১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লেখার ইচ্ছেটা ফুরিয়ে যেতে পারে পড়ার ইচ্ছে ফুরাবে না

  • -সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম

কথা সাহিত্যে সার্বিক অবদানের জন্য এবার হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন ষাট দশকের শক্তিমান কথা সাহিত্যিক শওকত আলী। একই সঙ্গে নবীন শাখায় পুরস্কার পেয়েছেন সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম। এ সময়ে যারা ভাল গল্প লিখছেন তিনি তাদের একজন। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি জড়িত আছেন সাংবাদিকতায়ও। ২০০৮ সাল থেকে কাজ করছেন এটিএন বাংলার নিউজ এ্যান্ড কারেন্ট এ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টের উর্ধতন বার্তা সম্পাদক হিসেবে। ২০১৩ সালের বইমেলায় অনন্যা থেকে প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘পা’। সাহিত্যচর্চা, সাংবাদিকতা নিয়ে সাদিয়া মাহজাবীন ইমামের সঙ্গে কথা বলেছেন মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

লিখতে শুরু করলেন কীভাবে?

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম : প্রথম বোধহয় ছোটবেলায় ডায়রি লেখা থেকে শুরু বলা যায়, তাই না? এরপর একটা সময় মনে হলো কথাগুলো শুধু নিজের থাকছে। আশপাশের মানুষের সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে পারলে তখন নিজের শব্দ-বাক্য অর্থপূর্ণ মনে হয়। এমন একটা ভাবনা থেকে প্রকাশের ইচ্ছে। প্রথম দিকে আর্টিকেল লিখতাম এরপর গল্প। গল্পেই স্বাচ্ছন্দ্য বেশি আমার।

আপনি তো সংবাদিকতাও করেন। একজন পেশাগত সাংবাদিক হিসেবে আপনি কি মনে করেন সাংবাদিকতা পেশা লেখকদের লেখার পথে অন্তরায়?

দু’রকমই। কখনো মনে হয় অন্তরায়। গল্প লিখতে হলে বাতাস থেকে শব্দ নিয়ে আসতে হয়, কবিতাও তাই। কিন্তু একটা ভাবনা ধরুন আপনার পরিচিত কোন ঘটনার সঙ্গে মিলে গেল তখন নিরপেক্ষভাবে লিখতে কষ্ট হয়। অনেক কিছু বাদ দিতে হয় যেটা হয়ত আপনি ফেলে দিতে পারছেন না। আবার অন্তরায় না হয়ে বরং সাপোর্টিভ মনে হয় কখনো। কারণ দুটি কাজেই কিন্তু লেখার সঙ্গে থাকতে হয়, ভাবনা নিয়ে। এবং এমন অনেক জীবনের গল্প সাংবাদিকতা পেশার কারণে শোনা হয় বা জানা হয় যেটা হয়ত এই পেশায় না থাকলে আমার কাছে পৌঁছাত না। সেটাও গল্পের খোরাক যোগায়। তখন মনে হয় লেখালেখির জন্য আমার পেশা বরং সুবিধের।

আপনার প্রিয় লেখক কারা? যাঁদের কাছ থেকে আপনি শিখেছেন, লিখতে উৎসাহিত হয়েছেন?

তলস্তয়, গোর্কী, মানিক, তারাশংকরের লেখায় এত ডিটেইল থাকে বার বার পড়া যায়। সম্প্রতি খুব বুঁদ হয়ে পড়ছি স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ছোটগল্প। খুব ভেঙ্গেচুরে লিখেছেন স্বপ্নময়। গল্প লেখার আগ্রহটা বিশ্ব সাহিত্যের কাছ থেকেই। এক একটা ছোটগল্প পড়ে যখন মনে হয়েছে আরে এতো আমারই কথা বা আমার দেখা কোন ঘটনাই বলা হয়েছে তখন লেখার আগ্রহ হয়েছে। আবার কখনো যে কথা সরাসরি প্রকাশ করতে পারিনি মনে হয়েছে লিখতে গেলে তা পরিপূর্ণ হয়।

আপনার একমাত্র প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ পা। এই বইয়েরই ‘পা’ গল্পটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয় সংবলিত। এ গল্প সম্পর্কে কিছু বলুন।

গল্প আসলে নিজেই বলে দেয়া ঘটনা। একটা মানসিক দ্বন্দ্ব তারপর নিজের ভেতরে ভেতরে তা নিয়ে যে টানাপড়েন আর সেই অনুভূতি কতদূর নিয়ে যেতে পারে একটা মানুষকে এমন একটা ভাবনাই পা গল্প। এর চেয়ে বেশি কিছু বলার নেই।

গল্পের উপকরণ সংগ্রহে আপনি কি পথ অবলম্বন করেন?

