১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নতুন লড়াই ॥ বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় সৌদি আরব

নতুন লড়াই ॥ বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় সৌদি আরব
  • এ বিষয়ে আরও খবর ৫-এর পাতায়;###;সঙ্কট মোকাবেলায় বিশ্ববাজারে বন্ড ছেড়ে ঋণ গ্রহণের সিদ্ধান্ত;###;স্বস্তি ফিরেছে ৬০ লাখ বিদেশী শ্রমিকের

কাওসার রহমান ॥ তেলের সাম্রাজ্য সৌদি আরব অর্থনৈতিক দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন কর্মকা-ে বড় ধরনের কাটছাটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড ছেড়ে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্যয় কমাতে দেশটি জ্বালানি খাতে প্রায় দুই হাজার কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ বাতিল করেছে। পাশাপাশি আর্থিক সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে বৈশ্বিক বন্ড মার্কেট থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে দেশটি তার ঋণের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৫০ শতাংশে নিয়ে যেতে পারে। তেলের দাম প্রত্যাশার চেয়ে অর্ধেকেরও নিচে নেমে যাওয়ার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতেই সৌদি আরব এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিনিয়োগ বাতিল, বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি তেলবিহীন উৎস থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর চেষ্টা করছে দেশটি।

সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম অর্ধেকে নেমে আসায় সৌদি আরব এখন বিপুল পরিমাণ বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায় লড়াই করছে। অর্থনৈতিক এ বিপদ থেকে বাঁচতে দেশটি এখন ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির দিকে নজর দিয়েছে। এ উদ্দেশে ২০১৬ সালে দেশটি ঋণের পরিমাণ বর্তমান জিডিপির ৬.৭ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ১৭.৩ শতাংশ নিয়ে যাবে। পর্যায়ক্রমে এ ঋণের পরিমাণ আগামী পাঁচ বছরে জিডিপির ৫০ শতাংশে নিয়ে যেতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সেক্ষেত্রে দেশটির ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৩৭ হাজার কোটি ডলার। দেশের ভেতর থেকে ঋণ নিয়ে বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে দেশটি ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ বন্ড ছাড়াও শুরু করেছে। ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড ছেড়ে ঋণ গ্রহণের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও।

এ প্রসঙ্গে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবাইর আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘তেল বিক্রির আয় কমলেও সৌদি আরবের আর্থিক অবস্থা বরাবরের মতো ভালই থাকবে। সৌদি আরবের রয়েছে চমৎকার সব অবকাঠামো, ব্যাপক পেশাদারি উদ্যোগ, বিদেশী বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় আইন। আমরা দেখতে পাচ্ছি কি পরিমাণ বিদেশী বিনিয়াগকারী দেশে আসছে।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশী বিনিয়োগ আসার ইঙ্গিত দিলেও দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বড় ধরনের কাটছাট করেছে। চলতি বছর ইতোমধ্যে ২০ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সৌদি ভাইস মিনিস্টার প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান জানিয়েছেন আগাম বছরও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ আট শতাংশ কাটছাট করা হবে। আশির দশকের পর এই প্রথম দেশটি পর পর দুই বছর জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাতিল করেছে। এর ফলে ভবিষ্যতে তেল সরবরাহ হ্রাস পাবে। এই হ্রাসের পরিমাণ দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেল দাঁড়াতে পারে।

তবে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বস্তের পর দেশটিতে কর্মরত ৬০ লাখেরও বেশি বিদেশী শ্রমিকের মধ্যে স্বস্তিভাব ফিরে এসেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, সৌদি বাদশার নির্দেশে দেশে ইকোনমিক এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। এর ফলে দেশে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সমন্বয় সাধন ও গতি সঞ্চার হয়েছে। নতুন কাউন্সিলের সুবাদে দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।

সৌদি কর্মকর্তারা বলছেন, ‘সৌদি আরব এখন আর সঙ্কটে নেই। আমরা ঋণ নিচ্ছি, আমাদের বিপুল পরিমাণ রিজার্ভ রয়েছে। তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস থেকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে আমরা রাজস্ব আয় বাড়াতে নানা কর্মসূচী গ্রহণ করেছি। এসব কর্মসূচী এখন ফল দিতে শুরু করেছে।’

