২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নূর হোসেন ঢাকা জেলে

নূর হোসেন ঢাকা জেলে
  • ইন্টারপোল এ্যালার্টের জেরে ফেরত;###;না’গঞ্জে জনতার তীব্র ঘৃণা

গাফফার খান চৌধুরী/মোঃ খলিলুর রহমান ॥ নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেনকে ভারত থেকে ফেরত পাওয়ায় অনেক অজানা রহস্য বেরিয়ে আসতে পারে। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসতে পারে আরও চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক কাহিনী। নূর হোসেনকে বৃহস্পতিবার রাতে ভারত থেকে ফেরত আনা হয়েছে। ফেরত আনতে পারায় সন্তুষ্ট নিহতের পরিবার, আত্মীয়স্বজন, নারায়ণগঞ্জবাসীসহ পুরো দেশ। নারায়ণগঞ্জ আদালতে ও কারাগারে নেয়ার সময় জনতা তাকে লক্ষ্য করে জুতো, থুথু, ময়লা, পচা ডিমসহ নানা ধরনের আবর্জনা ছুড়ে ঘৃণা প্রদর্শন করেন। এ জন্য নিরাপত্তার কারণে পরবর্তীতে তাকে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে শুক্রবার বিকেলেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা

হয়েছে। নির্ধারিত তারিখে তাকে হাজির করা হবে

নারায়ণগঞ্জ আদালতে।

ঘটনার সূত্রপাত ॥ আধিপত্য বিস্তারের সূত্রধরে সাত খুনের ঘটনা ঘটে। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা নজরুল ইসলাম ছিলেন নারায়ণগঞ্জের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। অন্যদিকে নূর হোসেন ছিলেন ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ২ নম্বর ওয়ার্ডে একটি উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে নজরুল ও তার সমর্থকদের সঙ্গে নূর হোসেনের সমর্থকদের মারামারি হয়। সেই মারামারির সূত্রধরে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। একপর্যায়ে তা প্রকট আকার ধারণ করে। মারামারির ঘটনায় নজরুল ইসলামকে আসামি করে মামলা করেন নূর হোসেন।

যেভাবে অপহরণ করা হয়েছিল ॥ ওই মামলায় জামিন নিয়ে গত বছরের ২৭ এপ্রিল ঢাকা যাচ্ছিলেন নজরুল ইসলাম ও তার ৪ সহযোগী। দুপুর দেড়টায় লিংক রোডে স্টেডিয়ামের উত্তরে রাস্তার পশ্চিম পাশে ময়লার ডিপো এলাকায় তাদের গাড়িটি পৌঁছে। এখানে আগ থেকেই ওত পেতে থাকা আরিফ ও রানাসহ আরও ১১ র‌্যাব সদস্য নজরুলের গাড়ি থামিয়ে ৫ জনকেই তাদের সঙ্গে তুলে নেয়। পেছনের গাড়িতে ছিল আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম। ঘটনাটি দেখে ফেলায় তাদেরও তুলে নিয়ে যায় র‌্যাব। অপহরণের রাতে নজরুলের গাড়িটি গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর শালবনের পাশে এবং চন্দন সরকারের গাড়িটি পরদিন ঢাকার গুলশানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।

অপহরণের পর যা ঘটে ॥ সাতজনকে জোর করে একটি গাড়িতে তুলে ওই গাড়িটি নরসিংদীর পথে রওনা হয়। বেলা ৩টার দিকে গাড়িটি নরসিংদীতে র‌্যাব ক্যাম্পের কাছে যায়। সেখানে খাবার নিয়ে গাড়ির ভেতরেই দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সারেন তারা। রাত ৮টার দিকে তারা পুনরায় নারায়ণগঞ্জের পথে রওনা হন। পথে ভুলতায় বিপরীত দিক থেকে আসা সৈনিক আসাদকে দেখে র‌্যাবের গাড়িটি থামে। র‌্যাব কর্মকর্তা মেজর আরিফ গাড়ি থেকে নেমে সৈনিক আসাদের কাছ থেকে একটি কাপড়ের ব্যাগ নেয়। ওই ব্যাগে অজ্ঞান করার ইনজেকশন ছিল।

