২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বছরে ২শ’ বিচারক নিয়োগের তাগিদ আইন কমিশনের

  • উচ্চ আদালতসহ নিম্ন আদালতে ৩০ লাখ মামলা জট

বিকাশ দত্ত ॥ দেশে উচ্চ আদালতসহ নিম্ন আদালতগুলোতে বিভিন্ন ধরনের ৩০ লাখ মামলা জটের ধাক্কাটা ঢাকা সিএমএম কোর্টে লেগেছে। সেখানে মামলা নিষ্পত্তি আগের চেয়ে কমে গেছে। সিএমএম আদালতে মামলা নিষ্পত্তির হার ৪৯ দশমিক থেকে নেমে ২৫ দশমিক ৪৫ ভাগে এসেছে। আইন কমিশন তার গবেষণায় দেখেছে ২০০৯ সাল থেকে কোর্ট সাব- ইন্সপেক্টরের পরিবর্তে এপিপি নিয়োগের ফলে এই হ্রাস পেয়েছে। সেক্ষেত্রে কি করে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করা যায় তার জন্য বিচারক নিয়োগসহ বেশ কিছু সুপারিশ করেছে আইন কমিশন। কমিশন মনে করে মামলা জটের কারণে প্রতিবছর দু’শ’ বিচারক নিয়োগ করা প্রয়োজন। ১৬ কোটি জনগণের বিপরীতে বিচারকের পদ রয়েছে ১৬৫৫টি। এর মধ্যে কর্মরত বিচারকের সংখ্যা ১২৭৮ জন। অর্থাৎ ১ লাখ ৪৩ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে এক জন বিচারক রয়েছেন। সুপ্রীমকোর্ট প্রশাসন এবং আইন মন্ত্রণালয় উভয়ই বিচারকদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে সেই লক্ষ্যে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে কোন কিছুই ফলপ্রসূ হবে না। আইন কমিশন সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সিএমএম আদালতে গড় সাজা মামলার হার ছিল ৫১ দশমিক ৬৯ ভাগ। অন্যদিকে ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত গড় সাজা মামলার হার ছিল ৪৩ দশমিক ৫১ ভাগ। আর গড় বিচারের নিষ্পত্তির হার ছিল ২৫ দশমিক ৪৫ ভাগ। কমিশন গবেষণা করে দেখেছে, ২০০৯ সাল থেকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসমূহে মামলা পরিচালনার জন্য কোর্ট সাব- ইন্সপেক্টরের পরিবর্তে এপিপি নিয়োগ করা হয়। কিন্ত এ উদ্যোগ বাস্তব ক্ষেত্রে খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। অধিকাংশ আদালতেই এপিপিগণ নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। কিংবা উপস্থিত থাকলেও সাক্ষী উপস্থাপনে উৎসাহ বোধ করেন না। অনেক সময় সাক্ষী ফেরত দেয়ার ঘটনাও ঘটে থাকে। এর ফলে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসমূহে মামলা নিষ্পত্তি বিঘিœত হচ্ছে।

সিএমএম কোর্টের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যেখানে সিএসআই থাকায় ২০০৮ সালে রুজুকৃত মামলার সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৭৫৭টি, সিএস দাখিল মামলার সংখ্যা ৯০৫২টি, সাজা মামলার সংখ্যা ১৭৮৮, খালাস মামলার সংখ্যা ১৬৯৮, অন্যান্য নিষ্পত্তির মামলার সংখ্যা ২০৩৯, মোট নিষ্পত্তির সংখ্যা ৫৫২৫টি, একইভাবে ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত রুজুকৃত মামলার সংখ্যা ৯৫৯৩৪টি, মোট নিষ্পত্তি কৃত মামলার সংখ্যা ২৯৭৪২টি। গড় বিচারে নিষ্পত্তির হার ৪৯ দশমিক ৩২ ভাগ। একইভাবে যেখানে সিএসআইএর পরিবর্তে এপিপি নিয়োগের ফলে ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত রুজুকৃত মামলার সংখ্যা ১১৫৭৬টি, সিএস দাখিল সংখ্যা ৮৯৬৬৯, সাজা মামলার সংখ্যা ৭১৩২, খালাস মামলার সংখ্যা ৯২৪৭, অন্যান্য নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ৬৪৪৭, মোট নিষ্পত্তিকৃত সংখ্যা ২২৮২৬টি। গড় সাজা মামলার হার ৪৩ দশমিক ৫১ আর গড় বিচারে নিষ্পত্তির কৃত মামলার সংখ্যা ২৫ দশমিক ৪৫ ভাগ।

