২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রাচ্যনাটের ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি

  • অপূর্ব কুমার কুণ্ডু

কোন মানুষের সত্যিকার উপকার করার জন্য ঐ মানুষটির প্রতি এক প্রকার কান্না থাকতে হয় এটা একটা সর্বজনগ্রাহ্য সত্য। কিন্তু কথা হচ্ছে ফরমালিনের চক্রে পড়ে কোনটা যে খাদ্য আর কোনটা যে অখাদ্য তা যেমন মেশিন দ্বারা চেক না করা পর্যন্ত বোঝা দায় ঠিক তেমনি নিপীড়িত মানুষটির প্রতি কার কান্না হৃদয় নিংড়ানো আর কার কান্না গ্লিসারিন মিশ্রিত লোক দেখানো সেটিও প্রাজ্ঞ মানুষের গ্রীন সিগন্যাল না দেয়া পর্যন্ত সত্যিই বোঝা দায়। নইলে ভুলের পাহাড়ের ওপর ভুলের অট্টালিকা কিভাবে শোভা পায়! সাভারের পলাশবাড়িতে ধসেপড়া স্পেকট্রাম সোয়েটার এ্যান্ড নিটিং ফ্যাক্টরির কার্যকারণ আবিষ্কারে জলাভূমি ডুবিয়ে নয়তলা বিল্ডিং করা, রাজউকের গাফিলতি, রাতের শিফটের শতাধিক কর্মীর মর্মান্তিক মৃত্যু, ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া মুনাফার লোভ ইত্যাদি কথার পর কথা তো কম শোনা হলো না তবু রানা প্লাজার ধস তো থামানো গেল না। ভবিষ্যত ধস যেন পুনঃ না হয়, শিকড় শুকিয়ে যেন আস্ত গাছটাই না মরতে বসে সে কারণে দশ বছর আগে সাভারের পলাশবাড়ির গার্মেন্টস ধসকে কাঠামো ধরে, গার্মেন্টস-এর এক কল্পিত কর্মী তারাভানের মাঝে মরমীয় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে, বিপন্ন সময়ে মনুষ্যত্বের জাগরণে সময়ের বিদ্রোহী নাট্যকর-নির্দেশক-অভিনেতা আজাদ আবুল কালামের হ্যামলেটীয় প্রযোজনা ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি। গাইবান্ধার পলাশবাড়ি থেকে ভাঙ্গনের খরস্রোতে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলা এক গ্রাম্য কন্যা তারাভানের সাভারের পলাশবাড়িতে এসে গার্মেন্টস কর্মী হয়ে মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে মুক্তির আলিঙ্গনের নাটক, প্রাচ্যনাটের ত্রিশতম প্রযোজনা, আজাদ আবুল কালামের রচিত ও নির্দেশিত নাটক ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি মঞ্চস্থ হলো গত ৭ নবেম্বর শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায়।

জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ নাটকে জাতীয়তা আবার আন্তর্জাতিকতা এবং ক্ষেত্র বিশেষ জাতীয়-আন্তর্জাতিক পরিম-ল ছেড়ে অজানা দেশের মানস ভ্রমণ। বিষয় এক আর তা হলো ফ্যাক্টরি ধসে পড়তে পড়তে মাটিতে মিশে যাওয়া। কিন্তু ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রহসন আর কোহেলিকার অজস্র ঘটনা। দেশী মালিকদের মুনাফায় বিদেশী যে সব বায়ার বা আউটসোর্সার দীর্ঘ সময় বেনিফেসিয়াল হয়ে আঙ্গুল ফুলে গাবগাছ তারাই বিপর্যয়ের সঙ্কটে মালিকদের অব্যবস্থাপনা আর আমলাতান্ত্রিক নিস্পৃহায় শুধু বিরক্তই নয় বরং শ্রমিকদের বঞ্চনা সইতে না পেরে ব্যবসা অন্য দেশমুখী করতে ইন্টারনেটের সমান্তরাল গতিমুখী। অপরদিকে বিপদে ঝুঁকি মেনে নিয়েও উদ্ধার তৎপরতায় নিমগ্ন একদল উদ্ধারকর্মী। পাশাপাশি মেশিনের নিচে চাপাপড়া তারাভানকে নিমিষে পিষে ফেলতে সম্মুখে এগিয়ে আসা ছাদের তলে পড়ে মৃত্যু এবং বেঁচে থাকার শেষ মুহূর্তে তারাভানের স্মৃতিচারণে অতীত জীবন, স্বপ্নের বুনন আর সম্মুখ বর্তমানকে মোকাবেলার নাটক ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি। নয় মাসের মঙ্গা শেষে তিন মাসের ভাতের ঘ্রাণ, বাসরঘরে পাগল স্বামীতে সমার্পণ, তালাক নামায় ঘর ছাড়া, ঘর বাঁধতে গিয়ে গ্রাম ছাড়া, গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে লুটের দলের মোকাবেলা, অসম যুদ্ধে গার্মেন্টসের কাজ পেয়ে বাঁচতে চাওয়া আর বাঁচার নিশ্চিত জায়গায় পৌঁছে ভবন ধসের মধ্য দিয়ে তারাভানের জীবন থেকে তারা খসে পড়ার ট্র্যাজেডিই ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি। অসংখ্য তারায় তারায় ঢেকে যাওয়া আকাশের নিচে ‘কেউ কি আছেন...’ শঙ্কিত আহ্বানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় নাটক ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি।

