১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুক্তবুদ্ধি চর্চায় আঘাত

  • অঞ্জন আচার্য

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল এদেশের বুদ্ধিজীবীদের। দেশকে মেধাশূন্য করার ষড়যন্ত্রে মেতেছিল পাকিস্তানি বাহিনী, আলবদর ও রাজাকাররা। মুক্তিযুদ্ধের ৪৪ বছর পর যেন পুনরাবৃত্তি ঘটছে সেই ঘটনারই। দেশের তরুণ প্রজন্মের মেধাবী লেখকদের টার্গেট করে ঘাতকের দল হত্যা করছে ভবিষ্যত বুদ্ধিজীবীদের। একের পর এক আঘাত হানছে তারা মুক্তবুদ্ধি চর্চার ওপর। দিনের পর দিন হত্যা করছে বিজ্ঞান-মনস্ক, যুক্তিবাদী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী লেখকদের। এই সব লেখকদের বলা হচ্ছে ব্লগার। যেন ব্লগার একটি গালি। কিন্তু বাস্তবে যা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি লেখার স্থান। আর এই ব্লগার বলে যাদের হত্যা করা হচ্ছে তাদের বিষয়টিকে কিভাবে বিশ্লেষণ করেন বিশিষ্টজনেরা? সেই সঙ্গে এই ক্রান্তিকাল থেকে উত্তরণ বা পরিত্রাণের উপায় কী হতে পারে- তাও উঠে এসেছে তাঁদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘২০১৩ সালে ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা রাজীব হায়দারকে খুন করল, সেই থেকে একের পর এক ব্লগার এবং লেখকদের হত্যা করে আসছে। তার আগেও তারা হুমায়ুন আজাদকে হত্যা করেছে। এটা তো জানাই যাচ্ছে যে, অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশ করার জন্য ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা হয়েছে; আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলের ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা ভিন্নমতের ওপর আক্রমণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ। এটা আমাদের জন্য খুব বড় আশঙ্কার বিষয়। আর এসব হত্যাকাণ্ডের যে তদন্ত হচ্ছে, তার গতি এতই ধীর- আমরা কোন ফল দেখতে পাচ্ছি না। ওয়াশিকুর রহমান বাবুর ক্ষেত্রে তৃতীয় লিঙ্গের কয়েকজন মানুষ দুজন অপরাধীকে হাতেনাতে ধরে দিল, সে ঘটনায়ও তদন্তের খুব একটা অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে হয় না। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে তারা তদন্ত করছে, অভিযোগপত্র তৈরি করছে; কিন্তু এখনও পর্যন্ত ফলপ্রসূ কিছু ঘটছে না। এটা আমাদের আরও বড় উদ্বেগের বিষয়।’

তিনি মনে করেন, ‘অপরাধীদের যদি দ্রুত আইনের আওতায় না আনা যায়, তাহলে এ ধরনের অপরাধ আরও ঘটতে থাকবে। তাছাড়া আমরা তো দেখছি এগুলো ধারাবাহিক ঘটনা, সেখানে এটাকে ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা বলার কোন সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। সংঘবদ্ধ জঙ্গীবাদী গোষ্ঠী ভিন্নমতের লোকদের আক্রমণ ও হত্যা করছে, সেই হত্যা-আক্রমণের দায়ও স্বীকার করছে, প্রতি মাসে একজনকে হত্যা করবে বলে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এটা কোনভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উপেক্ষা করা যায় না। এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা চোখ বন্ধ করে রাখার শামিল। অন্যদিকে যারা এসব আক্রমণ পরিচালনা করছে, হত্যা করছে, তারা তো কোন যুক্তিতর্কের মধ্যে যাচ্ছে না, গেলে তো তারা লিখেই প্রতিবাদ করত। যারা সহিংসতা করছে, যারা হত্যা করছে, তারা তো সিদ্ধান্তই নিয়েছে যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মধ্যে না গিয়ে শারীরিক বলপ্রয়োগের মধ্য দিয়ে তারা সবকিছু করবে। আজকে আমাকে আমার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সাবধানে চলাফেরা করতে বলছেন। স্বাধীন দেশে কেন আমাকে এই ধরনের সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ শুনতে হবে? যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে আছেন, এটার জন্য আমরা অবশ্যই তাদের দায়ী করব। সংবিধানে যেসব স্বাধীনতার অঙ্গীকার করা হয়েছে, তার মধ্যে ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাক্্স্বাধীনতা- এগুলো যাতে মানুষ প্রয়োগ করতে পারে, সেই নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকে দিতে হবে।’

