২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ ইমাম হুসাইন (রাদি.)

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

হযরত ইমাম হুসাইন রাদি আল্লাহ্ তা’আলা আন্হুর আম্মাজানের নাম হযরত ফাতিমাতুয্ যাহ্রা রাদিআল্লাহ তা’আলা আন্হা এবং আব্বাজানের নাম হযরত আলী মুরতাযা করমাল্লাহ ওয়াজহাহু আর নানাজান হচ্ছেন সরকারে দো আলম নূরে মুজাস্সম সাইয়েদুল মুরসালীন খাতামুন্নাবীয়ীন হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম।

হযরত ইমাম হুসাইনের মর্যাদা যে কত সুমহান তা বলে শেষ করা যায় না। গরীবে নওয়াজ সুলতানুল হিন্দ সুলতানুল আরেফীন খাজা মঈনুদ্দীন হাসান সঞ্জরী আজমেরী চিশতী রহমাতুল্লাহি ‘আলায়হি তাঁর কাব্য কর্মের এক জায়গায় বলেন, শাহ্ আস্ত হুসাইন বাদশাহ্ আসত হুসাইন/দীন আসত হুসাইন ও দীনে পানাহ্ আসত হুসাইন। হুসাইন হচ্ছেন সম্রাট হুসাইন হচ্ছেন বাদশাহ/দীন হচ্ছেন হুসাইন এবং দীনের আশ্রয়ও হুসাইন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর কন্যা ফাতিমাতুয্ যাহ্রা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহাকে ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মার্চ মুতাবিক দ্বিতীয় হিজরীর ২৪ রমাদান শুক্রবার হযরত ‘আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহুর সঙ্গে বিয়ে দেন। তারপরের বছর অর্থাৎ ৬২৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁদের একটা পুত্র সন্তানের জন্ম হয় যাঁর নাম প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম রাখেন হাসান। আর ৬২৬ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে আর একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়, তাঁর নাম প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম রাখেন হুসাইন।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হাসান-হুসাইন- এই দুই নাতিকে অত্যন্ত আদর ও ভালবাসতেন। তিনি হুসাইন রাদি আল্লাহু তা’আলা আনহু সম্পর্কে বলেছে : হুসাইনু মিন্নী ওয়া আনা মিন্ হুসাইন, আহাব্বা আল্লাহু মান্ আহাব্বা হুসাইনা- হুসাইন আমার থেকে আর আমি হুসাইন থেকে, হুসাইনকে যে ভালবাসবে আল্লাহ তাকে ভালবাসবেন (মিরমিযী শরীফ)।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়া সাল্লামের চেহারার সঙ্গে হযরত ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহ তা’আলা আনহুর চেহারার দারুণ মিল ছিল। হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদিআল্লাহ তা’আলা আন্হু থেকে বর্ণিত একখানি হাদিসে আছে যে, লাম ইয়াকুন আহাদুম মিন্হুম আশ্ বাহু বিরসূলিল্লাহি মিনাল হুসাইন বিন আলী আহলে বায়তের মধ্যে হুসাইন ইবনে আলী (রা.) অপেক্ষা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামের অধিক সদৃশ আর কেউ নেই (তিরমিযী শরীফ)। হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হু বর্ণিত একখানি হাদিসে আছে, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হুসাইনকে কাঁধে তুলে নিয়ে হাঁটছিলেন। এক ব্যক্তি তা দেখে হুসাইনকে বললেন : খোকা। তুমি কত উত্তম বাহনে আরোহণ করেছ! এ কথা শুনে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন: আর আরোহীটাও তো কত উত্তম (তিরমিযী শরীফ)।

হযরত ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহ তা’আলা আন্হুর বয়স যখন ছয় বছর তখন তাঁর নানাজান সরকারে দো আলম নূরে মুজাস্সম খাতামুন্নাবীয়ীন হযরত মুহম্মদ মুস্তফা আহমদ মুজতবা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর রফীকুল আলা আল্লাহ্ জাল্লা শানুহুর একান্ত সান্নিধ্যে গিয়ে মিলিত হন আর তাঁর আম্মাজান খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমাতুয্ যাহ্রা রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হা যখন চলে যান তখন তাঁর বয়স মাত্র সাড়ে ছয় বছর।