সমালোচকরা অবশ্য বলছেন, এমন পরিকল্পনা দেশটির অর্থনৈতিক দৈন্যদশার চিত্রই ফুটিয়ে তুলেছে। সৌদি সরকারের উচ্চাভিলাষকেই অর্থনীতির এমন ধসের কারণ হিসেবে দেখছেন তারা। দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমশ এতটাই অবনতির দিকে যাচ্ছিল যে, ক্রমশ বহির্দেশীয় সম্পদ বিক্রি করতে হচ্ছে সৌদি ধনকুবের। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থায় নেমে এসেছে। গত বছর যেখানে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৭৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার, বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৬৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলারে।

আন্তর্জাতিক মান সংস্থা স্ট্যান্ডার্ড এ্যান্ড পুওরস’ও দেশ হিসেবে সৌদি আরবের মান অবনমন করেছে। সংস্থাটি সৌদি আরবের রেটিং মান ‘এ’ প্লাস থেকে ‘এ’ মাইনাসে নিয়ে গেছে। সংস্থাটির আশঙ্কা সৌদি আরবের বাজেট ঘাটতি ২০১৫ সালে জিডিপির ১৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে, যা ২০১৪ সালে ছিল মাত্র এক দশমিক ৪ শতাংশ। তেলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা এবং অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি দেশটির আর্থিক অবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। তবে, অপর রেটিং কোম্পানি মুডি’স তাদের রেটিং এখনও পরিবর্তন করেনি। মুডি’স রেটিং হচ্ছে ‘এ’ তিন। এর অর্থ হচ্ছে আর্থিক নীতি দুর্বল, কিন্তু এখনও অর্থনীতি শক্তিশালী।

আর্থিক বিপর্যয়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশটির রাজপরিবারের রাজনীতিতেও দমকা হওয়া বইছে। ব্রিটিশ দৈনিক ‘ইন্ডিপেন্ডেট’ পত্রিকায়ও স্থান পেয়েছে সৌদি রাজপরিবারের ভেতরে জমাট বাধা ক্ষোভ-বিক্ষোভের কথা।

সৌদি আরবের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে আতঙ্ক হয়ে পড়েছিলেন দেশটিতে কর্মরত ৬০ লাখেরও বেশি বিদেশী শ্রমিক। এর মধ্যে ২৬ লাখেরও বেশি বাংলাদেশী। বিপর্যয় কাটিয়ে সৌদি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নানামুখী উদ্যোগে স্বস্তি ফিরে আসছে এই বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর মাঝে। এই প্রবাসীদের মাঝে ছাঁটাই হয়ে দেশে ফিরে আসার আতঙ্ক কাজ করছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশী এই বিপুলসংখ্যক শ্রমিক দেশে ফিরে আসলে দেশের সবচয়ে বড় শ্রমবাজারে ধস নামবে। প্রচ- চাপ সৃষ্টি হবে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর। রেমিট্যান্স প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে। এতে চাপে পড়বে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও। বিশ্লেষকরা অবশ্য সৌদি আরবের শ্রমবাজারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলছেন, সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশীদের ‘মটিভেশন’ করে বিকল্প শ্রমবাজারে তাদের স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে। আর দেশেও প্রস্তুতি রাখতে হবে, যারা ফিরে আসবে তাদের দক্ষ করে বিকল্প শ্রম বাজারে পাঠানোর।

কারণ সৌদি অর্থনীতির বিপর্যয়কর অবস্থার খবর সৌদিবাসীর জন্য যতটা না আতঙ্কের তার চেয়ে বেশি আতঙ্কের সে দেশে কর্মরত বিদেশী শ্রমিকদের। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে বর্তমানে ৬০ লাখেরও বেশি বিদেশী শ্রমিক কর্মরত। এর মধ্যে বাংলাদেশী-ই রয়েছে প্রায় ২৬ লাখ ১৫ হাজারেরও অধিক। যার সঙ্গে জড়িত ২ কোটিরও বেশি আত্মীয়-স্বজন। ৬ বছর একটানা ভিসা বন্ধ না থাকলে বর্তমান সৌদি আরবে প্রবাসী বাংলাদেশীর সংখ্যা অর্ধকোটি ছাড়িয়ে যেত। বর্তমান বিশ্বে সৌদি আরবই হচ্ছে বাংলাদেশের জনশক্তি সবচেয়ে বড় বাজার। একক দেশ হিসেবে এই দেশটি থেকেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আয় হয়। সর্বশেষ গত ২০১৪Ñ১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৫৩০ কোটি ডলারের বেশি। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকেই এসেছে ৩৩৪ কোটি ডলার।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পিকেএসএফ চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘সৌদি অর্থনীতির এই বিপর্যয় অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় না করিয়ে বিলাসী জীবনযাপনের ফল। তাই আমাদেরকে এখন থেকেই বিকল্প চিন্তা করতে হবে। সেখানে কর্মরত বেশির ভাগ বাংলাদেশীই অদক্ষ। তাই তারা দেশে ফিরে এলে তাদের দক্ষতা তৈরি করে আবার বিদেশে পাঠাতো হবে। সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশ থেকে ফিরে আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসনে এখন থেকেই তৈরি থাকতে হবে।’

