২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

টোটোপাড়া থেকে প্রথম ছবি কলকাতায়

অনলাইন ডেস্ক॥ হাওয়ায় দুলছে মারুয়ার খেত। মাথা দোলাচ্ছে গাছপালা। হাওয়া লাগছে টোটোপাড়ার গায়ে, মুখে। হাওয়াটা বদলের। ইদানীং যেন তা টের পাওয়া যাচ্ছে ডুয়ার্সের অজ টোটোপাড়ায়।

কলকাতা থেকে নিজের শিকড় টোটোপাড়ায় ফিরে সেই বদলের কথাই শোনাবেন শোভা টোটো। শুনবেন কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের দর্শকেরা। দেশের অন্যতম ছোট জনজাতি টোটোদের মধ্যে অন্যতম স্নাতক শোভা। তাঁর জীবনের মধ্যে দিয়ে টোটোপাড়ার আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির বদলের কথা তুলে ধরেছেন পরিচালক শঙ্খ। টোটো ভাষায় তৈরি প্রথম ছবিও এটি। ফিল্মস ডিভিশন প্রযোজিত ৫২ মিনিটের তথ্যচিত্র ‘দ্য উইন্ড ইন দ্য মারুয়া ফিল্ড’ দেখা যাবে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে।

দেশের অন্যতম ক্ষুদ্র জনজাতি টোটোরা। ডুয়ার্সের আলিপুরদুয়ার জেলার মাদারিহাট থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে ভুটান পাহাড়ের পাদদেশে টোটোদের গ্রাম। ১৯০১ সালের জনগণনায় টোটোদের সংখ্যা ছিল ১৭১ জন। ২০০১ সালে সে সংখ্যা দাঁড়ায় ১১৭৫-এ। বর্তমানে সংখ্যাটা দেড় হাজার ছাড়িয়ে ছে।

১৯৭৯ সালে টোটোদের মধ্যে প্রথম মাধ্যমিক পাশ করেন চিত্তরঞ্জন টোটো। কয়েক বছর বাদে তিনি মারা যান। এর পরে, ১৯৮১ সালে ভক্ত টোটো মাধ্যমিক পাশ করেন। তিনি এখন রাজ্য সরকারি কর্মচারী। মেয়েদের মধ্যে পড়ার আগ্রহ জন্মায় অনেক দিন বাদে। ২০০৩ সালে প্রথম সূচনা টোটো মাধ্যমিক পাশ করেছিলেন। তিনি এখন গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা। ২০১০ সালে রীতা টোটো প্রথম স্নাতক হন। বর্তমানে মোট ছ’জন পুরুষ স্নাতক, তাঁদের পাশাপাশি চার জন টোটো তরুণী স্নাতক হয়েছেন। স্নাতক যুবকদের মধ্যে দু’জন সরকারি চাকরি করছে। বাকিরা বেকার। মেয়েদের মধ্যে এখনও পর্যন্ত শুধু রীতা সরকারি চাকরি পেয়েছেন।

দু’বছর আগে শোভা কোচবিহার এবিএন শীল কলেজ থেকে ভূগোলে স্নাতক হন। তাঁর বোন শান্তিও স্নাতক হয়েছেন গত বছর। দুই বোনেরই লক্ষ্য, ডব্লিউবিসিএস অফিসার হওয়া। কলকাতার একটি বেসরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে তার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন দুই বোন। তাঁদের বাবা ভবেশ টোটো অনগ্রসর কল্যাণ দফতরের চতুর্থ শ্রেণির কর্মী। টোটোপাড়াতেই থাকেন। ভবেশবাবুর কথায়, ‘‘আমাদের এগারো ভাইবোনের সংসার ছিল। চাষবাস হত না তেমন। খুব অভাবে সংসার চলত। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ে বাধ্য হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমাদের সামর্থ্য ছিল না বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করার। তাই কষ্ট করে হলেও দুই মেয়ে যাতে প্রশাসনিক কাজ পায়, সে জন্য চেষ্টার ত্রুটি রাখছি না।’’ টানা প্রায় এক বছর ধরে টোটোপা়ড়ায় গিয়ে ছবির কাজ করেছেন শঙ্খ। ছবিতে দেখিয়েছেন, এখন কী কী সমস্যা পোহাতে হয় টোটোদের। অন্যতম প্রধান সমস্যা জমির। টোটোপাড়ায় টোটোরাই এখন সংখ্যালঘু। জমির বেশির ভাগই চলে গিয়েছে বহিরাগতদের দখলে। সামান্য জমিতে মারুয়া অর্থাৎ মিলেট ও ভুট্টা চাষ হয় কেবল। তবে মূল যে সঙ্কটের কথা শঙ্খ তুলে ধরেছেন, সেটা টোটো-সংস্কৃতির। টোটো সমাজের অনেকে লড়াই করে বাইরের দুনিয়ায় নিজের জায়গা করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু, বহিরাগত সংস্কৃতির চাপে কোণঠাসা টোটোদের নিজস্ব সংস্কৃতি। কথাবার্তায় নেপালি ভাষা বেশি শোনা যায় এখন।

