২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উনিশ শতকের আলোকিত গদ্যশিল্পী মীর মশাররফ হোসেন

  • লিটন আব্বাস

মীর মশাররফ হোসেন মুসলিম বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাসিক। ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুসলমান গদ্যশিল্পী। ‘বিষাদ-সিন্ধু’ গ্রন্থে তাঁর এই পরিচয় সুস্পষ্ট। শ্রীব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মশাররফ হোসেনের অবদান সম্পর্কে উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্যে হিন্দু ও মুসলমানের দান সম্পর্কে যদি স্বতন্ত্রভাবে বিচার করা চলে, তাহা হইলে বলিতে হইবে, একদিকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের যে দান, অন্যদিকে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ প্রণেতা মীর মশাররফ হোসেনের স্থান ঠিক অনুরূপ। এদেশের মুসলমান সমাজে তিনিই সর্বপ্রথম সাহিত্য শিল্পী এবং এখন পর্যন্ত তিনিই প্রধান সাহিত্য শিল্পী হইয়া আছেন।” উনিশ শতকের আলোকিত গদ্যকার কুষ্টিয়ার কুমারখালীর গড়াই তীরবর্তী লাহিনীপাড়ার সম্ভ্রান্ত সৈয়দ পরিবারে মীর মশাররফ হোসেন (তদানীন্তন নদীয়া জেলায়) ১৮৪৭ খ্রীস্টাব্দের ১৩ নবেম্বর (২৮ কার্তিক ১২৫৪ বাংলা) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ মীর মুয়াজ্জম হোসেন এবং মাতার নাম দৌলতুন্নিসা। ‘মীর’ দিল্লীর মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের দেয়া খেতাব। মীর মশাররফ হোসেনের প্রপিতামহের পিতা সৈয়দ কুতুবুল্লাহ ‘মীর’ খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন। শেষ জীবনে তিনি রাজবাড়ীর পদমদীর নবাব এস্টেটের ম্যানেজার নিযুক্ত হন।

১৯১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর ৬৪ বছরে তিনি ইন্তেকাল করেন। পদমদীর মাটিতেই মীর মশাররফ হোসেন চিরনিদ্রায় শায়িত। মীর মশাররফ হোসেনের উত্তর বংশধরদের মধ্যে তাঁর কন্যার পক্ষের বংশধররাই বিদ্যমান। মীর মশাররফ হোসেনের আত্মচরিত ‘আমার জীবন’ পাঠে জানা যায় যে, তিনি ছাত্রজীবন হতেই সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ঐতিহাসিক ‘গ্রামবার্ত্তা’র সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার ছিলেন তাঁর সাহিত্য গুরু। কাঙাল হরিনাথের ‘গ্রামবার্ত্তা’ ও ঈশ্বরগুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ নামক পত্রিকা দুটিতে লিখেই তাঁর সাহিত্যচর্চা ক্রমশ পরিণত লাভ করে। তাঁর পূর্বে বাংলা গদ্যে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য লেখক দেখা যায় না। তাঁর সাহিত্যকর্ম একদিকে যেমন অসাধারণ বৈচিত্র্যে ভরপুর, অন্যদিকে তেমনি প্রাচুর্যের দৃষ্টান্ত। মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্য প্রতিভাকে এক কথায় বিস্ময়কর বলা যায়।

আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও এবং সাধারণ গ্রামীণ পরিবেশে জীবন-যাপন করেও সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রে তিনি যে গভীর জ্ঞান, অন্তর্দৃষ্টি ও নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন তা একান্তই দুর্লভ। রচনার বৈচিত্র্যে ও প্রাচুর্যের দিক থেকে সমসাময়িককালে একমাত্র বঙ্কিমচন্দ্রের সাথে পরিণত প্রতিভাসম্পন্ন মীর মশারফের তুলনা চলে। সাহিত্যের এমন কোন শাখা নেই যে তাঁর স্পর্শ পড়েনি। বৈচিত্র্যময় প্রতিভার প্রকাশ ঘটে একাধারে গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রহসন, কবিতা, সঙ্গীত, প্রবন্ধ গীতাভিনয়, আত্মজীবনী, রস-রচনা, ইসলামী সাহিত্য ও শিশু সাহিত্য সব মিলিয়ে মীর মশাররফ হোসেনের গ্রন্থের সংখ্যা ৪০ খানা। ১৮৬৯ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘রতœাবতী’ প্রকাশিত হওয়ার পর বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় তাঁর গদ্য রচনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। ড. আনিসুজ্জামান তাঁর ‘মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য’ গ্রন্থে মীর মশাররফের ২৫টি গ্রন্থের উল্লেখ করেছেন, ড. কাজী দীন মুহাম্মদ তাঁর এক প্রবন্ধে সর্বমোট ৩৫টি ও ড. আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমি পত্রিকায় আরো অতিরিক্ত ৪টি বইয়ের সন্ধান দিয়েছেন। মীর মশাররফ হোসেনের উপন্যাস ‘রতœাবতী-১৮৬৯’, ‘বিষাদ-সিন্ধু’ (মহররম পর্ব ১৮৭৬, ‘উর্দ্ধার পর্ব’ ১৮৭৭, ‘এজিদ বধ পর্ব’ ১৮৯০), আত্মোপন্যাস ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ ১৮৯০, রস-রচনা ‘গাজী মিয়ার বস্তানী’ ১৮৯৯, ‘আমার জীবনী’ ১৯০৮, ‘বসন্ত কুমারী’ ও জমিদার দর্পণ’ ১৮৭৩, ‘বেহুলা গীতাভিনয় (১৮৮৯), টাকা অভিনয়’ (১৮৯৯), প্রবন্ধ ‘বিবি কুলসুম’ ১৯১০, প্রহসন ‘এর উপায় কি’ (১৮৭৬), ‘ভাই ভাই, এই তো চাই’ (১৮৯৯), ‘ফাঁস কাগজ’ ‘একি’ ১৮৮৯), প্রবন্ধ ‘গো-জীবন (১৮৮৯), ‘হযরত ইউসুফ (আ.)’ (১৯০০)।

পাঠ্যপুস্তক প্রবন্ধ ‘মুসলমানদের বাংলা শিক্ষা’ ১৯০৩’, কাব্য ‘গোরাই ব্রিজ’ (১৯৭৩), ‘সঙ্গীত লহরী’ ১৮৮৭, ‘পঞ্চনারী (১৮৯৯), প্রেম পারিজাত (১৯০৫) কবিতা ‘মোসলেম বীরত্ব’ ১৯০৭ ও শিশুতোষ রচনা ‘বৃহৎ হীরক খনি’।

শুধু সৃষ্টিশীল সাহিত্য কর্মই নয়। মীর মশাররফ হোসেন আজিজুন নিসা ও ‘হিতকরী’ নামে দুটি মাসিক পত্রিকাও সম্পাদনা করেন। বহুমুখী সাহিত্য প্রতিভার অধিকারী হলেও মীর মশাররফ হোসেনের মৌলিকত্ব ও কৃতিত্ব প্রধানত গদ্যশিল্পী হিসেবে।

ki.liton84@gmail.com