এ ধরনের ঘটনার পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতিই দায়ী বলে মনে করেন শিক্ষাবিদ, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তাঁর মতে, সময়টা খুবই আশঙ্কাজনক। একের পর অপরাধ হচ্ছে, হত্যাকাণ্ড ঘটছে, অপরাধীরা ধরা পড়ছে না, বিচার হচ্ছে না, শাস্তি হচ্ছে না। আর অপরাধীরা ধরা পড়ছে না বলেই অপরাধ বাড়ছে। অপরাধের মাত্রাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরের সূত্রে জানা যায়, অপরাধীরা জামিন পাচ্ছে, ছাড়া পেয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। অপরাধীরা মনে করছে যে, ‘তাদের কোন কিছুই হবে না।’ আমাদের মনে রাখতে হবে, এই যে মুক্তবুদ্ধি চর্চার ওপর আঘাত, তা অন্য আর সব ফৌজদারি অপরাধের মতো নয়। এখানে একটা মতাদর্শগত লড়াই চলছে। রাষ্ট্রের ভিত্তিতে আঘাত আনা হচ্ছে। তবে রাষ্ট্র পরিচালক সেটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে না। এমনিতেই অপরাধীরা মনে করছে, যদি তারা শাস্তি পায়, তবে ধর্মীয়ভাবে তারা শহীদ হবে। তার ওপরে রাষ্ট্রীয় আইনেও তারা শাস্তি পাচ্ছে না। কাজেই তারা মনে করে, এভাবে পার পাওয়া যাবে এবং এটা তাদের পক্ষে অনেকটা বীরত্বপূর্ণ কাজে পরিণত হয়েছে।’

তিনি মনে করেন, ‘যারা লিখছে তারা তো অপরাধ করেনি, নিজের মতপ্রকাশ করছে মাত্র। তারা বৈজ্ঞানিকভাবেই তা লিখছে, কোন ধর্মীয় আক্রমণের জন্য লিখছে না। তারপরেও তাদের ওপর একের পর এক হামলা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, কেউ বিষয়টাকে সেভাবে গুরুত্বও দিচ্ছে না। রাষ্ট্র গুরুত্ব দিচ্ছে না, সমাজও গুরুত্ব দিচ্ছে না। এর থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে, রাষ্ট্রকে সজাগ হতে হবে। রাষ্ট্র কেবল চিন্তার স্বাধীনতাকে রক্ষা করবে, তা নয়। জঙ্গীরা আক্রমণ করছে রাষ্ট্রের ভিত্তি- যে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়ার কথা- সেই ভিত্তির ওপর আক্রমণ করছে। তারা যে জঙ্গী তৎপরতা চালাচ্ছে, বিদেশীরা তাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে। বিদেশী মানে বিদেশী পরাশক্তি। এছাড়া এ ধরনের অপরাধকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলার কোন সুযোগ নেই। এটা তো বোঝাই যাচ্ছে যে, সুপরিকল্পিত। আর তারা জঙ্গী বা অন্য যে নামেই আসুক, তাদের একটাই কাজ- রাষ্ট্রের মূলনীতিকে আঘাত করা। এটাকে মোকাবেলা করার জন্য প্রচলিত আইনের সংস্কার দরকার। আর সমস্যাটিকে এককভাবে তুলে না ধরে দলীয়ভাবে উপস্থাপন করতে হবে। সেই সঙ্গে সরকারের উচিত গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করে জনগণকে তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়েই এর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। দিনকে দিন এদেশে জনগণ বড় বেশি উদাসীন হয়ে পড়ছে। এটা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। মানুষ ভাবছে, ‘এটা তো আমার কোন সমস্যা নয়, আমি কেন এর মধ্যে যাব? তারা হয়ত ভাবছে, এটা রাষ্ট্রের ব্যাপার, আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপার। জঙ্গীরা কী করছে, তাতে আমাদের কী?’Ñ এ ধরনের ভাবনা উদাসীনতার ফল। প্রকাশ্যে চাপাতি দিয়ে একটা মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করা হচ্ছে, অথচ কেউ তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসছে না। ভাবছে, এর সঙ্গে জড়ালে নিজের ক্ষতি হতে পারে, ঝামেলায় পড়তে পারেÑ এই মনোবৃত্তি সামগ্রিক উদাসীনতারই ফসল। এই সমস্যা যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কোন সমস্যা নয়; সামষ্টিক সমস্যাÑ এটা জনগণকে বোঝাতে হবে। এর সঙ্গে তার ও তার সন্তানের ভবিষ্যত জড়িত, সেই বোধটা তাকে জাগিয়ে দিতে হবে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচার পতন আন্দোলনÑ সবই সম্ভব হয়েছে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে। বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ করে, দেশের এই ক্রান্তিকালে জনগণকে একাত্ম করতে হবে রাষ্ট্রশাসকদের।’

