২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঐশীর ফাঁসি ॥ বাবা-মা হত্যা

ঐশীর ফাঁসি ॥ বাবা-মা হত্যা
  • বন্ধু রনির দু’বছর জেল, জনি খালাস;###;পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড- আদালত

কোর্ট রিপোর্টার ॥ পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান হত্যা মামলায় তাদের একমাত্র মেয়ে ঐশী রহমানকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায়কালে বিচারক বলেছেন, ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত ও নৃশংস হত্যাকা-। তাই মূল অভিযুক্তকে মৃত্যুদ- দেয়া হলো। দুটি হত্যাকা-, তাই প্রতিটির জন্যই আসামিকে মৃত্যুদ-ের (ডাবল ফাঁসি) আদেশ দেয়া হয়। রায় ঘোষণার সময় ঐশী আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

আরেক আসামি ঐশীর বন্ধু মিজানুর রহমান রনিকে খুনের ঘটনার পর ঐশী ও তাদের গৃহকর্মীকে আশ্রয় দেয়ার অপরাধে দুই বছরের জেল ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা না দিলে বাড়তি এক মাস কারাভোগ করতে হবে। ঐশীর আরেক বন্ধু আসাদুজ্জামান জনি মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে মামলার রায় ঘোষণা করেন ঢাকার ৩ নম্বর দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সাঈদ আহমেদ। ঐশীকে মৃত্যুদ-ের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা জরিমানা ও জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছর কারাদ-ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

কারাগারে থাকা দুই আসামি ঐশী রহমান ও আসাদুজ্জামান জনিকে আদালতে হাজির করা হয়। ট্রাইব্যুনালে আসার পর থেকেই বিষণœ ছিলেন ঐশী। কারও সঙ্গে তেমন কোন কথাবার্তা বলেননি। ডান হাতে তসবিহ আর বাম হাতে ইনহেলার ছিল ঐশীর। রায় ঘোষণার পর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেন ঐশী। জামিনে থাকা মিজানুর রহমান রনি ট্রাইব্যুনালে হাজির ছিলেন। সাজা পরোয়ানা দিয়ে ঐশী ও রনিকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল রায়ের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, সারাদেশ যেখানে শিশু নির্যাতনের বিপক্ষে সোচ্চার, সেখানে স্রোতের বিপরীতে গিয়ে অল্পবয়সী একটি মেয়ের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেয়া খুবই কঠিন ছিল। আসামিপক্ষ থেকে ঐশীকে শিশু, ঘটনার সময় ঐশী মাতাল ছিল আর হত্যাকা- ছিল নিছক একটি দুর্ঘটনা- এমন দাবি বিচারক নাকচ করে দেন।

বিচারক বলেন, আদালতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে ঐশীর বয়স ১৮ বছরের বেশি। ঘটনার সময় সে শিশু ছিল না। আর হত্যাকা-টি নিছক দুর্ঘটনা ছিল না। এটি ছিল একটি পরিকল্পিত হত্যাকা-। খুনের আগে সে সময় নিয়েই ঠা-া মাথায় খুন করে।

বিচারক পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, ঐশীর খুন করার ইচ্ছা ছিল মূলত তার মাকে। কিন্তু শুধু মাকে খুন করে তো সে বাঁচতে পারবে না মনে করে তার বাবাকেও খুন করে। এটি ছিল একটি পরিকল্পিত ও নৃশংস হত্যাকা-।

দুটি খুনের জন্য পৃথক দুটি অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। দুটি অপরাধের জন্য আলাদা আলাদা করে তাকে দুইবার ফাঁসি ও ২ বারে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। হাইকোর্টের অনুমোদনসাপেক্ষে এ মৃত্যুদ- কার্যকর করা হবে। আসামি ইচ্ছা করলে বিচারিক ট্রাইব্যুনালের রায় চ্যালেঞ্জ করে ৩০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে আপীল দায়ের করতে পারবে মর্মেও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। ঐশীর আইনজীবী বলেছেন, তারা এ রায়ে সন্তুষ্ট নন। হাইকোর্টে তারা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করবেন।

অপর আসামি গৃহকর্মী খাদিজা আক্তার সুমি অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার মামলাটির বিচার চলছে শিশু আদালতে। গত বছরের ২০ মে সুমির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে সুমিকে জামিন দেন শিশু আদালতের বিচারক জাকিয়া পারভিন। গত বছরের ১ জুন গাজীপুরের কিশোর সংশোধন কেন্দ্র থেকে মা সালমা বেগমের জিম্মায় জামিনে মুক্তি পেয়েছে সে।

২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট রাজধানীর চামেলীবাগে নিজেদের বাসা থেকে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (রাজনৈতিক শাখা) পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন গৃহকর্মী সুমিকে নিয়ে রমনা থানায় আত্মসমর্পণ করেন ঐশী। তার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে গ্রেফতার করা হয় রনি ও জনিকে।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঐশী বলেছিলেন, রাতে বাবা-মায়ের কফিতে তিনি ঘুমের ওষুধ মিশিয়েছিলেন। পরে তারা অচেতন হয়ে পড়লে রনি ও জনিকে নিয়ে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন তাদের। এরপর লাশ দুটি টেনে বাথরুমে নিয়ে রাখা হয়। এ সময় সুমির সহযোগিতা নেয় তারা। সকালে ছোট ভাই ওহী রহমান ও সুমিকে নিয়ে বাসা থেকে পালায় ঐশী। পরদিন সকালে পত্রিকায় বাবা-মার লাশ উদ্ধারের খবর পড়ে রমনা থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন ঐশী।