যেভাবে হত্যা করা হয় ॥ মেজর আরিফের নির্দেশে সাতজনকে ইনজেকশন পুশ করে অচেতন করা হয়। কিছুক্ষণ পর আরিফ নিজে এবং হিরা মিয়া, বেলাল, পুর্নেন্দ বালা ও তৈয়ব মুখে পলিথিন পেঁচিয়ে ৭ জনকে হত্যা করে। তারপর লাশ গাড়িতে নিয়ে তারা কাঁচপুর ব্রিজের ল্যান্ডিং স্টেশনে পৌঁছায়। ওই সময় আরেকটি মাইক্রোবাসে করে সার্জেন্ট এনামুল, এমদাদ, বেলাল, তাজুল, নাছির, বজলু ইটের বস্তা ও রশি নিয়ে আসে। আরিফের নির্দেশে ইটের বস্তা ও লাশগুলো আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা ট্রলারে তোলা হয়। ট্রলার ছেড়ে দেয়। রাত ১টায় মেঘনার মোহনায় পৌঁছলে আরিফের নেতৃত্বে লাশগুলোর পেট ফুটো করে প্রতিটি লাশের সঙ্গে ইটের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলা হয়। ট্রলারটি লঞ্চঘাটে ফিরে আসে। ঘাটে উপস্থিত ছিল র‌্যাব-১১ অধিনায়ক তারেক সাঈদ মোহাম্মদ।

যেভাবে একের পর এক লাশ ভেসে ওঠে ॥ অপহরণের ৩ দিন পর দুপুরের পর নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের শান্তিনগর এলাকাসংলগ্ন নদীতে কয়েকটি লাশ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। এরপর পুলিশ নদীর এক কিলোমিটারের মতো এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে একে একে ছয়টি লাশ তুলে আনে। নদীর তীরে জনতার ঢল নামে। পরে স্বজনরা লাশগুলো শনাক্ত করেন।

নিহতের সবার হাত-পা বাঁধা ছিল। পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন। ১৮টি ইট এক-একটি বস্তায় ভরে একটি লাশের সঙ্গে দুটি বস্তা বেঁধে তাদের ডুবিয়ে দেয়া হয়েছিল। পরদিন আরেকটি লাশ ভেসে ওঠে। ঘটনার প্রতিবাদে এবং খুনীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশে বিক্ষোভ হয়।

যেভাবে হস্তান্তর করা হয় নূর হোসেনকে ॥ বুধবার অনুপ চেটিয়াকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পর বৃহস্পতিবার রাতেই নূর হোসেনকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করে ভারত সরকার। বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) কাছে হস্তান্তর করে তাকে।

গত ১৬ অক্টোবর কলকাতার বিচারিক আদালত নূর হোসেনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেয়। তাকে দমদম সেন্ট্রাল জেলে রাখা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে সরকারী আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন দে বলেছেন, ভারতীয় দ-বিধির ৩২১ নম্বর ধারা অনুযায়ী দায়ের করা আবেদনে ভারত সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে নূর হোসেন বাংলাদেশের একজন দাগি অপরাধী। তার নামে ইন্টারপোলের রেড নোটিস রয়েছে। গ্রেফতার এড়াতে তিনি বেআইনীভাবে ভারতে ঢুকে আত্মগোপন করেছিলেন। বাংলাদেশ সরকার ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নূর হোসেনকে নিজেদের দেশে ফেরত নিতে চেয়েছে। সেজন্যই অনুপ্রবেশের মামলাটি প্রত্যাহার করে নূর হোসেনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে আগ্রহী ভারত সরকার। তারই ধারাবাহিকতায় নূর হোসেনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায় ভারত। প্রসঙ্গত, গত বছরের ১৪ জুন নূর হোসেন, তার দুই সহযোগী সেলিম ও খান সুমনসহ কলকাতা বিমানবন্দরের কাছে কৈখালী এলাকায় গ্রেফতার হয়।

যেভাবে নারায়ণগঞ্জ আদালতে হাজির করা হয় ॥ রাতেই নূর হোসেনকে ঢাকায় আনা হয়। রাখা হয় র‌্যাব হেফাজতে। সকাল পৌনে ৭টার দিকে নেয়া হয় নারায়ণগঞ্জে। সকাল সোয়া ৮টার দিকে র‌্যাব ও পুলিশের প্রহরায় নারায়ণগঞ্জের পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগারে নিয়ে রাখা হয়। আদালতপাড়ায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