এদিকে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক অনেকটা হতাশার স্বরে বলেন, ‘আমি মনে করি, গণতান্ত্রিক দেশে এ আঘাত গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর আঘাত, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ওপর আঘাত। আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনা যারা করছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাদের হাতে আছে, তারা এখনো কেন সমস্ত শক্তি নিয়ে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে না? এটা কি তাদের দুর্বলতা? কতগুলো ছেলে এভাবে মরে গেল, কতগুলো ছেলে!’ এটি অক্ষম রাষ্ট্রেরই নমুনা। দেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে একটা অসম অবস্থা বিরাজ করছে। এ বছরের প্রথম দিকে লেখকদের ঐক্যের জন্য যে ডাক দিয়েছিলাম, সেই ডাকে সাড়া দিয়ে এই ক্রান্তিকালে যদি লেখক-সাহিত্যিকরা এগিয়ে আসতেন, তাহলে এই ধরনের পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ পাওয়া যেত। কিন্তু ঢাকায় অবস্থান না করায় এই ডাক প্রতিধ্বনিহীনভাবে মরে গেছে। আমি আশা করেছিলাম, আমি যেহেতু ঢাকায় না, যারা ঢাকায় থাকেন তারা কিছু করবেন। কিন্তু তা আর হলো কই?’

তিনি মনে করেন, ‘এভাবে দিনের পর দিন চলতে থাকলে দেশের প্রচলিত আইন ভেঙ্গে পড়বে। গণতন্ত্র কাজ করবে না। আমাদের কাছে তো অস্ত্র নেই। কলমই আমাদের একমাত্র অস্ত্র। আমরা লেখালেখি করতে পারি, মানববন্ধন করতে পারি, প্রতিবাদ সমাবেশ করতে পারি। সশস্ত্র আন্দোলন তো করতে পারি না। এটা আমাদের কাজ নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকারকে আমরা অর্থ দিচ্ছি। আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। লেখক, ব্লগার, প্রকাশক, বিদেশী নাগরিকÑ এদের হত্যা কোনভাবে মেনে নেয়া যায় না। অবিলম্বে এটা বন্ধ করতে হবে। যে কোন উপায়েই হোক সেটা প্রতিরোধ করতে হবে। হত্যাকারীরা সুপরিকল্পিতভাবে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এটা স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্র হতে পারে না। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার যদি এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ করতে না পারেন তবে সবকিছু ভেঙ্গে পড়বে। সেই সঙ্গে সামগ্রিকভাবে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মুক্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাই আমি।’

কবি মোহাম্মদ রফিক অনেকটা ক্ষোভের সঙ্গেই তাঁর অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের মূল সমস্যা হচ্ছে জনগণের সাংস্কৃতিক অধঃপতন ঘটেছে। এটাকে উজ্জীবিত করতে হবে। রুচিকে সমৃদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক মান বৃদ্ধি করতে হবে। সামগ্রিক বোধের জাগরণ না ঘটলে এই সঙ্কট মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। যার যার অবস্থান থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমরা সবসময় সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকিÑ সরকার কী করবে? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী করবে? তবে এ কথাও সত্য, সরকারকে সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে রাষ্ট্রের এই ধসে পড়া অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় বের করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এই সমস্যা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়; এটি সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সমস্যা। এর জন্য রাস্তায় নামতে হবে। ঘরে বসে, অডিটরিয়ামে বসে সভা-সমাবেশ করে কোন লাভ হবে না। আমি মনে করি, মুক্ত মনের চর্চাটাকেই বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এটাকে প্রতিরোধ করার পথ কী, তা আমাদেরই ভাবতে হবে। আমাদের সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু উগ্রবাদীদের হাতে নিহত শেষ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড দেখে একটা জিনিস পরিষ্কার যে, ঘরও আজ নিরাপদ নয়। সন্ত্রাসীরা ঘরে-অফিসে গিয়ে গিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। তবে লুকিয়ে থেকে এই পশুশক্তির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। কিন্তু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরা একে ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা বলছেন। অথচ দেশে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ঘটছে। একে বিচ্ছিন্ন বলা হয় কী করে! হুমায়ুন আজাদ থেকে শুরু করে ব্লগ লেখকদের হত্যার পর এখন প্রকাশকদের হত্যাকাণ্ডে আমার মনে হয়, আমাদের অমর একুশে বইমেলাকেই বন্ধ করে দেয়ার একটি প্রক্রিয়া চলছে। কারণ উগ্রবাদীরা অনেক আগে থেকেই বাংলা একাডেমি আয়োজিত এই বইমেলাকে বন্ধের জন্যও হুমকি দিয়ে আসছে বারবার। এরা দেশটাকে পুরোপুরি মধ্যযুগের মূর্খামির ভেতর নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঁয়তারা করছে। কিন্তু এদেরকে ঠেকানোটা আমাদের একটা কর্তব্য। জাতীয় কর্তব্য। পবিত্র কর্তব্য।’

তাঁর মতে, ‘আমাদের অবস্থান সিরিয়া, সৌদি আরবÑ এদের মতো নয়। তাই আমাদের দেশে এই ধরনের ঘটনা ঘটবে আর আমরা সহ্য করে যাব মুখ বুজে, এটা তো হতে পারে না। আমরা ভাষা ও স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছি। ভবিষ্যতে রক্ত দিয়ে হলেও জঙ্গীবাদীদের প্রতিহত করতে হবে। তরুণদের এ ব্যাপারে উৎসাহী হওয়া উচিত। কারণ সব সময় তরুণ প্রজন্মই সামনে এগিয়ে যাওয়ার জোয়ালটা কাঁধে তুলে নেয়। আর সরকার যদি দ্বিধাগ্রস্থ না হতো, সরকার যদি স্পষ্ট ভূমিকা রাখত বা এগিয়ে আসত, তাহলে এই ধরনের ঘটনা পুনঃ পুনঃ ঘটত না।’

মানুষের মধ্যে মানবিক চেতনা বোধের জাগরণ প্রয়োজন বলে মনে করেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, শুধু আইন দিয়ে এটা রোধ করা সম্ভব নয়। মানুষের শুভ চেতনাকে জাগিয়ে এটিকে মোকাবেলা করতে হবে। স্কুল-কলেজগুলোয় জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের যে উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করেছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীদের মানবিক বোধে উজ্জীবিত করতে হবে। সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যুদ্ধাপরাধের বিচারকে সামনে রেখে একটি গোষ্ঠী দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে তৎপর হয়ে উঠেছে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। পত্রিকা পড়ে জানতে পারলাম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত ‘জঙ্গীবাদ প্রতিরোধ এবং প্রতিকার জাতীয় কমিটি’ প্রায় অকেজো। ৬৪ জেলার কমিটিগুলোরও তদারকি নেই। এমনকি কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকাণ্ড চালু করতে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে অনুমোদন পাওয়ার পরও তা শুরু হয়নি। এখনও দেশে ৪৭টি জঙ্গী সংগঠন সক্রিয় আছে বলে জানা গেছে। এটা তো খুবই আশঙ্কার বিষয়। এটা রাষ্ট্রকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এর জন্য সামাজিক বোধ, মানবিক বোধের বিকাশ ঘটানো খুবই জরুরী। এছাড়া সাক্ষী সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিকুর রহমান বাবুর দুই হত্যাকারীকে হাতেনাতে ধরে ফেলে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। তবে পত্রিকায় পড়েছি, তারাই এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এদের নিরাপত্তা দেয়া সরকারের দায়িত্ব।’