সঙ্কট ধর্মাচরণ নিয়েও। সরকারি নথিতে ‘হিন্দু’ পরিচয় থাকলেও টোটোদের অনেক রীতিই হিন্দুধর্মের মূল ধারার আচারের সঙ্গে মেলে না। তার উপর গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি টোটো পরিবার ধর্মান্তরিত হয়েছে। তাতেও টোটো ঐতিহ্যে আঘাত লেগেছে বলে মনে করেন প্রবীণেরা। শোভাকে সামনে রেখে এই সব সঙ্কট, বদল এবং কিছু জরুরি প্রশ্ন পর্দায় তুলে ধরেছেন শঙ্খ। তাঁর কথায়, ‘‘পর্যটকেরা টোটোপাড়ায় ঘুরতে গিয়ে একটা ধারণা করে নেন। কিন্তু সেই ধারণা অনেক সময়েই বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। ছবিতে আমরা সেই বাস্তবটাই ধরার চেষ্টা করেছি।’’

কী রকম সেই বাস্তব?

দু’এক জন শোভা-শান্তি যতই প্রতিকূলতা অতিক্রম করে বাইরের দুনিয়ায় জায়গা করে নিন, বড়সড় বদল কিছু আসেনি টোটোপাড়ায়। খানাখন্দে ভরা রাস্তা ও সেতুহীন চারটি ঝোরা পেরিয়ে টোটোপাড়া পৌঁছতেই কাহিল হয়ে পড়তে হয়। গ্রামে একটি মাধ্যমিক স্কুল রয়েছে ঠিকই, তবে মাধ্যমিক পাশের পরে মাদারিহাট বা আলিপুরদুয়ারে গিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পড়তে হয়। স্কুলে যাতায়াত করতে হাতে গোনা চারটি জিপই ভরসা। যাতায়াতের খরচ তো বটেই, বই কেনা বা অন্যান্য খরচ বাবদ টাকা মেটানোর সামর্থ্য অধিকাংশ পরিবারের না থাকায় অভিভাবকেরা ছেলেমেয়েদের স্কুলে পড়তে পাঠানোর আগ্রহ দেখান না বললেই চলে। তাই অনেক টোটো পড়ুয়া নিজেদের পড়াশোনার খরচ তুলতে স্কুল-কলেজে ছুটি পেলে ভুটান পাহাড়ে গিয়ে পাথর খাদানে দিনমজুরি করে। একই কথা বলছেন শোভাও। তাঁর কথায়, ‘‘স্নাতক হতে গিয়ে আমায় কম কষ্ট করতে হয়নি। আলিপুরদুয়ার এবং জলপাইগুড়িতে থেকে স্কুল শেষ করে কোচবিহার কলেজে ভর্তি হই। টোটো সমাজের ছেলেমেয়েদের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ রয়েছে। সকলেই চায় একটা সরকারি চাকরি পেতে। তাতে অন্তত সংসারটা ভালভাবে চলবে।’’ শোভা জানান, কী ভাবে জিপের ছাদে বসে ছেলেমেয়েরা মাদারিহাটে স্কুলে যায়। অনেকে এতটাই দরিদ্র যে ছেলেমেয়ে মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকে ফেল করলে বাবা মায়েরা ফের পরীক্ষায় বসতে উৎসাহ দেওয়ার বদলে কাজে যেতে বলেন। শোভা বলছেন, ‘‘এই কষ্ট আমরা, টোটোরাই বুঝি। বাইরে থেকে আসা কোনও আধিকারিক বা অন্য কেউ তা বোঝেন না। আমার মনে হয়, এখানকার সমস্যা মেটাতে পারবেন এক মাত্র পদস্থ কোনও সরকারি টোটো অফিসার। সেটাই আমার পাখির চোখ।’’

শোভাদের ডানায় ভর করে এখন আসল বদলের হাওয়ার অপেক্ষায় মারুয়া খেতের দেশ।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা