২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মৃত্যু ও নান্দনিক ভাবনা

  • জুলফিয়া ইসলাম

মৃত্যুকে ঘিরে মানবজীবনের নানা ভাবনা, কৌতূহল, প্রশ্ন ও উপলব্ধি থেকে যায়। মৃত্যু কী, মৃত্যুর উদ্দেশ্য, মৃত্যুতেই কী জীবনের অবসান? কিংবা মৃত্যু ও জীবনে কোন সংযোগসূত্র আছে? ইত্যাদি প্রশ্ন যুগ যুগ ধরে মানুষকে আলোড়িত করছে। যুগ যুগ ধরে এর সমাধানের জন্য মানুষ গবেষণাও করে যাচ্ছে।

মৃত্যু চিন্তার সঙ্গে জীবনের পরিণাম, সৃষ্টির রহস্য, জন্মান্তর প্রভৃতি প্রশ্ন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। মৃত্যুকে নিয়ে নান্দনিক ভাবনা এটুকু বিলাসিতা বলেই মনে হবে নিঃসন্দেহে।

ইউরোপ ও আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশে চিকিৎসা বিজ্ঞান উপশাখায় আর্ট ও মিউজিক থেরাপিতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ডিগ্রী দেয়া হচ্ছে। ভারতে মিউজিক থেরাপির ওপর উচ্চতর শিক্ষা ব্যবস্থা আছে। পৃথিবীর উন্নত অনুন্নত বহু দেশেই চিকিৎসায় সঙ্গীত, চিত্রকলাসহ অন্যান্য শিল্পকলার ব্যবহার হচ্ছে।

প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে সঙ্গীত চিকিৎসার কথা বলা আছে। চিকিৎসা শাস্ত্রে সঙ্গীতের কথা বলতে গেলে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। সঙ্গীত মানুষের শরীরের ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর প্রভাব বিস্তার করে।

আমরা ছোট শিশুদের যখন ঘুম পাড়াই তখন ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে থাকি। পরীক্ষা করে দেখা গেছে গর্ভস্থ শিশু সঙ্গীতে সাড়া দেয়। সঙ্গীতে মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি, মাংসপেশীর স্থিতিস্থাপকতা, হরমোন নিঃসরণ, রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন প্রভৃতির ওপর প্রভাব বিস্তার করে।

প্রাচীন বিভিন্ন শাস্ত্রে সঙ্গীত চিকিৎসার কথা উল্লেখ আছে। মুসলিম চিন্তাবিদ আল ফারাবী চিকিৎসায় সঙ্গীত নিয়ে বই লিখেছেন। ইউরোপের রবার্ট বাউনও ‘মেডিসিনা মিউজিকা’ নামে একটি বই লিখেছেন। এই বইটি প্রকাশিত হয় ১৭২৯ সালে। বইটিতে মিউজিক থেরাপির ওপর বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।

আরব বিশ্বে চিকিৎসায় সঙ্গীতের প্রভাব দীর্ঘদিনের। পৃথিবীর অনেক দেশে মানসিক রোগীদের জন্য চিকিৎসার অংশ হিসেবে সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়।

ঢোল, বাদ্যসহ চিকিৎসার বিষয়টি ভারত, উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকায় বহু আগে থেকেই চালু আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ট্রমা আক্রান্ত রোগীদের সঙ্গীত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হতো।

গবেষণায় দেখা গেছে স্ট্রোকের কারণে স্নায়ুতন্ত্রের যে ক্ষতি হয় অর্থাৎ প্যারালাইসিসের জটিলতাগুলো নিরাময়ে রিহ্যাবিলিটেটিভ কর্মকা-ের সঙ্গে সঙ্গীতকে যুক্ত করলে অতি দ্রুত নিরাময় ঘটে।

কারণ হাসপাতালের পরিবেশ সব সময় আশঙ্কা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। সঙ্গীত এ অবস্থাকে অনেকটা প্রশমিত করে দেয়। সুরের সঙ্গে হৃৎপি-ের গতির সম্পর্ক আছে। এ জন্য হাসপাতালের প্রি-অপারেটিভ রুম এবং লেবার রুমে সঙ্গীতকে সংযোজন করা হয়েছে শুধু রোগীর মানসিক স্থিতিশীলতা এবং ব্যথা নিরাময়ের জন্য। ঘুমপাড়ানি গানের সুর শিশুর মনে শান্তি ও নিরাপত্তা জোগায়। স্ট্রেস উপশমের জন্য মিউজিক থেরাপি অত্যন্ত জরুরী।

এছাড়াও দেখা গেছে, মানসিক চাপ বা আবেগগত বিপর্যয়ে থাকা কোন মানুষকে সঙ্গীতের জগতে নিয়ে গিয়ে সঙ্কট প্রশমন করা যায়। মানুষের অনেক অব্যক্ত অনুভূতি আবেগ এবং ভাবনা সুরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করে দিয়ে মনকে প্রশমিত করা যায়। একজন মৃত্যুপথযাত্রী রোগীও আর্ট থেরাপির মাধ্যমে একটি নান্দনিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হতে পারেন।

তবে যে দেশে ন্যূনতম ওষুধ যোগাড় করতে আমাদের চিকিৎসালয়গুলোতে নাভিশ্বাস উঠছে, সেখানে মৃত্যুতে শিল্পকলার ব্যবহার স্রেফ বিলাসিতা মনে হবে।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন মৃত্যু যে দিন তার সামনে এসে দাঁড়াবে তিনি তাকে শূন্য হাতে বিদায় করবেন না। দেবেন শ্রেষ্ঠ উপহার।

জীবন যদি হয় ফুলফোটার কাল মৃত্যু তার পরিণতির ফসল। অর্থাৎ মৃত্যুর মধ্য দিয়েই জীবনের পরিপূর্ণতা। কবির ভাষায় : ‘পুরাতনের হৃদয় টুটে আপনি নতুন উঠবে ছুটে/জীবনে ফুল ফোটা হলে মরণে ফল ফলবে।’ (গীতালিী)।

জীবন ও মৃত্যু আপাতদৃষ্টিতে যথাক্রমে আরম্ভ এবং শেষ। কিন্তু বস্তুত তা নয়। এই দুই মিলে এক অবিচ্ছন্ন প্রক্রিয়া চলছে চক্রক্রমেÑ আরম্ভ থেকে শেষ, আবার শেষ থেকে আরম্ভ। ‘শেষ কহে, একদিন সব শেষ হবে,

হে আরম্ভ, বৃথা তব অহঙ্কার তবে।

আরম্ভ কহিল, ভাই যেথা শেষ হয়,

সেইখানে পুনরায় আরম্ভ উদয়।’