অন্যদিকে অধ্যাপক, লেখক, কলামিস্ট মুনতাসীর মামুনের মতে, ‘আমি মনে করি, আমাদের দেশের প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার জরুরী। এটা না করা হলে, এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে। তাছাড়া অনেকে মনে করতে পারেন, যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রক্রিয়া শেষ হলেই, এই জঙ্গী তৎপরতা বন্ধ হয়ে যাবে। এটা মোটেও ঠিক নয়। যুদ্ধাপরাধের বিচারের পরেও এটা চালিয়ে যাবে জঙ্গীরা। কারণ জঙ্গীদের এজেন্ডা ভিন্ন। এর সঙ্গে দেশীয়-আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী যুক্ত আছে। এক্ষেত্রে জঙ্গীদের পৃষ্ঠপোষকদের খুঁজে বের করতে হবে। জঙ্গী দমনে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সরকারের উচিত তাদের কার্যক্রমের সঙ্গে জনগণকে সম্পৃক্ত করা। সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অপশক্তির তৎপরতা কমে আসবে। নইলে দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ভঙ্গুর হয়ে পড়বে।’

সামাজিক অবক্ষয় তুলে ধরে নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আমরা যে সমাজে বাস করি, সেই সমাজটা তো আমরা ভেঙ্গে ফেলেছি। এখানে ধর্মভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠছে। সরকার নিজেকে সেক্যুলার হিসেবে দাবি করলেও, এর যথাযথ প্রতিফলন তো আমরা দেখতে পারছি না। এখন এমন এক সময় পার করছি, সেখানে ধর্ম নিয়ে লেখা তো দূরের কথা; বিজ্ঞানমনস্কও হওয়া যাবে না। বিজ্ঞানচেতনা থাকাই যেন কারও জন্য অপরাধ। অভিজিতের বই আমি পড়েছি। সে তো ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লেখেনি। বিজ্ঞানের জটিল বিষয়কে কী চমৎকার সহজ-সরলভাবে তুলে ধরেছে তার বইয়ে। অথচ তাকে হত্যা করা হলো। আমরা যারা আছি, তারা তো চাপাতির বিরুদ্ধে চাপাতি নিয়ে দাঁড়াতে পারি না। আমরা কেবল সদ্য সন্তানহারা পিতা আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো বলতে পারিÑ ‘শুভবুদ্ধির উদয় হোক।’

এদিকে শিক্ষাবিদ, অধ্যাপক শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার দাবি করে বলেন, ‘যেভাবে মানুষকে নৃশংসভাবে মারা হচ্ছে, তা ভাবতেই পারছি না। হুমায়ুন আজাদ থেকে জঙ্গীদের এই অপতৎপরতা শুরু হয়েছে। কোন বিচার হচ্ছে না, শাস্তি হচ্ছে না। এতে জঙ্গীরা উৎসাহী হচ্ছে। জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপনকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। তার মতো নম্র, ভদ্র, শিক্ষিত, রুচিবান ছেলেকেও তারা হত্যা করেছে। আমার প্রশ্ন হলো, চোখের সামনে এসব ঘাতককে তৈরি করছে কারা, সেটা খুঁজে বের করতে হবে। তাদের উৎসমূলে আঘাত হানতে হবে। মূল উৎপাটন করতে হবে। নইলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। তাছাড়া মাদ্রাসা, কোচিং সেন্টারগুলোয় কী শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, সেখানে সরকারী নজরদারি দরকার। শিশু-কিশোরদের জিহাদি শিক্ষা দিচ্ছে, মগজ ধোলাই করছে কারা, সেটাও বের করতে হবে। জিহাদি তৈরির কারখানাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো ধ্বংস করতে হবে। তবে আমি মনে করি, সবাই যে গরিব ঘরের সন্তান তা কিন্তু নয়; অনেক ধনী পরিবারের সন্তানরাও এই জঙ্গী তৎপরতায় জড়িয়ে পড়ছে। রাজীব হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের আমরা দেখেছি, তারা রাজধানীর একটি প্রতিষ্ঠিত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাই আবারও বলি, বাংলাদেশকে যারা পাকিস্তান বানাতে চায়, তালেবান রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, তাদের মূলটা নষ্ট করতে হবে। এর জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ তো আছেই, পাশাপাশি সর্বস্তরে সাংস্কৃতিক বিকাশ ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাও জরুরী।