দুুপুর আড়াইটার দিকে শহরের মাসদাইর পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে মাথায় হেলমেট পরিয়ে নূর হোসেনকে নারায়ণগঞ্জের আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের কাঠগড়ায় তোলার সঙ্গে সঙ্গেই নূর হোসেন তার মাথা থেকে হেলমেটটি খুলে ফেলেন। এ সময় তাকে কাঠগড়ায় স্বাভাবিক দেখা যায়।

আদালতে নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক মোঃ হাবিবুর রহমান জানান, নূর হোসেন ৭ খুন মামলার অন্যতম আসামিসহ ১১টি মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি। তাই তাকে সব মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা দিয়ে জেলহাজতে প্রেরণের আবেদন জানান। এ সময় একটি মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটির পক্ষে তার আইনজীবী জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নূর হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া নতুন কোন মামলা রয়েছে কিনা? যেই মামলায় তাকে রিমান্ডে নেয়া যেতে পারে। তিনি জানান, নূর হোসেনকে ৫৪ ধারায় গ্রেফাতার দেখিয়ে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সাত খুনের আসল রহস্য উদ্ঘাটিত হতো। নূর হোসেন গুরুত্বপূর্ণ আসামি। দু’দেশের চুক্তির মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। রিমান্ডে নিলেই কারা অর্থদাতা ও পরিকল্পনাকারী তা বের হয়ে আসত। নূর হোসেনের বিরুদ্ধে খুনসহ ১৩টি মামলা রয়েছে।

আইনজীবীদের বক্তব্য ॥ নারায়ণগঞ্জ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর কেএম ফজলুর রহমান জানান, নূর হোসেনকে দুপুরে নারায়ণগঞ্জ চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সহিদুল ইসলামের আদালতে হাজির করা হলে ১১টি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তাকে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। নূর হোসেনের বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের মামলায় তার এক বছরের সাজা হয়েছে। এই মামলায় তাকে রিমান্ডে নেয়ার সুযোগ নেই।

একটি মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী এ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অভিযোগপত্র থেকে এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামিকে বাদ দেয়া নারাজি রিভিশন মামলাটি আদালত খারিজ করেছে। আমরা এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতে যাব। নূর হোসেনকে সাত খুনের মামলাসহ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়া ১৩ মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেয়ার সুযোগ নেইÑ পুলিশের এমন দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চাইলে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে।

তদন্ত প্রক্রিয়া ও কমিটি গঠন ॥ এই ঘটনায় নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বাদী হয়ে একটি ও আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, র‌্যাবকে ৬ কোটি টাকা দিয়ে এ হত্যাকা- ঘটানো হয়েছে। এই ঘটনায় হাইকোর্টের নির্দেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শাহাজান আলী মোল্লার নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তা লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার এমএম রানাকে চাকরিচ্যুত করে তাদের এই মামলায় গ্রেফতার করা হয়। পরে এই সাবেক তিন কর্মকর্তা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেন। এ ঘটনায় পুলিশ র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে গ্রেফতার করে। র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ২২ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেন।

দীর্ঘ এক বছর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত শেষে নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী ও এনসিসি কাউন্সিলর সেলিনা ইসলামের দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত ৫ আসামি (সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন মিয়া, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক রাজু, ঠিকাদার হাসমত আলী হাসু, বিএনপি নেতা ও জমি ব্যবসায়ী ইকবাল হোসেন, সদ্য আওয়ামী লীগে যোগদানকারী আনোয়ার হোসেন আশিককে বাদ দিয়ে র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তা ও নূর হোসেনসহ ৩৫ আসামিকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এ ঘটনায় বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি আদালতে নারাজি পিটিশন দাখিল করলে তা খারিজ করে দিলে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন মামলা দায়ের করা হয়। গত ৯ নবেম্বর তা খারিজ করে দেয় আদালত। বিজয় কুমার পালের দায়ের করা অপর একটি মামলার বিচার কাজ শুরু করার জন্য জজকোর্ট আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। বর্তমানে র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ২২ জন কারাগারে আটক রয়েছে। র‌্যাবের ৮ সদস্যসহ মোট ১২ জন পলাতক রয়েছে।

