অধিকাংশ বিলিয়ে দিতে। এই পরিণতিটা কেন হয়েছে, পরিস্থিতিটা কেন ভাল হচ্ছে না; ভাবছেন অনেকেই..

সেই এম এ শোয়েবেরই মতে, ‘পাইরেসিটাই বাংলা গানের এই দুর্দশার প্রধান কারণ’। আরও অনেকেই তাই-ই মনে করেন। আসলেই কি তাই?

‘শুধু পাইরেসির দোষ দিলে হবে না’। একটু ভিন্নমত বিখ্যাত সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক শেখ সাদি খানের। ‘আসলে, প্রযুক্তি কখনই মনের চাওয়া কিংবা আবেদনকে গ্রাস করতে পারে না। যতই পাইরেসি হোক কিংবা ফ্রি ডাউনলোড হোক, ভাল গানের জয় শেষ পর্যন্ত হবেই। প্রযুক্তির চেয়েও বেশি বড় সমস্যা হলো এখন গান ভাল হচ্ছে না। ভাল গান হলে মানুষ এ্যালবাম অবশ্যই কিনবে।’

নিখাদ সত্যি কথা এটা। মনে রাখার মতো গান কয়টা হচ্ছে আজকাল? খুব কম। অথচ, শিল্পী আজ ঘরে ঘরে। আগে যাদের গানের সুর সীমাবদ্ধ ছিল নিজস্ব চার দেয়ালের ভেতরেই, এখন সেটাও বাইরে বেরোচ্ছে। ঘরে ঘরেই ব্যক্তিগত স্টুডিও। কার গান কে শোনে! আগে একটা গান হতো গীতিকার-সুরকার-সঙ্গীতশিল্পী-কণ্ঠশিল্পী একসঙ্গে বসে, ভাবনাগুলো এক করে। এখন হয় প্রায় একলা একাই। মিউজিকাল সফ্টওয়্যারগুলোই যেন সবকিছু!

একটা গান তখনই আপনাকে ছুঁয়ে যাবে, যখন সেটার মাঝে আপনি আপনাকে খুঁজে পাবেন। হচ্ছে ক’টা এমন? ক’জন শিল্পী বলতে পারে তার গানের বিষয়বস্তু?

কথায় বলে, ‘মৌলিক সুর জন্ম নেয় শত বছরে একটা’। এখন তো সুরকাররা সকাল-সন্ধ্যা ডজন ডজন গানে সুর বসিয়ে যাচ্ছেন। গীতিকাররা পাঁচ মিনিটের মধ্যেই একটা গান লিখে শেষ করে ফেলছেন। সঙ্গীত পরিচালকরা কম্পিউটারের সামনে বসে কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো গানের মিউজিক নির্ধারণ করে ফেলছেন। কী করে হবে তাহলে মৌলিক গান? কী করে সেটা ছোবে মানুষকে? সবই ঘুরে-ফিরে প্রায় একই রকম কথা, একই বিষয়বস্তু, একই সুর, একই সঙ্গীত।

এই মন্দার বাজারেও কেউ কেউ ভাল কাজ করছেন, শ্রোতাপ্রিয়তাও পাচ্ছেন। ‘এ্যাশেজ’ নামে জোনায়েদ ইভানের একটি গানের দল আছে। যে ক’টা গান করছে তারা, প্রত্যেকটাই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। আজকে তাদের এ্যালবাম বাজারে আসলে কি শ্রোতারা বসে থাকবে চুপচাপ?

অবশ্যই না। এ্যালবাম কিনতে ছুটে যাবে অডিও সিডির দোকানগুলোতে। কম বিক্রি হবে না অনলাইনের মাধ্যমেও। প্রিয় শিল্পীকে বিপদে ফেলতে চাইবে না নিশ্চয়ই তাঁর ভক্তরা। ভাল কিছুর মূল্য সবসময়ই আছে, সেটা ঠিকঠাক ভাল হতে হবে। টিভি চ্যানেল, এফএম রেডিও, পত্রিকাসহ প্রত্যেকটা মাধ্যমই বিভিন্নভাবে ভাল গানকে, ভাল শিল্পীকে তুলে ধরতে হবে শ্রোতাদের সামনে।

কেন ঝুঁকছে অনেকেই বাইরের দেশের গানের প্রতি? ওই ভালর অভাবেই। হাতের কাছেই ভাল কিছু পেলে নিশ্চয়ই কেউ অনেকটা পথ ঘুরে ভাল খুঁজতে যাবে না! এটাই নিয়ম। তবে, ইউটিউবের ভিউ আর ফেসবুকের লাইক গুনে যদি ভাল-মন্দ বিচার করা হয়, তাহলে তো সবচেয়ে ভাল বলতে হবে অশ্লীল নামধারী ভিডিওগুলোকে! কারণ, ইউটিউবে সেগুলোর ভিউ-ই সবচেয়ে বেশি।

পাইরেসি অবশ্যই একটা বড় কারণ। এতটাই বড় যে, চাইলেই খুব সহজে এটা নির্মূল করা যাবে না। দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রত্যেকটা মেমোরিকার্ড লোডের দোকান কি বন্ধ করে দেয়া সম্ভব? সম্ভব কি গ্রামের কচু গাছের মতো ছিটিয়ে থাকা ফ্রি ডাউনলোডের ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ করা? কখনও বন্ধ হবে কি ব্লুটুথ, এনিশেয়ারের মতো ফাইল শেয়ারিং এপ্সগুলো?

না। সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিক থাকলে কিছুটা সম্ভব বটে, পুরোপুরি অবশ্যই না। শুধু শুধু ওমুক-তমুক, এটা-সেটার দোষ দিয়ে কী লাভ? সৎ হতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। প্রযুক্তির ছোঁয়া বাইরের দেশগুলোতে আরও বেশি। সেখানে তো এমনটা হচ্ছে না! তবুও পাইরেসিবিরোধী আইনের সর্বোচ্চ ব্যবহার হতে হবে।

গান সাধনার বিষয়, চর্চার বিষয়, প্রতিভার বিষয়। চকচকা ভিডিও বানিয়ে কিছুক্ষণের জন্য হয়ত চোখকে জাগিয়ে রাখা যায়, মনকে না। গান হবে এমন, যেটা শুনলেই শ্রোতারা মনের ভেতর এমনিতেই একটা নিজস্ব গল্প চিন্তা করে নেবে, নিজস্ব ভিডিও। আলাদা করে ভিডিও বানিয়ে সেটাকে উপস্থাপন করতে হবে না।

নামের সঙ্গে ‘সিঙ্গার’ লাগিয়ে নিলেই যে শিল্পী হওয়া যায় না, বাসায় একটা ‘রেকর্ডিং স্টুডিও’ থাকলেই যে শিল্পী হওয়া যায় না, নিজের কাড়ি কাড়ি টাকা থাকলেই যে শিল্পী হওয়া যায় না; এই বোধগুলো ভেতরে জাগাতে হবে। তাহলেই কেবল আমাদের অডিও শিল্প ফিরে পেতে পারে তার হারানো ঐতিহ্য, নতুবা না...