মূলত চলতি বছরের শুরু থেকেই অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। তেলের দাম কমে যাওয়ার পাশাপাশি ইয়েমেনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ফলে এ চাপ সৃষ্টি হতে থাকে। ইয়েমেনে সৌদি আক্রমণ আরও প্রবলভাবে চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি সই করে সৌদি আরব। এর আওতায় আধুনিক বিভিন্ন যুদ্ধ সরঞ্জামের সঙ্গে সামরিক যুদ্ধ বিমানও রয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনের তৈরি এক বিলিয়ন ডলার দামের দুটি যুদ্ধ জাহাজও কিনছে সৌদি আরব। গত জুলাই মাসে সৌদি আরবের নিকটে পাঁচ দশমিক চার বিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র আর ৫০০ মিলিয়ন ডলারের খুচরা যুদ্ধাস্ত্র, স্থল মাইন ও গ্রেনেড বিক্রির আলোচনা চূড়ান্ত করেছে পেন্টাগন। তারপরও নতুন শক্তিরূপে দেখা দেয়া জঙ্গীগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) মোকাবেলায়ও দেশটিকে জাতীয় নিরাপত্তায় ব্যয় বাড়াতে হয়েছে। এসব করতে গিয়েই সৌদি রাজকোষে টান পড়েছে। ফলে দেখা দিয়েছে বাজেট ঘাটতি। আর্থিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলাই সৌদ আরবের তেল সমৃদ্ধ অর্থনীতিকে নাজুক করে তুলেছে। তবে সৌদি আরব এখন ইয়েমেন যুদ্ধ শেষ করতে চাইছে। দেশটির এই পদক্ষেপকে অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

১৯৩২ সালে সৌদি আরব বিশ্বের একটি অন্যতম দরিদ্র্য দেশ ছিল। দেশটির প্রধান আয়ের উৎস ছিল কৃষি ও হজ্জ। ষাটের দশকে তেল আবিষ্কারের পর সৌদি আরবে রাজস্ব^ আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে দাঁড়ায় পেট্রোডলার। জাতীয় আয়ের শতকরা নব্বই ভাগ আসে তেল রফতানি থেকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়ায় রাজস্ব দ্রুত কমছে। মূলত চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত যোগানই তেলের দাম কমার অন্যতম কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অতিরিক্ত যোগান আসে সৌদি আরব থেকেই। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল ভা-ারের মালিক তারা।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি ১০৬ ছয় মার্কিন ডলার হলে তাদের বাজেটে ঘাটতি থাকে না। কিন্তু এ মুহূর্তে ব্যারেলপ্রতি মূল্য পঞ্চাশের ঘরে ঘোরাফেরা করছে। যার অনিবার্য ফল হিসেবে ২০১৪Ñ১৫ অর্থবছরে সৌদি আরবে প্রায় চল্লিশ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেট ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তেলের দাম আরও কমলে দেশটির অর্থনৈতিক সঙ্কট যে কোথায় পৌঁছাবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। তবে এ অবস্থায় অবশ্য দেশটি বসে নেই। আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে অর্থনৈতিক সঙ্কট উত্তরণের।

২০১৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, দিনে ১ কোটির বেশি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে সৌদি আরব। প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলতে গত বছর থেকেই তেল উৎপাদন বাড়িয়ে সরবরাহে তারল্য ধরে রেখেছে দেশটি। তবে এ নীতি কোন কাজেই আসেনি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

মধ্যপ্রাচ্য সবসময়ই বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। আর এই অঞ্চলে বর্তমানে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় রয়েছে সৌদি আরব, ইরান ও ইসরায়েল। তবে এতদিন এ প্রতিযোগিতায় বেশ পিছিয়ে ছিল ইরান। কিন্তু পরমাণু চুক্তির ফলে দেশটির ওপর থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এরই মধ্যে তেহরান তার বাৎসরিক অপরিশোধিত তেল উৎপাদন দ্বিগুণে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে একদিকে তেলের বাজারে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর আর্বিভাব, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান মার্কিন শেল তেলের বাজার সৌদি আরবকে চিন্তিত করে তুলেছে।