সাম্প্রতিককালে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা অতিরিক্ত ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসমূহে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর অধীনে প্রদত্ত দ-ের আপীল শুনানির জন্য এপিপি নিয়োগের প্রস্তাব উপস্থাপিত হয়েছে। বেশ কয়েকটি কারণে প্রস্তাবটির যৌক্তিকতা নিরূপণের আবশ্যকতা রয়েছে। আইন কমিশন মনে করে, প্রথমেই খেয়াল রাখতে হবে মোবাইল কোর্টে যে সমস্ত অপরাধের বিচার হয়ে থাকে তা মূলত অপেক্ষাকৃত লঘু প্রকৃতির অপরাধ এবং এই আইনের অধীনে কেবল দোষ স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে দন্ড আরোপিত হয়ে থাকে। অথচ মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর ১৩ ধারাতে এসব অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধের জন্য ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও তৎপর দায়রা আদালত- এই দুটি আলাদা আলাদা আপীল ফোরাম বিদ্যমান রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের মূল আইনে কেবল দায়রা আদালতে আপীলের বিধান ছিল।

বর্তমানে এই আইনের অধীনে একজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক প্রদত্ত সাজার বিপরীতে প্রথমে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে এবং উক্ত আপীল রায়ে সংক্ষুব্ধ হলে অতঃপর দায়রা আদালতে আপীল দায়ের করতে হয়। আবার স্বয়ং ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলে এই একই আইনের আওতায় দ-িত ব্যক্তির জন্য আপীল ফোরাম দুটির বদলে একটি হয়ে যায়, যা সার্বিকভাবে আইনটিকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে। তার চেয়ে বরং সংশ্লিষ্ট চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মোবাইল কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপীলের বিধান রাখা হলে রাষ্ট্রের অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি বিচার প্রার্থীদের হয়রানি লাঘব হতো এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর হতো। বিষয়টি নি¤েœ আরও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

মোবাইল কোর্ট আইনের ১৩ (৫) ধারায় ফৌজদারি কার্যবিধির ৪১২ ধারার কার্যকারিতার কথা উল্লেখ রয়েছে। উক্ত ধারা মোতাবেক এই আইনের অধীনে আপীলের দুটি বিবেচ্য বিষয়ে মধ্যে খবমধষরঃু ড়ভ ঃযব ংবহঃবহপব একটি বিবেচ্য বিষয়। মনে রাখতে হবে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা অতিরিক্ত ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসমূহের বিচারকগণ বিচারকার্য পরিচালনা করলেও তাদের আইনের বুৎপত্তি ও জ্ঞান সর্বক্ষেত্রে যথেষ্ট নাও থাকতে পারে। প্রশ্ন উঠতে পারে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা অতিরিক্ত ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসমূহ, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের প্রদত্ত দ-ের আইনগত বৈধতা নিরূপণের যথাযোগ্য ফোরাম কিনা, কেননা উক্ত বিচারকগণের অনেকেরই আইন বিষয়ে ডিগ্রী ও সম্যক জ্ঞান নাও থাকতে পারে। এমতাবস্থায় মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর অধীন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা অতিরিক্ত ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসমূহের এই আপীল স্তরটিকে অপ্রয়োজনীয় হিসেবে বিবেচনা করলে তা অত্যুক্তি হবে না।