পরদিন মাহফুজুর রহমানের ছোট ভাই মোঃ মশিউর রহমান রুবেল থানায় হত্যা মামলা করেন। ২০১৪ সালের ৯ মার্চ গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মোঃ আবুল খায়ের মাতুব্বর আদালতে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। তাতে বলা হয়, ঐশী তার বাবা-মাকে হত্যা করেন; তার বন্ধু রনি ও জনি আর গৃহকর্মী সুমি সহযোগিতা করে তাকে।

ঐশী স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিলেও পরে তা অস্বীকার করে বলেন, ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নেয়া হয়েছিল।

অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী ঐশীসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে গত বছরের ৬ মে এ মামলায় অভিযোগ গঠন করেন মহানগর দায়রা জজ আদালত। পরে মামলাটি দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হলে গত বছরের ৩০ নবেম্বর ঢাকার ৩ নম্বর দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ বি এম সাজেদুর রহমান আবার অভিযোগ গঠন করেন। ৫৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ঐশীর চাচাসহ ৩৯ জনের জবানবন্দী নেন আদালত।

রাষ্ট্রপক্ষে বিশেষ প্রসিকিউটর মাহবুবুর রহমান এবং আসামিপক্ষে ফারুক আহমেদ ও মাহবুবুর রহমান রানা গত ২০ অক্টোবর ও ৪ নবেম্বর পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। ১৩ অক্টোবর মামলার প্রধান আসামি ঐশীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয় আদালত। সে সময় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে লিখিত বক্তব্য দাখিল করেন ঐশী। জনি ও রনিও নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার চান।

আসামিপক্ষ বলছে, হত্যাকা-ের সময় ঐশীর বয়স ছিল ১৭ বছর। দেশের সংবিধান অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচের কাউকে শিশু হিসেবে ধরা হয়। সে হিসাবে ঐশীকে মৃত্যুদ- দেয়া ঠিক হয়নি। তাছাড়া হত্যাকা-ের সময় সে মাদকাসক্ত ছিল। উত্তেজনাবশত সে হয়ত এমন কাজ করেছে। এ জন্য তার সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া ঠিক হয়নি।

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, হত্যাকা-ের সময় ঐশীর বয়স যে ১৭ বছর ছিল তা প্রমাণ করতে পারেনি আসামিপক্ষ। বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ ও মেডিক্যাল প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয়েছে হত্যাকা-ের সময় ঐশী সাবালিকা ছিলেন। তাছাড়া হত্যাকা-ের সময় ঐশী হুইস্কি খেয়েছিল বলে আসামিপক্ষ যে দাবি করেছিল, তারা তা প্রমাণ করতে পারেনি।

কেন হত্যাকা- ॥ জবানবন্দীতে ঐশী জানিয়েছিলেন, স্বাধীন জীবনযাপনে বাধা আসায় তিনি হত্যাকা-ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। হত্যার পর তাকে আশ্রয় দেয়ার আশ্বাস দেয় জনি। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে জনি পরে আর ঐশীকে আশ্রয় দেয়নি। ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ঐশী রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ক্লান্ত হয়ে থানায় হাজির হয়। ঐশী জানান, ছয় পাতার ৬০টি ঘুমের ট্যাবলেট কিনে আনেন তিনি। ৩০টি করে ট্যাবলেট তিনি মা-বাবার কফিতে মেশান। মা-বাবা খেয়ে অচেতন হয়ে পড়লে তিনি প্রথমে বাবাকে ছুরিকাঘাত করেন। বাবা গোঙাতে থাকলে ওড়না দিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করার চেষ্টা করেন। বাবার গোঙানির শব্দে মা জেগে ওঠেন। এ সময় মা পানি চান। মাকে পানিও দেন তিনি। পানি খাওয়া শেষ হলে মাকে বেশ কয়েকবার ছুরিকাঘাত করেন তিনি। সর্বশেষ মায়ের শ্বাসনালিতে ছুরিকাঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। অবশ্য তদন্তের একপর্যায়ে ঐশী বাবা-মাকে হত্যার কথা অস্বীকার করে বলেন, ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী নেয়া হয়েছিল। বাবা-মা যখন খুন হন তখন তিনি বাসায় ছিলেন না, কারা ওই হত্যাকা- ঘটিয়েছে তাও তিনি জানেন না।

হত্যার কারণ হিসেবে ঐশী পুলিশকে প্রথমে জানিয়েছিলেন, বাবা-মার অনেক সিদ্ধান্ত তার পছন্দ হয়নি। ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাকে পড়তে বাধ্য করা হয়। এগুলো ঐশীর পছন্দ হয়নি। এরপর তিনি লেখাপড়ায় অমনোযোগী হয়ে পড়েন। পরে বাবা-মাকে খুন করে স্বাধীন হওয়ার চিন্তা করেন।