১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন কলসিন্দুরের নারী ফুটবলারদের

স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশের প্রমীলা ফুটবলের অন্যতম সূতিকাগার হিসেবে ইতোমধ্যে সুপরিচিত হয়ে উঠেছে কলসিন্দুর গ্রাম। ময়মনসিংহ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই গ্রাম থেকে উঠে এসেছে একঝাঁক সম্ভাবনাময় প্রতিশ্রুতিশীল নারী ফুটবলার। অসাধারণ ফুটবলশৈলীর কারণে যাদের অনেককে এখন ডাকা হয় ‘কলসিন্দুরের মেসি’ নামে।

ময়মনসিংহ সদর থেকে ৮ কিলোমিটার উত্তরে ধোবাউড়া উপজেলার ২নং গামারীতলা ইউনিয়নে কলসিন্দুর গ্রামের অবস্থান। এই গ্রামেই অবস্থিত কলসিন্দুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। অনেক কিছু দিয়ে নাম কামানো গেলেও এই বিদ্যালয়ের মেয়ে শিক্ষার্থীরা ফুটবল মাঠে দুরন্তপনা দেখিয়ে সবার নজর কেড়েছেন। পড়ালেখার পাশাপাশি এই বিদ্যালয় থেকে উঠে আসছে জাতীয় পর্যায়ের নারী ফুটবলার। ইতোমধ্যেই ধারাবাহিক দুর্দান্ত সাফল্য দেখিয়ে হৈচৈ ফেলে দিয়েছেন তহুরা, মার্জিয়া, সানজিদারা।

লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক ও নান্দনিক বিকাশে খেলাধুলার গুরুত্ব অনেক। এ উপলব্ধি থেকেই প্রাথমিক পর্যায়ের সব শিক্ষার্থীকে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালে জাতীয়ভাবে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালে জাতির পিতার সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিদর্শন স্বরূপ প্রাথমিক পর্যায়ের মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়। গত ৮ জুন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০১৪ ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০১৪ এর ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের ফাইনালে কলসিন্দুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। তারা রংপুরের পলিচরা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ১-০ গোলে পরাজিত করে। কলসিন্দুরের হয়ে একমাত্র গোলটি করেন রোজিনা আক্তার।

সাফল্যের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখে কলসিন্দুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। গত ৪ নবেম্বর আরও একটি শিরোপা জয় করে ময়মনসিংহের এই স্কুল। বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলায় কলসিন্দুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় দল রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মাজবাড়ী হুরন্নেছা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ৮-০ গোলে উড়িয়ে দেয়। নজরকাড়া এই সাফল্যের পর প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই বিদ্যালয়টিকে নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বিদ্যালয়টির কোচ মফিজ উদ্দিন জানিয়েছেন, ২০১১ সালে ছেলেরা না পারলেও মেয়েদের দিয়ে তিনি স্বপ্নপূরণ করতে পেরেছেন।

কলসিন্দুর গ্রামের ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ আকবর আলী। তিনি প্রতিনিয়ত মেয়েদের অনুশীলন ও খেলা দেখেন। কিশোরীদের অসাধারণ পারফের্মেন্সে মুগ্ধতা ছেয়ে গেছে তার মনের কোণে। তিনি বলেন, ‘এই মেয়েরা আমাদের হিরো’। তিনি আরও বলেন, কলসিন্দুর এখন বিখ্যাত একটি গ্রাম। আমাদের মেয়েরা প্রমাণ করেছে তাদের অনেক কিছু দেয়ার আছে। ইতোমধ্যে কলসিন্দুরের অন্ততপক্ষে ১২ মেয়ে জাতীয় পর্যায়ে খেলেছেন। এর মধ্যে অন্যতম ১২ বছর বয়সী তহুরা খাতুন। গোল করার অসাধারণ দক্ষতার কারণে যার ডাকনাম হয়ে গেছে ‘কলসিন্দুরের মেসি’।

বাংলাদেশের অনেক মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় ১৩ বছর বয়সেই। তবে তহুরা, জহুরাদের পারফর্মেন্সে গ্রামটির মানুষের বিবেকের চোখ খুলে যাচ্ছে। তহুরার দাদার যেমন আশা, নাতনীকে বুঝবে এমন একটি ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে হবে। যে তাকে খেলাধুলা করতে সহায়তা করবে। উৎসাহ যোগাবে। এই গ্রামের মেয়েদের স্বপ্ন এখন আকাশছোঁয়ার। তাদের সবার চোখে আগামীর স্বপ্ন।