শৈশবে তিনি নানাজানের সান্নিধ্যে বেশিরভাগ সময় থেকেছেন এবং ইলম, আমল, আখলাক গড়ে তুলেছেন। তাঁর আব্বাজান সম্পর্কে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি হচ্ছি জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঘর আর আলী হচ্ছে তার দরজা। সেই আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহুর কাছ থেকে তিনি বিদ্যা অর্জন করেন। তাঁর আব্বাজান ইসলামের চতুর্থ খলিফা নির্বাচিত হয়ে মদিনা মনওয়ারাকে রাজনৈতিক কর্মকা- থেকে মুক্ত রাখার জন্য এবং মদিনার পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য খিলাফতের রাজধানী মদিনা মনওয়ারা থেকে ইরাকের কুফাতে স্থানান্তরিত করেন।

ইমাম হাসান (রাদি.) ও ইমাম হুসাইন (রাদি.) সহ আলী পরিবারের সদস্যগণও কুফায় চলে আসেন। ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে খারেজীদের নিযুক্ত আততায়ীর তলোয়ারের আঘাতে হযরত আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহু শহীদ হলে হযরত হুসাইন রাদিআল্লাহু তা আলা আন্হু অন্যদের সঙ্গে মদিনা মনওয়ারায় চলে আসেন। এবং অধিকাংশ সময় নানাজানের রওযা মুবারকে অবস্থান করতে থাকেন। ওদিকে নানা ডামাডোলের মধ্য দিয়ে সিরিয়ার গবর্নর হযরত মু’আবিয়া রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হু খলিফা হয়েছেন এবং খিলাফতের রাজধানী কুফা থেকে দামেস্কে নিয়ে গেছেন। হযরত মু’আবিয়া রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হু ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ইন্তিকাল করলে তাঁর ওসিয়াত অনুযায়ী তাঁর পুত্র ইয়াযিদ দামেস্কের মসনদে অধিষ্ঠিত হয়। ইয়াযিদকে খলিফা হিসেবে মেনে নিতে পারেনি তদানীন্তন মুসলিম জগতের একটা বড় অংশ। কুফার জনগণ হযরত ইমাম হুসাইনকে কুফায় এসে খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করার জন্য চিঠির পর চিঠি দিতে থাকে। জানা যায়, কুফাবাসীগণের প্রায় দেড় শতাধিক চিঠি মদিনা মনওয়ারায় ইমাম হুসাইনের নিকট এসে পৌঁছাল।

প্রতিটি চিঠিতে কুফার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের স্বাক্ষর ছিল এবং তাতে এ কথাও ছিল যে কুফার জনগণ চায় আপনি কুফা এসে আব্বা হুজুর হযরত আলী রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহুর রেখে যাওয়া খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করুন। কুফার জনগণ আপনার কুফা আগমনের অপেক্ষায় অধীর হয়ে রয়েছে। কুফা থেকে এই সব চিঠি পেয়ে তিনি তাঁর আত্মীয়স্বজনদের ডেকে কি করবেন তার সিদ্ধান্ত চাইলেন। কেউ কেউ বললেন, আপনি যাবেন না। কুফার জনগণের মত পাল্টাতে দেরি হয় না, আবার কেউ বললেন, আপনার কুফা যাওয়া উচিত, কারণ খিলাফতের যোগ্য উত্তরাধিকারী তো আপনিই।

শেষমেশ হযরত ইমাম হুসাইন (রাদি.) কিছু জ্ঞাতি-গোষ্ঠী ও পরিবার পরিজন নিয়ে মক্কা মুকাররমা এলেন। তিনি এখানে এসে উমরাহ্ পালন করলেন। তিনি ইতোপূর্বে তাঁর চাচাত ভাই মুসলিম বিন আকিল রাদিআল্লাহু আন্হুকে চিঠিগুলোর সত্যতা যাচাই করে তাঁকে কুফার প্রকৃত অবস্থা জানানোর জন্য পাঠালেন। কুফা এসে মুসলিম বিন আকিল দেখলেন সত্যি সত্যিই কুফার নেতৃবৃন্দ ও জনগণ ইমাম হুসাইনকে (রাদি.) মনে মনে খলীফা হিসেবে পেতে চায়। মুসলিমের চিঠি পেয়ে ইমাম হুসাইন কুফা যাবার দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। ওদিকে চিঠি পাঠানোর কয়েক দিনের মধ্যে ইয়াযিদ কর্তৃক কুফার নব নিযুক্ত গবর্নর উবায়দুল্লাহু বিন যিয়াদের হুকুমে মুসলিম বন্দী হলেন এবং তাঁকে হত্যা করা হলো। উবায়দুল্লাহর বাহিনী কুফার জনগণের ওপর এমন জুলুম-নির্যাতন চালাল যে, তাঁরা একদম নিশ্চুপ হয়ে গেলে ইমাম হুসাইন যাতে কুফা প্রবেশ না করতে পারেন সে জন্য রাস্তায় রাস্তায় টহলদার বাহিনী নিযুক্ত করা হলো। এত যে কান্ডকারখানা চলছে তা হযরত হুসাইন (রাদি.) জানতে পারলেন না।