সৌদি আরবের অভ্যন্তরের চিত্রও খুব একটা ভাল নয়। দেশের ভেতরে বর্তমানে সরকারের সবচেয়ে বড় মাথা ব্যথা বেকার সমস্যা। এক হিসেবে জানা যায়, দেশটিতে ১৬ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৯ শতাংশ। তাই বলে সেখানে কর্মসংস্থানের অভাব নেই। বর্তমানে দেশটিতে ৬০ লাখেরও বেশি বিদেশী শ্রমিক কাজ করছে। বিশ্লেষকরা শিক্ষায় অনগ্রসরতা ও পর্যাপ্ত প্রযুক্তিজ্ঞানের অভাবকে দেশটির তরুণ জনগোষ্ঠীর এই পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। সামাজিক অস্থিরতার আশঙ্কায় এই অদক্ষ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছে রিয়াদ। তবে এই বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের ব্যয় বেড়ে যাবে অনেক।

হাতছাড়া হচ্ছে অপরিশোধিত তেলের বাজার ॥ এশিয়া সবসময়ই সৌদি তেল বাণিজ্যের সবচেয়ে লাভজনক বাজার। তবে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এ বাজার হাতছাড়া হতে আর বেশি দেরি নেই। এরই মধ্যে নাইজেরিয়া, ইরাক, মেক্সিকো ও ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আমদানি শুরু করেছে ভারত। অথচ দেশটি এর আগে সৌদি তেলের অন্যতম ক্রেতা ছিল।

পরিশোধিত তেলেও পড়েছে প্রভাব ॥ পরিশোধিত তেলের বাজারের দিকে নজর দিলেও সৌদি আরবের পতন নজরে পড়ে। বাজার ধরে রাখতে এখানেও রাজকীয় সরকার রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করে বসেছে। এশীয় তেল পরিশোধন শিল্পের সঙ্গে চলছে এ লড়াই। দেশটি এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে প্রায় ২৮ লাখ ব্যারেল নিম্ন-সালফার সমৃদ্ধ ডিজেল সরবরাহের ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে এই অঞ্চলে তেলের দাম চরম মন্দায় পড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এশিয়ায় পরিশোধিত তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় পরিশোধক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে এ অঞ্চলে অপরিশোধিত তেলের আমদানি কমে যেতে শুরু করেছে। পড়ন্ত এ বাজার ধরে রাখতে সৌদি আরব বাধ্য হচ্ছে মধ্যম ও ভারি অপরিশোধিত তেলের দাম কমাতে।

রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ॥ ইয়েমেনে অভিযান পরিচালনা, মধ্যপ্রাচ্যে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, আইএস আতঙ্কে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারসহ বিভিন্নখাতে সৌদি সরকারের ব্যয় তুলনামূলক হারে বেড়ে গেছে। কিন্তু সে তুলনায় আয় বাড়েনি। উল্টো বাজার ধরে রাখতে তেলের দাম কমানোয় আয় গেছে কমে। ফলে দেশটি এ ঘাটতি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে পূরণ করতে বাধ্য হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, তেলের মূল্য পতনে ২০১৫ সালে সৌদি আরবের রাজস্ব আয় কম হবে ৩৬০ বিলিয়ন ডলার। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে জিডিপির ২০ শতাংশে। যার পরিমাণ দাঁড়াবে ১০০ থেকে ১৫০ বিলিয়ন ডলার।

সংবাদমাধ্যম সিএনএনও জানিয়েছে, ২০১৫ সালে সৌদি আরবের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ২০ শতাংশে পৌঁছাবে। অনুমান করা হচ্ছে এ বছরের মধ্যেই সরকারের রাজস্ব কমে আসবে ৮২ বিলিয়ন ডলারে, যা জিডিপির আট শতাংশের সমান। অন্যদিকে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বেড়েছে জিডিপির ১৭ শতাংশ, যা আগে ছিল ১০ শতাংশ। এ অবস্থায় দেশটি চলতি বছর নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রার ৬২ মিলিয়ন ডলার খরচ করে ফেলেছে। এমনকি গত জুলাই মাসে স্থানীয় ব্যাংক থেকে দেশটিকে চার বিলিয়ন ডলার ঋণ নিতে হয়েছে।

