১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জননন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন আজ

জননন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন আজ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ নন্দিত নরকে উপন্যাসের মাধ্যমে এ দেশের কথাসাহিত্যে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। ১৯৭২ সালে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছিল উপন্যাসটি। সহজ-সরল ভাষার সঙ্গে সংলাপধর্মী উপন্যাসটি খুব সহজেই আকৃষ্ট করেছিল সাহিত্যানুরাগীদের। পরের গল্পটি শুধুই এগিয়ে যাওয়ার। টানা চার দশক আপন সৃষ্টিশীলতায় মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন পাঠককে। সেই সূত্রে ধারণ করেছেন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও জননন্দিত কথাসাহিত্যিকের পরিচয়টি। কীর্তিমান এই মানুষ একই সঙ্গে সাহিত্য ও শিল্পের বর্ণময় পথে হেঁটেছেন। সরল রেখার মতোই সহজ ছিল তাঁর লেখার ভাষা। গল্প বা উপন্যাসের উদ্দীপক কিংবা রহস্যময় বুনটে বিভোর করে রেখেছিলেন পাঠককে। এ দেশের সাহিত্যভুবনে ভারতীয় লেখকদের একচেটিয়া আধিপত্যকে ম্লান করে আপন লেখনীর অনবদ্যতায় গড়ে দিয়েছেন সৃজনশীল প্রকাশনাশিল্পের ভিত্তিভূমি। একই ভাবে বিচিত্র বিষয়ের নাটক কিংবা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে শিল্পরসিকদের দিয়েছেন বিশুদ্ধ বিনোদনের খোরাক। আজ ১৩ নবেম্বর শুক্রবার বাংলা সাহিত্যের জ্যোতির্ময় এই লেখক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্রকারের ৬৭তম জন্মদিন। ১৯৪৮ সালের এই দিনে তিনি নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। দেশের সবচেয়ে জননন্দিত এই কথাশিল্পীর জন্মবার্ষিকীতে বিশেষ প্রবন্ধ, নিবন্ধসহ বিভিন্ন প্রতিবেদন ছেপেছে পত্রিকাগুলো। লেখকের জন্মদিন উপলক্ষে পরিবারের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠন ও টিভি চ্যানেল গ্রহণ করেছে নানান কর্মসূচী।

বৃহস্পতিবার রাত বারোটার পর লেখকের ধানম-ির ‘দখিন হাওয়া’ ফ্ল্যাটে কাটা হয়েছে জন্মদিনের কেক। হুমায়ূনকে স্মরণ করে দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিতকে নিয়ে কেক কেটেছেন লেখকের সহধর্মিণী মেহের আফরোজ শাওন।

জন্মদিনের আয়োজন প্রসঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই আহসান হাবীব বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে আজ আমরা ভাইবোনরা নূহাশপল্লীতে যাব। সেখানে সমাধিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি জিয়ারত করব। এদিকে দ্বিতীয় সংসার জীবনের স্ত্রী শাওন জানিয়েছেন, একই দিনে তিনিও দুই ছেলেকে নিয়ে নূহাশপল্লীতে যাবেন। সেখানে মিলাদ মাহফিল, এতিমদের মাঝে খাদ্য বিতরণ করা হবে। এছাড়া হুমায়ূন স্মৃতিফলক উদ্বোধনের কথা রয়েছে।

আজ শুক্রবার বিকেলে সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে শুরু হচ্ছে নয় দিনব্যাপী হুমায়ূন আহমেদের একক বইমেলা। হুমায়ূনের প্রকাশকদের আয়োজিত এ মেলার উ™ে^াধন করবেন লেখকের অনুজ শিক্ষাবিদ ও প্রখ্যাত কথাসাহিতিক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল।

হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে আজ চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে এবি ব্যাংক-চ্যানেল আই হিমু মেলা। মেলাটি তৃতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সকাল দশটায় হুমায়ূন আহমেদের পরিবারের সদস্যরা বিশিষ্টজনদের সঙ্গে নিয়ে মেলা উদ্বোধন করবেন। মেলায় থাকবে হুমায়ূন আহমেদের জীবন ও কর্ম নিয়ে বিশিষ্টজনদের স্মৃতিচারণ, হুমায়ূন আহমেদ রচিত সঙ্গীত পরিবেশনা, আবৃত্তি, নৃত্য, চিত্রাঙ্কন ইত্যাদি। মেলার অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করবে চ্যানেল আই।