পলাশবাড়ি কিংবা রাজবাড়ি বলে কথা না, কথা হলো আজ শিল্পকলা একাডেমির মতো আধুনিক সুযোগ-সুবিধার হলো রুম আছে কিন্তু মহিলা সমিতি কিংবা গাইড হাউসের মতো দিনগুলোর বর্ণিল প্রযোজনা নেই। ফলে নাটকের পা-ুলিপির মান কমেছে, কমেছে অভিনয়ের দক্ষতা। মাঝখান থেকে বেড়ে গেছে কোরিওগ্রাফিদের লম্ফঝম্প, ঝঞ্ঝাট আর নির্দেশকের উপস্থিতির নিষ্পেষণ। এখানে আজাদ আবুল কালাম ক্ষয়িষ্ণু জমিদারি প্রথার বিপন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে পারিবারিক ঐতিহ্যবাহী চিত্র কর্মগুলোকে ধরে রাখতে চেয়েছেন মলিন নেকড়ার ঘষায় আর চোখ ভেজা জলের চোয়ায়। মলিন নেকড়া দুর্ধর্ষ অভিনয় আর ভেজা জল লেখনির রচনা। দলগুলো যখন নাটকের চরিত্রের প্রয়োজনীয় অভিনেতা-অভিনেত্রী যোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে তখন নির্দেশক জমজ সন্তানের পিতা। অর্থাৎ একই নাটকের দুই সেট অভিনয় শিল্পী এবং মজার বিষয় প্রতিশোতে একে ছাপিয়ে যাচ্ছে অপরকে। রচনাও নির্দেশনায় ত্রিডাইমেনশনের সফল প্রয়োগ। প্রজেক্টরে বিশ্বায়ন, ছাদের তলে চলমান নিষ্পেষণ আর তারাভানের মনোজগতে ভাঙ্গনের গানের সুর চয়ন। নির্দেশক আজাদ আবুল কালাম এবার যতটা না আগ্রাসী তার চেয়ে বেশি অন্তর্মুখী। ফলে ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি দাবানল হয়ে বাগানের গাছ পোড়ায় না বরং নদীর জল হয়ে গাছের গোড়ার মাটি সরায়। যা তিনি উপড়ে ফেলতে চান তা তিনি উপড়াতে পেরেছেন প্রাজ্ঞতার সহনশীলতায়। এবার আজাদ আবুল কালামের সামনে নব পরীক্ষা। চলার পথে আরণ্যকের খাদ সামলিয়ে প্রাচ্যনাটের উতলে ওঠা ঢেউ প্রমাণিত সত্য। ডিক্টেটরদের লক্ষণ রেখা থেকে ‘রাজা এবং অন্যান্য...’ মঞ্চায়নে রবীন্দ্রমুক্তি।

লোক সংস্কৃতির গলাবাজির মাঝে ‘সার্কাস সার্কাস’ ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধার। ‘কইন্যা’য় উগ্রবাদের অবসান। অবশিষ্ট বলতে দলগতভাবে একক অভিনয়ের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ। ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি অনেকটাই সেই অভিমুখী কিন্তু এতেও যদি সম্বিৎ নাও ফেরে তবে বুঝতে হবে ধসের তলে চাপা না পড়লে কিছু নাট্যকর্মীদের চৈতন্য খোলে না। কারণ কিছু নাট্যকর্মীরাই নাটকের মধ্য দিয়ে দেখাতে পারে সেই ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি যা ভবিতব্য ট্র্যাজেডিকে রুখে দিতে সচেতন হৃদয়ে তীব্র গতিতে নাড়া দেয়। তীব্র ভাবাবেগের মরমীয় প্রযোজনা প্রাচ্যনাটের ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি।