১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বই ॥ আলোকিত পদক্ষেপ

  • সিরাজুল এহসান

ম. মনিরউজ্জামান এমন এক অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যেখানে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির অনেক উজ্জ্বল নক্ষত্র জন্ম নিয়েছিলেন, প্রয়োজনে অবস্থান করেছেন দীর্ঘসময়; কারো কারো জন্ম অন্যত্র হলেও এখানে ঘটেছে দেহাবসান। দেশের এই পশ্চিমাঞ্চলটি সাহিত্য-সংস্কৃতির জন্য ভৌগোলিক সুবিধা নিয়ে বিরাজ করছে বলেই কি এমনটা ঘটছে? কৌতূহলী মানুষের এমন জিজ্ঞাসা অনেকদিনের। যেখানে মরমী সাধক, বাউল শ্রেষ্ঠ লালনের অধিষ্ঠান, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্মোহনী মায়ার টান, কাঙাল হরিনাথ মজুমদার কিংবা মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতিধন্য সেখানে জন্ম নেয়া এক ভাবুক মন আর সাংস্কৃতিক সংগঠক ম. মনিরউজ্জামান যে এমন বলয়ে আবদ্ধ হবেন তা বলাই বাহুল্য।

ম. মনিরউজ্জামান কুষ্টিয়া শহরের এক সম্ভ্রান্ত ও প্রগতিশীল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার এক উদার জমিন তিনি পান অনেকটা উত্তরাধিকার সূত্রেই। ক্রমে তার নানা প্রতিভার উন্মেষ ঘটে। রবীন্দ্র-লালন, নজরুল, মীর মশাররফ বা কাঙাল হরিনাথে তিনি মজে যান। এ সব মনীষীর ভাবাদর্শ প্রচার সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সাংগঠনিক কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রেখে বৃহত্তর কুষ্টিয়ার গ-ি পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়েও তিনি হয়ে ওঠেন বিশিষ্ট। দেশের বাইরে বিশেষত পশ্চিমবঙ্গেও তিনি হন সমাদৃত।

একজন লেখক, গবেষক, সংগঠক, অভিনেতা হিসেবে কুষ্টিয়ায় সবার প্রিয় ‘মনি ভাই’ হয়ে ওঠেন এই অজাতশত্রু ও অসাম্প্রদায়িক মানুষটি। কষ্টদায়ক কথা এই যে, এ ব্যক্তিটিকে আমাদের হারাতে হয়েছে নিকট অতীতে। এসব মানুষ হারানো আমাদের শিল্প-সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতি। কেননা সৃষ্টিশীল মানুষ হয়তো সৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু দক্ষ সংগঠকের সৃষ্টি এখন বিরল। একজন সংগঠক একদিনে তৈরি হয় না, দিনে দিনে তিলে তিলে গড়ে ওঠে। সংগঠককে সইতে হয় অনেক কিছু। ব্যর্থতার দায় তার কাঁধে পড়ে। সাফল্যের জন্য ধন্যবাদ জোটে খুবই কম।

ম. মনিরউজ্জামান এক অর্থে ভাগ্যবান এ জন্য যে তার মৃত্যুর এক বছরের মধ্যেই তাকে নিয়ে স্মারক গ্রন্থ আমরা হাতে পেয়েছি। আমাদের দেশে সাধারণত মৃত্যুর আগে তো কোনো স্বীকৃতি মেলেই না, মৃত্যুর পরও অনেকে রাখে না মনে। ম. মনিরউজ্জামান যে তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন তা স্মারকগ্রন্থ পাঠ করলেই বোঝা যায়। এই সময় এমন একজন মানুষকে পেতে চায়। সম্পাদকীয় নোট থেকে জানা যায়, শতাধিক লেখা জমা পড়েছিল। এর মধ্য থেকে ৯২ জনের লেখা প্রকাশিত হয়েছে। জাতীয় ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে তরুণতম সাহিত্য-সংস্কৃতিসেবী মানুষটিও করেছেন স্মৃতি তর্পণ, জানিয়েছেন শ্রদ্ধাঞ্জলি।

বিশিষ্ট গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী স্মৃতি তর্পণ করে প্রিয় সখাকে নিয়ে লেখেন এভাবে- ‘মানুষকে আকর্ষণ করার- ভালোবাসার- সহজেই আপন করে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল মনির। সজ্জন বন্ধুবৎসল বা সৌম্য সহিষ্ণু বলতে যা বোঝায় ও তাই ছিল। আবার একটু অবিন্যস্ত ঢিলে-ঢালা ও অলস প্রকৃতিরও মানুষ ও। এ নিয়ে কাছের বন্ধুরা ঠাট্টা মশকরাও করত মাঝে মধ্যে। কিন্তু এতে ওর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখিনি- বরঞ্চ এসব বিষয় ও নিজেও হাসিমুখে উপভোগ করত। মজলিশি মেজাজ থাকলেও আসরে বাসরে কখনো প্রগলভ হতে দেখিনি। স্নিগ্ধ মেজাজের মানুষ ছিল ও- মালিন্য ছিল না ওর স্বভাবে।’...

ম. মনিরউজ্জামান চরিত, রচনাবলীর পরিচিতি, চিঠিপত্র ও আলোকচিত্র স্মারক গ্রন্থের বিশেষত্ব ও গুরুত্ব বাড়িয়েছে। যারা এ গ্রন্থটি প্রকাশ ও সম্পাদনার উদ্যোগ নিয়েছেন তারা অবশ্যই সাধুবাদ পাবার যোগ্য। এত দ্রুত একটি গ্রন্থের জন্য লেখা সংগ্রহ, সম্পাদনা ও প্রকাশ যেমন কষ্টসাধ্য তেমনি ব্যয়ের ব্যাপারও বটে। মফস্বলে এমন নিবেদিতপাণ অনেক মানুষ আছেন যাদের নিয়ে এ ধরনের প্রকাশনা করলে অন্তত তাদের প্রতি কিছুটা হলেও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এমন অনুকরণযোগ্য উদ্যোগ আরো অনেকে অনুসরণ করবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।