অভিযুক্তপত্র দাখিল ॥ গত ৯ এপ্রিল দীর্ঘ প্রায় এক বছর তদন্ত শেষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির ওসি মামুনুর রশিদ ম-ল নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৭ খুনের ঘটনায় নূর হোসেন, র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) এম এম রানাসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এদিকে চার্জশীটে ৩৫ অভিযুক্তের মধ্যে র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ২৫ জন এবং নুর হোসেনের ৯ সহযোগী রয়েছে।

নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রীসহ নিহতদের পরিবার ও জনতার ক্ষোভ এবং অভিযোগ ॥ নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি নূর হোসেনকে পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে না নিয়ে জেলহাজতে পাঠানোর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি নারায়ণগঞ্জের আদালতে ন্যায়বিচার পাইনি। আমরা ঢাকায় উচ্চ আদালতে আপীল করব। আমরা এখনও নারাজির রিভিউ পিটিশন খারিজের কপি পাইনি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনার সঙ্গে সঙ্গেই তার সহযোগীরা এলাকায় ফিরতে শুরু করেছে। তারা আমাদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। আমাদের লোকজনদের মারধর করছে। আমরা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। সিদ্ধিরগঞ্জে নূর হোসেনের সমস্ত কাজকর্ম আগের মতোই চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। নূর হোসেনকে অভিযোগপত্র দাখিলের আগে আনলে ভাল হতো। কিন্তু মামলার তদন্তকারী কর্মকর্র্তা নূর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই অসম্পন্ন একটি অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। আমরা দাবি জানাচ্ছি নূর হোসেনকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। এই হত্যাকা-ের সঙ্গে আর কারা কারা জড়িত? কারা পরিকল্পনাকারী, কারা অর্থের যোগানদাতা? র‌্যাব কেন আমার স্বামীসহ ৭ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করবে? তাদের সঙ্গে তো র‌্যাবের কোন বিরোধ ছিল না। র‌্যাব চাইলে আমার স্বামীকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলতে পারত, কিন্তু তা তারা করেনি। এ হত্যাকা-ে র‌্যাবকে ব্যবহার করা হয়েছে। আমার স্বামী যদি খারাপ লোক হতো, তাহলে তার জানাজায় লক্ষাধিক লোক হতো না। তাই আমরা চাই, নূর হোসেনকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং নতুন করে তদন্তের মাধ্যমে এ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হোক।

নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম ওরফে শহীদ চেয়ারম্যান অভিযোগ করেন, ৭ খুনের মামলার অভিযোগপত্র থেকে যেসমস্ত আসামিকে বাদ দেয়া হয়েছে, তাদের এবং নূর হোসেনের সহযোগীদের অত্যাচারে আমরা ঘর থেকে বের হতে পারছি না। প্রতিনিয়ত আমাদের অত্যাচার ও হয়রানি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, নূর হোসেনকে কে বিদেশে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে? কার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়েছে? এগুলো তদন্ত করলেই এ হত্যাকা-ের পেছনে আর কারা কারা জড়িত তা বেরিয়ে আসবে। আমরা মনে করি নূর হোসেনকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই হত্যাকা-ের সঙ্গে আড়ালে থাকা খুনীরা বেরিয়ে আসবে। তিনি আরও জানান, সাত খুনের পেছনে কোন অদৃশ্য শক্তি কাজ করেছে। নূর হোসেনের মুখ থেকে শুনে নতুনভাবে অভিযোগপত্র দেয়ার দাবি জানান তিনি।

৭ খুনের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের গাড়িচালক ইব্রাহিমের বাবা আব্দুল ওহাব। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি আমার ছেলেকে ফিরে পাব না। কিন্তু আমি আমার ছেলে ইব্রাহিমসহ ৭ জনকে খুনের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। আমি চাই, যারা খুন করেছে আমার ছেলেকে, নূর হোসেন তাদের নাম বলে দিক।

নূর হোসেনকে আদালতে তোলার সময় ও আদালত থেকে বের করার সময় নিহতদের আতীয়স্বজন ও এলাকাবাসী নূর হোসেনের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভে করেন। এ সময় বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দেয়। ফাঁসি ফাঁসি চাই, নূর হোসেনের ফাঁসি চাই, নূর হোসেনের চামড়া কুত্তা দিয়ে কামড়া, নূর হোসেনের দুই গালে জুতা মার তালে তালে, নূর হোসেনের চামড়া তুলে নেব আমরা। এ সময় ক্ষুব্ধরা নূর হোসেনের দিকে জুতো, পঁচা ডিম, থুথুসহ নানা আবর্জনা নিক্ষেপ করে ঘৃণা প্রদর্শন করেন।