হুমায়ূন আহমেদের পৈত্রিক বাড়ি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ি ইউনিয়নের কুতুবপুর গ্রামে দিনভর আলোচনা সভা-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানান কর্মসূচীর আয়োজন করা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের বরপুত্র হুমায়ূন আহমেদের হাতে গড়া স্কুল শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী এসব কর্মসূচীর আয়োজন করেছে। কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছেÑ সকালে শহীদ স্মৃৃতি বিদ্যাপীঠের ছাত্রছাত্রীদের কোরান খতম, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। এছাড়া তাঁর জন্মস্থান নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে লেখকের জন্মদিন উদ্যাপনের আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করেছেন স্থানীয়রা।

হুমায়ূনভক্ত তরুণ প্রজন্মের সংগঠন হিমু পরিবহন বৃহস্পতিবার রক্তদান কর্মসূচী পালন করেছে। সংগৃহীত রক্ত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঢামেকে যেসব রোগীর কেমোথেরাপি দেয়া হবে তাদের অর্থ সহায়তা দেবে হিমু পরিবহন। এছাড়া আজ শুক্রবার হিমু পরিবহন ও হিমু পরিবার আলাদভাবে হলুদ পাঞ্জাবি পরে কেক কেটে দিনটি উদযাপন করবে।

হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৩ নবেম্বর নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর হাতে শহীদ হন। রতœগর্ভা আয়েশা ফয়েজ এই লেখকের মা।

পাঠক বিবেচনায় হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। উপন্যাসে নিজের প্রতিভার বিস্তার ঘটলেও তাঁর শুরুটা ছিল কবিতা দিয়ে। এরপর নাটক, শিশুসাহিত্য, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, চলচ্চিত্র পরিচালনা থেকে শিল্প-সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর। হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জনকও বটে। ১৯৭২ সালে প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশের পর পরই তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। উপন্যাস ও নাটকে তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো বিশেষ করে ‘হিমু’, ‘মিসির আলী’, ‘শুভ্র’ তরুণ-তরুণীদের কাছে হয়ে ওঠে অনুকরণীয়। বলা হয়, তাঁর লেখা পছন্দ করেন না এমন মানুষও তাঁর নতুন লেখাটি গোপনে পড়ে ফেলেন। দেশে এমন মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়, যারা তাঁর অন্তত একটি নাটক দেখেননি বা তাঁর কোন বই পড়েননি।

হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাসের সংখ্যা দুই শতাধিক। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নন্দিত নরকে, লীলাবতী, কবি, শঙ্খনীল কারাগার, মন্দ্রসপ্তক, দূরে কোথায়, সৌরভ, ফেরা, কৃষ্ণপক্ষ, সাজঘর, বাসর, গৌরীপুর জংশন, নৃপতি, অমানুষ, বহুব্রীহি, এইসব দিনরাত্রি, দারুচীনি দ্বীপ, শুভ্র, নক্ষত্রের রাত, কোথাও কেউ নেই, আগুনের পরশমনি, শ্রাবণ মেঘের দিন, বৃষ্টি ও মেঘমালা, মেঘ বলেছে যাবো যাবো, জোছনা ও জননীর গল্প, দেয়াল, বাদশাহ নামদার প্রভৃতি। রচনা ও পরিচালনা করেছেন বহু একক ও ধারাবাহিক নাটক। পরিচালনা করেছেন চলচ্চিত্রও। তাঁর সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’র জন্য জয় করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

হুমায়ূন আহমেদ দীর্ঘ চার দশকের সাহিত্যজীবনে বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এরমধ্যে রয়েছে একুশে পদক (১৯৯৪), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮১), হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০), লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), মাইকেল মধুসূধন দত্ত পুরস্কার (১৯৮৭), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩ ও ১৯৯৪), বাচসাস পুরস্কার (১৯৮৮) ইত্যাদি। দেশের বাইরেও সম্মানিত হয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ। জাপানের ‘এনএইচকে’ টেলিভিশন তাঁকে নিয়ে ‘হু ইস হু ইন এশিয়া’ শিরোনামে পনেরো মিনিটের একটি ডকুমেন্টারি প্রচার করে।

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হুমায়ূন আহমেদ।

নুহাশ পল্লীতে হুমায়ূন আহমেদের ভাস্কর্য উন্মোচিত হবে আজ ॥ নুহাশ পল্লীর ব্যবস্থাপক বুলবুল আহমেদ জানান, গাজীপুরের নুহাশ পল্লীতে শুক্রবার সকাল আটটায় হুমায়ূন আহমেদের ম্যুরাল উন্মোচন করা হবে। হুমায়ূন আহমেদের সহধর্মিণী মেহের আফরোজ শাওন এটি উন্মোচন করবেন।