৮ জিলহজ যখন হাজিরা মিনা অভিমুখে রওনা হচ্ছেন ঠিক তখনি হযরত ইমাম হুসাইন (রাদি.) কুফার উদ্দেশে পরিবার-পরিজনসহ ৭৮ জনের একটা কাফেলা নিয়ে মক্কা মুকাররমা থেকে রওনা হলেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কুফার কাছাকাছি হলে তিনি জানতে পারলেন মুসলিমের শাহাদতের খবর। দূর থেকে একজন কবি উটের চলার তালে তালে উচ্চৈঃস্বরে ললিত উচ্চারণে গেয়ে উঠলেন : কাফেলা তুমি চলছ কোথায়? নগরীর তরবারি তোমাদের পক্ষে নয়/অথচ অন্তর তোমাকেই চায়।

ইমাম হুসাইন (বাদি.) কফেলাসহ নগরীর নিকটবর্তী হলে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের টহলদার বাহিনী কর্তৃক বাধাগ্রস্ত হলেন। তারা তাঁকে নগরীতে প্রবেশ করতে দিল না। বাধ্য হয়ে তিনি ফোরাত তীরে অবস্থিত কারবালা প্রান্তে এসে ছাউনি ফেলবেন। সেদিন ছিল পহেলা মুহররম, হিজরী ৬১ সন বুধবার।

পরদিন সকালে দেখা গেল উমর ইবনে সাদ ইবনে ্আবিওয়াক্কাসের নেতৃত্বে একটা বিশাল বাহিনী ইমাম হুসাইন (রাদি.) তাঁবুগুলো ঘেরাও করে চলাচলের সব পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। কয়েকদিন যেতে না যেতেই ইমামের তাঁবুগুলোতে পানির অভাব প্রকটভাবে দেখা দিল। মুইয়া, মুইয়া তথা পানি পানি রব উঠতে লাগল। ফোরাত নদীর পানি আনার পথও রুদ্ধ ছিল। সে এক অবর্ণনীয় করুণ অবস্থা। তিনি শত্রু সেনাদের উদ্দেশে বললেন, কসম আল্লাহ্র। হযরত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের জীবিত নাতি শুধুমাত্র আমিই। আমাকে হারালে তোমরা আমার মতো আর কাউকে পাবে না। তোমরা কেন আমাকে তোমাদের শত্রু ভাবছ? আমি কি কাউকে হত্যা করেছি, আমার দ্বারা তোমাদের কারও কি কোন ক্ষতি হয়েছে?

সেই দীর্ঘ ভাষণের এক পর্যায় তিনি কুফার জনগণ ও নেতৃবৃন্দকে সম্বোধন করে বললেন, তোমরাই তো আমাকে চিঠির পর চিঠি পাঠিয়ে কুফা আসতে বলেছ। তোমরা লিখেছ আমাদের কোন ইমাম নেই, আপনার ইমামতি আমরা মান্য করব। জান-প্রাণ দিয়ে আমরা আপনার পক্ষে কাজ করব।

তাঁর সেই হৃদয়স্পর্শী ভাষণ শেষে হোর নামক একজন অধিনায়ক তাঁর অধীনস্থ সৈন্যদের নিয়ে ইমাম বাহিনীতে এসে যোগ দিয়ে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হলেন। হযরত কাসেম ইবনে হাসান (রাদি.) শহীদ হলেন, শহীদ হলেন দুগ্ধপোষ্য শিশু আলী আসগার। অতঃপর পানির পাত্র হাতে করে দুুলদুল নামক অশ্বে চড়ে ফোরাত কিনারে পৌঁছে পানি নিয়ে ফেরার পথে শত্রুর নিক্ষেপিত বল্লম আর তীরের আঘাতে জর্জরিত হয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। শিমার নামক এক পাষ- তাঁর মস্তক মুবারক দেহ থেকে ছিন্ন করল।

হযরত ইমাম হুসাইন (রাদি.) শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে সত্যের নিশান সমুন্নত হলো। তাঁর সেই শাহাদত যুগে যুগে মুসলিম অন্তরে বিপ্লবী চেতনা জাগ্রত করে।

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা,

ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা.),

সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ

নির্বাচিত সংবাদ