এখনও ১২ আসামি পলাতক ॥ আদালতে অভিযুক্ত ৩৫ জনের মধ্যে নূর হোসেন ছাড়া এখনও পলাতক ১২ জন। গত ৮ জুলাই আদালত পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। চার্জশীটভুক্ত পলাতক আসামিরা হচ্ছেÑ অবসরপ্রাপ্ত র‌্যাব সদস্য কর্পোরাল মোখলেছুর রহমান, সৈনিক আব্দুল আলিম, মহিউদ্দিন মুন্সী, আল আমিন শরিফ, তাজুল ইসলাম, সার্জেন্ট এনামুল কবির, এএসআই কামাল হোসেন, কনস্টেবল হাবিবুর রহমান, নূর হোসেনের সহযোগী মোঃ সেলিম, সানা উল্লাহ ছানা, শাহজাহান ও জামাল উদ্দিন।

নিহতদের পরিচিতি ॥ ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লার শিবু মার্কেট এলাকা থেকে নাসিকের প্যানেল মেয়র ও ২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম (৪০), সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকার (৬০), নজরুলের বন্ধু সিরাজুল ইসলাম লিটন (৪১), যুবলীগ নেতা মনিরুজ্জামান স্বপন (৪২), নজরুলের সহযোগী তাজুল ইসলাম (৪১), স্বপনের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর (৪৩) ও চন্দন সরকারের গাড়িচালক ইব্রাহিমকে (৪৪) অপহরণ করা হয়। ঘটনার তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল নজরুল ও চন্দন সরকারসহ ৬ জন ও পরদিন ১ মে সিরাজুল ইসলাম লিটনের লাশ একই জায়গায় ভেসে ওঠে।

কে এই নূর হোসেন ॥ নূর হোসেন ১৯৮৫ সালে ট্রাকের হেলপার ছিলেন। বছরখানেক হেলপারি করার পর ট্রাক ড্রাইভার বনে যান। ১৯৮৭ সালে তার বাবা বদরুদ্দিন একটি পুরনো ট্রাক কিনলে ওই ট্রাকের চালক হন। ১৯৯২ সালে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউপির চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হন নূর হোসেনসহ ১৩ জন। শক্তিশালী প্রার্থী সাবেক চেয়ারম্যান সহিদুল ইসলামকে পরাজিত করতে মাঠে নামেন সাবেক এমপি গিয়াসউদ্দিন। দলবল নিয়ে পক্ষ নেন নূর হোসেনের। দুই-আড়াই শ’ ভোটের ব্যবধানে নূর হোসেন জয়ী হয়। পাঁচ বছরের ব্যবধানে ১৯৯২ সালে বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিনের আশীর্বাদে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিন বছর বাদে ১৯৯৫ সালের এপ্রিলে আদমজীতে খালেদা জিয়ার জনসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। প্রভাব বিস্তার করে পুরো সিদ্ধিরগঞ্জে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি প্রার্থী হিসেবে পরবর্তী ইউপি নির্বাচনেও চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হন নূর হোসেন। আওয়ামী লীগ থেকে শামীম ওসমান প্রার্থী দেয় নজরুলকে। নূর হোসেন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে গড়ে তুলে নিজস্ব বাহিনী।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৯৯৬ সালের মার্চে শিমরাইল মোড়ে নূর হোসেনের বাহিনীর গুলিতে নিহত হন রিকশাচালক আলী হোসেন। ১৯৯৯ সালের ১ অক্টোবর থানা আওয়ামী লীগ অফিসে নজরুল ইসলামকে হত্যা করতে এসে যুবলীগ নেতা মতিনকে গুলি করে হত্যা করে নূর হোসেন বাহিনী। ২০০১ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় নূর হোসেন। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের এক নেতার সঙ্গে ভারতে সফল বৈঠকের পর বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে ফিরে আসে নূর হোসেন। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের নেতাদের পেছনে মোটা অংকের টাকা খরচ করে ২০১৩ সালের ২৯ মে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদটি বাগিয়ে নেয়। এরপর নূর হোসেন বেপরোয়া হয়ে উঠে।