সংগ্রহের বিষয়ে সচেতনভাবে কোন লেখকই মনে হয় না কোন পথ খুঁজেন তবে মানুষ যখন তার নিজের গল্প করে খুব আগ্রহ নিয়ে শুনি। কখনো না চাইতেই একটা লাইন শুনে একটা গল্প হয়ে যায়, কখনো অনেক গল্প শুনেও গল্পের কিছু পাই না। নতুন কোথাও গেলে সেখানকার মানুষদের যাপিত জীবনও গল্প সংগ্রহের একটা বিষয় অবশ্য।

একজন নারী হিসেবে সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে কখনো কোন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন কি?

তেমন কোন প্রতিবন্ধকতা পাইনি বাইরে থেকে তবে কিছু কিছু লেখার সময় মনে হয়েছে নারী না হলে স্বাচ্ছন্দ্যে আরও অনেক কথা লিখতে পারতাম। পাঠকের মধ্যে আমার পরিচিত মানুষও থাকেন যারা হয়ত ব্যক্তি মানুষের সঙ্গে গল্পটা মেলাতে চান। এক্ষেত্রে একজন পুরুষ যত স্বাধীনভাবে লিখতে পারে একজন নারীর হয়ত প্রকাশের সঙ্কোচ থাকে আমাদের সমাজে। তবে একে ঠিক নারী-পুরুষ বিভেদ না করে ব্যক্তি সত্তার পার্থক্য বলাই হয়ত ভাল হবে।

একজন গল্পকারের চোখে বর্তমান সমাজের নারীদের কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

যারা প্রান্তিক তাদের কথা তো সবাই জানি কিন্তু যেসব নারীরা এগিয়ে আছেন তাদের অনেকেই হয়ত প্রগতি আর অতি প্রগতির পার্থক্যটা বুঝতে পারেন না।

সাহিত্য নিয়ে আপনার স্বপ্ন ও পরিকল্পনা জানতে চাই।

নিজের আনন্দ-ভাললাগা থেকে গল্প লিখি তবে তার চেয়ে বেশি পড়তে ভাললাগে। কখনো হয়ত লেখার ইচ্ছেটা ফুরিয়ে যেতে পারে কিন্তু এটুকু জানি পড়ার ইচ্ছেটা ফুরোবে না। মধ্যবিত্তের জীবন বেশি দেখা হয় বলে সেসব কথাই গল্পে বেশি আসে কিন্তু সীমান্তের মানুষ আর শরণার্থীদের জীবন নিয়ে গল্প লিখতে ইচ্ছে করে।

লেখালেখির জন্য আর্থিক সংগতি বা অসংগতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এ সম্পর্কে নবীনদের উদ্দেশে কিছু বলুন?

একটা ভাবনাকে ভেতরে লালন করে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করার জন্য যেমন স্বচ্ছলতা বা বোঝাপড়ার পরিবেশ চাই তেমনি আবার অনেক মহৎ সৃষ্টি কিন্তু নিদারুণ দৈন্য, রাস্তার পাশে বসেও তৈরি হয়েছে। এটা বেশ জটিল প্রশ্ন এর বেশিকিছু বলতে পারব না।

আপনি এ বছর তরুণ ও নবীন ক্যাটাগরিতে ‘হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার’ পেলেন। পুরস্কার পেয়ে কেমন লাগছে?

পুরস্কার প্রাপ্তি যে কারও জন্যই আনন্দের বিষয়। আমি আনন্দিত হয়েছি। বিশেষত পুরস্কার পাওয়ার পর এত এত শুভাকাক্সিক্ষ আমাকে ফোন করে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন যে, আমি অভিভূত হয়েছি। পাঠকদের ভালবাসা পাওয়া বড় একটি ব্যাপার। সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছি শওকত আলী স্যারের মতো শক্তিমান কথাসাহিত্যিকের সঙ্গে আমি এ পুরস্কার পেয়েছি। এটি আমার জন্য অনেক বড় একটি সৌভাগ্যের বিষয়। পুরস্কারপ্রাপ্তি আমার পথ চলতে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার ক্ষেত্র হয়ে থাকবে।