আইএমএফের শঙ্কা ॥ প্রতিবছর অক্টোবর মাসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল তার বিশ্ব অর্থনৈতিক এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার রিপোর্ট প্রকাশ করে। সর্বেশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের পর এবারই প্রথম ওই অঞ্চলটি অর্থনৈতিক সমস্যায় পরতে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমশ এতটাই অবনতির দিকে যাচ্ছে যে, ক্রমশ বহির্দেশীয় সম্পদ বিক্রি করতে হচ্ছে সৌদি ধনকুবেরদের। আইএমএফের পক্ষ থেকে এই বিপর্যয়ের জন্য সৌদি রাজপরিবারের সদস্যদের অর্থনৈতিক কাঠামোকেই দায়ী করা হচ্ছে। তাদের হিসেব অনুযায়ী, সৌদি রাজপরিবারের ছয়টি শাখার মোট পনেরো হাজার সদস্য রাষ্ট্রীয় বাজেটের বৃহদাংশ ভোগ করে। অর্থাৎ তারা জাতীয় বাজেটের জন্য রাখা অর্থকে বিভিন্ন খাত ঘুরিয়ে নিজেদের প্রয়োজনে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যয় করছে।

শুধুমাত্র জাতীয় আয়ের ওপর সৌদি রাজপরিবারের সদস্যরাই প্রকারান্তে নির্ভরশীল। দেশটির মোট ৩০ মিলিয়ন জনগোষ্ঠী বিভিন্নভাবে এই তেলের অর্থের ওপর নির্ভরশীল। কারণ এখন পর্যন্ত সৌদি আরবের নেই নিজস্ব দক্ষ কর্মীবাহিনী এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের নেই কোন কর্ম অভিজ্ঞতা। বহির্দেশীয় শ্রমিকদের দ্বারাই দেশীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্পোরেট বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে সৌদি রাজপরিবারের সদস্যরা। এছাড়াও সৌদি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে প্রায় ৩০ লাখ সরকারী চাকরি ক্ষেত্র। এই বিশাল সংখ্যা দেখে সহজেই বোঝা যায়, সৌদি আরবে সরকারী সেক্টরের তুলনায় বেসরকারী সেক্টর খুব কম। কিন্তু সৌদি আরবে পরিশ্রমবিমুখ তেল অর্থনীতির ওপর দাঁড়ানোর কারণে জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ ঘটেনি।

আইএমএফের রিপোর্ট অনুযায়ী, আগস্ট মাস নাগাদ বহির্দেশে থাকা রাষ্ট্রীয় সম্পদের মূল্য অনেক কমে গেছে, যার মূল্য আগে ছিল প্রায় ৬৬২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। আর চলতি বছর থেকে সেটা গিয়ে দাঁড়াতে পারে আনুমানিক দেড়শ’ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মুদ্রা তহবিল সংস্থাগুলো অনুমান করছে, ২০২০ সাল আসার আগেই সৌদি আরবকে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারে আনতে হতে পারে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ মতে, যখনই সৌদি আরব ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম কমাতে শুরু করবে তখনই পার্শ্ববর্তী দেশ ইরান ও লিবিয়া তাদের কমমূল্যের অপরিশোধিত তেল নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরবের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যাবে (যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সাম্প্রতিক চুক্তি সেদিকেই ইঙ্গিত করে)। তবে ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য মতে, তেলের বাজারে কয়েক বছরের মধ্যেই ইরাক প্রবেশ করতে পারে।

এ প্রসঙ্গে আইএমএফের মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক পরিচালক মাসুদ আহমেদ বলেন, ‘সৌদি আরবের পক্ষে ব্যয় কমানো একটি কঠিন সিদ্ধান্ত। সেক্ষেত্রে দেশটি ব্যয় কমানোর জন্য বড় বড় প্রকল্প বন্ধ করে দিতে পারে। তেলের বাইরে অন্য খাত থেকে দেশটিকে আয় বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সরকারী ব্যয় কমানোর পথ খুঁজে বের করতে হবে।’

আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ড. মুহাম্মদ মাহবুব আলী বলেন, ‘সৌদি আরবের অর্থনৈতিক বিপর্যয় মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায়। এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে দেশটিতে বিদেশী কর্মী ছাঁটাই করতে হবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপরও চাপ সৃষ্টি হবে। দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ হ্রাস পাবে। তাই এখন থেকেই সরকারকে প্রস্তুতি নিতে হবে। ওখানে যারা কর্মরত তাদের ‘মটিভেশন’ করে অন্য দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আর যারা দেশে ফিরে আসবে তাদের দক্ষ করে পুনরায় বিদেশে পাঠাতে হবে। এজন্য বিকল্প শ্রম বাজার খুঁজতে হবে।’

নির্বাচিত সংবাদ