প্রকাশক, লেখক মফিদুল হক বলেন, ‘মুক্তবুদ্ধি চর্চার ওপর হামলা আমরা সাধারণত বিশেষ ধ্যান-ধারণা বহনকারী বিশেষ কোন গোষ্ঠীর ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচনা করি। অথচ এই হামলা যে গোটা সমাজের বিরুদ্ধে, সামাজিক চিন্তার বৃত্ত প্রসারিত করবার যাবতীয় চেষ্টার বিরুদ্ধে, সেটা আমরা বুঝতে প্রায়শ ভুল করি। যখন মুক্তবুদ্ধির কোন ব্যক্তির ওপর হিংস্র আঘাত হানা হয়, তখন অনেক সময় ঐ ব্যক্তির মতাদর্শ বা চিন্তার ধরন বিবেচনা করতে শুরু করি আমরা। অথচ সেই চিন্তার সঙ্গে আমার একমত হওয়া বা সেই চিন্তা অনুমোদন করার প্রশ্ন এখানে নেই। আমাদের প্রতিবাদ নির্ভর করবে অন্যতর দৃষ্টিভঙ্গির ওপর, আমি সমাজের ও মানুষের বহুত্ববাদ মানি কি মানি না, সেই ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে আমাদের ভূমিকা। সাম্প্রতিককালে বেশ লেখালেখি হচ্ছে ‘ব্লগারদের’ ওপর হামলা নিয়ে, সেইসঙ্গে বিশেষণ যুক্ত করে কখনও বলা হচ্ছে ‘মুক্তমনা ব্লগার’দের ওপর হামলা হচ্ছে। প্রথমত, ব্লগ তো আত্মপ্রকাশের একটি বিশেষ মাধ্যম, সম্প্রতি উদ্ভূত যে সামাজিক মাধ্যমে বহু ধরনের মতের প্রকাশ আমরা দেখি, মতের সংঘাতও সেখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কেউ কাগজের ওপর কালি দিয়ে লেখে কিনা, অন্য কেউ টাচস্ক্রিনে আঙ্গুলের ডগার ছোঁয়ায় লেখে কিনা সেটা যেমন বিবেচ্য নয়, তেমনি ‘ব্লগার’ শব্দবদ্ধ দ্বারা কোন বিশেষ মত ও পথের মানুষকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায় না। আর যদি বলা হয় মুক্তমনা, ফ্রি থিংকার্স, সেটা তো সব মানুষের কাছেই কাম্য, সবাই যে তা হতে পারেন তা নয়। তাহলে কেন আমাদের সমাজে ‘মুক্তমনা ব্লগার’ হিসেবে চিহ্নিত করে চিন্তাশীল তরুণদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং হচ্ছে?

বিষয়টি প্রথমত এবং সর্বাগ্রে ক্রিমিনাল এ্যাক্ট হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এই ধরনের আঘাত এমন ঘৃণ্য অপরাধ যা কোন সভ্য সমাজ মান্য করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে প্রধান দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের। একের পর এক হত্যাকাণ্ড যারা ঘটিয়ে চলেছে তাদের স্বরূপ উšে§াচন, অপরাধী চক্রের হোতাদের গ্রেফতার এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ ব্যতীত এই দুর্ভাগ্যজনক অবস্থা থেকে আমাদের পরিত্রাণ মিলবে না। সেইসঙ্গে সামগ্রিক দৃষ্টিতে পরিস্থিতি বিচার বহন করে বিশেষ গুরুত্ব। বহুত্ববাদ সমাজের প্রাণধর্ম, বলপূর্বক তা অস্বীকারের চেষ্টা জš§ দেয় অনেক বড় সঙ্কট। এক্ষেত্রে আইনগত প্রতিরোধ নেয়ার বিষয়টি ক্রমাগত গুরুত্ব অর্জন করছে, ঘৃণার প্রচার ও ঘৃণাসঞ্চারী পদক্ষেপ অঙ্কুরেই রুদ্ধ করার জন্য আইনী ও সামাজিক ব্যবস্থা গ্রহণ সম্প্রতি গুরুত্ব অর্জন করছে। হেইট ক্যাম্পেইন যখন সশস্ত্র আঘাতের রূপ নেয়, তখন তা হয়ে ওঠে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাথাব্যথার কারণ। কিন্তু সামাজিকভাবে এর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ তো অতীব জরুরী। ধর্মকে অবলম্বন করে ঘৃণা প্রচার যে ব্যাপকতা লাভ করছে তার সঙ্গে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই। মানুষকে অমানুষ করে তুলতে উচ্চ আদর্শের অপব্যবহার ঘটেছে ইতিহাসে যুগে যুগে। ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণ তাই আজ হয়ে উঠেছে বিশেষ জরুরী।’