র‌্যাবের তদন্ত ॥ অপহরণের পর নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম দাবি করেন, র‌্যাবকে অর্থ দিয়ে এ হত্যাকা- ঘটিয়েছে নূর হোসেন। এরপর সারাদেশে তোলপাড় শুরু হয়। সাত খুনের পর র‌্যাবের তরফ থেকে করা তদন্তেও বাহিনীর সদস্যদের জড়িত থাকার বিষয়টি ওঠে আসে। কমিটির প্রধান ছিলেন বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক আফতাব উদ্দিন আহমেদ। সদস্যরা ছিলেন র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার গোলাম সারোয়ার ও সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ সাজ্জাদ হোসেন এবং র‌্যাব-৩ এর মেজর মুহাম্মদ সাদিকুর রহমান। এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয় সাত খুনের ঘটনায় গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রমের জামাতা লে. কর্নেল তারেক সাঈদের নির্দেশে পুরো হত্যাকা- সংঘটিত হয়। এক্ষেত্রে তার অবৈধ আদেশ মেনে চলেন অন্যরা। আর পুরো বিষয়টি উর্ধতন কর্মকর্তাদের কাছে লুকিয়ে রাখেন তিনি। তারেক সাঈদ অধস্তন সহকর্মী আরিফ ও রানাকে বলেছিলেন, কাউন্সিলর নজরুলকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত হলে আদালত থেকে ফেরত যাওয়ার পথে তাদের গ্রেফতার করা হবে। র‌্যাব যেন প্রস্তুত থাকে। নূর হোসেনের করা একটি মামলায় নারায়ণগঞ্জের আদালত থেকে জামিন নিয়ে এক বন্ধুর গাড়িতে সহযোগীসহ ঢাকায় ফিরছিলেন নজরুল। আর তাদের পেছনেই আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে একই সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম। প্রথমে ৫ জনকে পরে অপহরণের বিষয়টি দেখে ফেলায় আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালককেও অপহরণ করা হয়। পরবর্তীতে তাদের হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবিয়ে দেয়া হয়।

তারেক সাঈদ শুরু থেকে কোন ঘটনাস্থলে উপস্থিত না হলেও ঘটনা সংঘটনের শুরু থেকে পুরোটা সময় আরিফ ও রানাকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। অপহৃতদের উদ্ধারে যখন বিভিন্ন সংস্থা তৎপর, তখন তিনি কোন নির্দেশনা দেয়া থেকে বিরত থেকেছেন। পুরো ঘটনার আদ্যোপান্ত জানলেও সেনা কর্মকর্তা তারেক তা উর্ধতন কর্মকর্তার কাছে লুকিয়ে রেখেছিলেন। এ ব্যাপারে র‌্যাবের তরফ থেকে জানতে চাওয়া হলে তিনি সত্য তথ্য জানাননি। সশস্ত্রবাহিনীর তিন কর্মকর্তাকেই নারায়ণগঞ্জ থেকে সরিয়ে আনার পর সামরিক বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নূর হোসেন ॥ শুক্রবার দুপুর আড়াইটার দিকে নূর হোসেনকে নারায়ণগঞ্জ চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সহিদুল ইসলামের আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের মামলায় দ-প্রাপ্ত নূর হোসেনকে ১১টি মামলায় শ্যোন এ্যারেস্ট দেখানো হয়। শুনানি শেষে আদালত তাকে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। পরে নূর হোসেনকে কড়া পাহারায় কারাগারে নেয়া হয়। কারাগারে নেয়ার সময় জনতা নূর হোসেনকে লক্ষ্য করে জুতো, ইটপাটকেল, থুথু, ময়লাসহ নানা জিনিসপত্র ছুড়ে বিক্ষোভ দেখান। এমন পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে রাখা নিরাপদ মনে করেন না কর্তৃপক্ষ। নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের জেল সুপার হালিমা খাতুন জানান, স্পর্শকাতর মামলা হওয়ায় এবং নিরাপত্তার কারণে নূর হোসেনকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরে তাকে কড়া নিরাপত্তায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির জানান, শুক্রবার বিকেল সোয়া ৪টায় নূর হোসেনকে কারাগারে আনা হয়।