উল্লেখ্য, মোবাইল কোর্ট আইনের ৯ (২) ধারায় আরোপিত অর্থদ- তাৎক্ষণিকভাবে প্রদানের ব্যর্থতায় অনাদায়জনিত কারাদ- তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হওয়ার বিধান রয়েছে এবং এ আইনে জামিন সংক্রান্ত কোন বিধান নেই। ফলে অনেক সময়েই জরমযঃ ঃড় ষরনবৎঃু-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার এই আইন দ্বারা ভূলুণ্ঠিত হয়। কেননা, মোবাইল কোর্ট দ্বারা অর্থদ-ে দ-িত কোন ব্যক্তিকে, সে অর্থদ-ের পরিমাণ যত সামান্যই হোক না কেন, সঙ্গে সঙ্গে প্রদান করতে হচ্ছে এবং ব্যর্থতায় তাৎক্ষণিকভাবে কারাগারে যেতে হচ্ছে। অথচ ফৌজদারি কার্যবিধিতে একই বিষয়ে ৩৮৮ ধারায় চমৎকার একটি বিধান রয়েছে। উক্ত বিধান মোতাবেক আদালত চাইলে আর্থিক দ- কিস্তিতে প্রদান করার আদেশ প্রদান করতে পারে। তা ছাড়া উপযুক্ত ক্ষেত্রে বন্ড গ্রহণের মাধ্যমে দ-িতকে সাময়িকভাবে মুক্তি দিতে পারে। কিন্তু মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর ৩ ধারার কারণে ফৌজদারি কার্যবিধির এই আধুনিক বিধানটি মোবাইল কোর্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ফলে এই আইনের আওতায় প্রদত্ত লঘু অর্থদ- অনেক ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়।

তাছাড়া, এই আইনে জামিনসংক্রান্ত বিধানের অনুপস্থিতির কারণে যদি কোন ব্যক্তিকে একদিনের দ-ও আরোপ করা হয়, সেক্ষেত্রে ‘জামিন’সংক্রান্ত বিধান না থাকায় এই সামান্য দ-ের জন্য ওই ব্যক্তিকে কারাগারে সাজা ভোগ করতে হয়। কেননা দ-িত ব্যক্তি আপীল করার সুযোগ পাওয়ার পূর্বেই তার সাজাভোগ সমাপ্ত হবে এবং যার ফলে ওই আপীলটি অকার্যকর হয়ে পড়বে। মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর উপর্যুক্ত বিষয় সম্পর্কে যথাযোগ্য বিধান অতি সত্বর প্রণয়ন করা না হলে জনস্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই এই আইনটি নিপীড়নমূলক একটি আইনে পর্যবসিত হবে। তাই এ প্রসঙ্গে আশু পদক্ষেপ গ্রহণীয়।

সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, ব্রিটিশ আমল থেকে এমনকি পাকিস্তান আমলেও নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকগণকে বিচারকার্যে নিয়োগ করার পূর্বে যথোপযুক্ত তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হতো। তাদের সার্ভে এ্যান্ড সেটেলমেন্ট ট্রেনিং, ফাউন্ডেশন ট্রেনিং, ল্যান্ড এডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং, জুডিশিয়াল এডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং কোর্স এবং ডেপুটি কমিশনার অফিসসহ সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক দফতরে প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন আদালতে কর্মরত বিচারকের সঙ্গে আদালতে বসে কিছুদিন প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হত। এভাবে প্রায়োগিক ও তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ প্রায় ২ বছরকালীন প্রদান করা হতো। কিন্তু কিছুকাল পূর্বেও অনেক বিচারককে মাত্র ২ সপ্তাহকাল প্রশিক্ষণ প্রদান করার পর বিচার কার্যে সরাসরি পদায়ন করা হয়েছিল। বিচারকদের সে সময় ফৌজদারি মামলায় ৭ দিন এবং দেওয়ানি মোকদ্দমায় ৭ দিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেই বিচারের গুরুদায়িত্ব পালন শুরু করতে হয়। বিচারকের প্রকৃত প্রশিক্ষণ কখনই প্রদান করা হয় না এবং ফলে ভুল-ভ্রান্তির আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায় যা আপীল ও রিভিশনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

নির্বাচিত সংবাদ