২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

খালেদা কবে ফিরবেন সিনিয়র নেতারাও জানেন না

  • দলে আলোচনা সমালোচনা

শরীফুল ইসলাম ॥ লন্ডন থেকে দেশে ফিরতে দফায় দফায় তারিখ পেছাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। মাত্র ১৫ দিনের কথা বলে লন্ডন গিয়ে এখন দুই মাস হয়ে গেলেও দেশে আসা নিয়ে বার বার অবস্থান পরিবর্তন করার বিষয় নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। দলের সিনিয়র নেতারাও জানেন না খালেদা জিয়া কবে দেশে ফিরে আসছেন। তাই এ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

উল্লেখ্য, চোখের চিকিৎসা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার কথা বলে ১৫ সেপ্টেম্বর লন্ডন যান বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। ইতোমধ্যেই তার চোখের চিকিৎসা শেষ হয়েছে। এখন তিনি তারেক রহমানের বাসায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একান্তে সময় কাটাচ্ছেন। সম্প্রতি লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেছেন, দেশে ফেরা জরুরী হলেও পরিবারের সদস্যরা চাচ্ছেন তিনি যেন আরও কিছুদিন লন্ডনে অবস্থান করেন। তবে সরকারী দলের তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, খালেদা জিয়া লন্ডনে বসে সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে শীঘ্রই তিনি দশে ফিরবেন বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে কবে আসবেন তা বলা হচ্ছে না।

বিএনপির পক্ষ থেকে প্রথমে বলা হয় ২ অক্টোবর খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে দেশে ফিরে আসবেন। এর পর কখনও বলা হয় ১৫ অক্টোবর আবার কখনও বলা হয় ২৫ অক্টোবর তিনি দেশে ফিরে আসবেন। ২ নবেম্বর তিনি দেশে ফিরে আসবেন এমন কথাও বলা হয়। একপর্যায়ে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে সম্প্রতি নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে দলের মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ৭ নবেম্বরের আগেই খালেদা জিয়া দেশে ফিরে আসবেন এবং দলীয় কর্মসূচীতে অংশ নেবেন। এরপর বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেন, খালেদা জিয়া ১০ নভেম্বরের মধ্যে লন্ডন থেকে দেশে ফিরে আসবেন। এ পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ৭ নবেম্বর জিয়াউর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সুনির্দিষ্ট কোন দিনক্ষণ উল্লেখ না করে সাংবাদিকদের কাছে বলেন, শীঘ্রই খালেদা জিয়া দেশে ফিরে আসবেন। এর আগে স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আ স ম হান্নান শাহ এবং নজরুল ইসলাম খানসহ আরও ক’জন সিনিয়র নেতা এ নিয়ে একই ভাষায় কথা বলেছেন।

প্রসঙ্গত, খালেদা জিয়া লন্ডন যাওয়ার পর দুটি ঘটনায় বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা বড় ধরনের সমস্যায় পড়েন। প্রথমত, দুই বিদেশী হত্যার ঘটনায় দলের ক’জন প্রভাবশালী নেতা জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। অভিযুক্ত নেতারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। আর দ্বিতীয়ত, ২৮ অক্টোবর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও দলের পররাষ্ট্রবিষয়ক কার্যক্রম দেখভালকারী শমসের মবিন চৌধুরী হঠাৎ করে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের পর তিনি বিএনপিতে জিয়ার আদর্শ নেই বলে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন। এছাড়া তিনি এই দলে এখন যারা নিষ্ক্রিয় রয়েছেন তাদের পদত্যাগ করার আহ্বান জানান। এ দুটি ঘটনায় বিএনপির রাজনীতিতে বড় ধরনের নাড়া পড়ে। তাৎক্ষণিকভাবে এ নিয়ে সারাদেশে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ক’জন নেতা তৎপর হলেও অধিকাংশ সিনিয়র নেতাই কার্যত নীরবতা পালন করেন। এরপর ৩ নবেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জামিনের সময় বৃদ্ধির আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠায় আদালত।

মির্জা ফখরুল কারাগারে যাওয়ার পর চেয়ারপার্সন ও মহাসচিবের অনুপস্থিতিতে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়েন। এ পরিস্থিতিতে চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া দেশে ফিরে না আসায় বিএনপির সিনিয়র নেতারাও ক্ষুব্ধ ও হতাশ হন । এ কারণে এবার ৭ নবেম্বর উপলক্ষে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয়ভাবে একটি আলোচনা সভা করতে পারেনি বিএনপি। এছাড়া সারাদেশে দলের কমিটি পুনর্গঠনের কাজও স্থবির হয়ে পড়েছে।

সূত্রমতে, বিএনপিতে এখন চরম দুরবস্থা বিরাজ করলেও লন্ডন থেকে খালেদা জিয়ার দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তিনি চিকিৎসা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার কথা বলে লন্ডন গেলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে যুক্তরাজ্যের সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টায় ছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার সে চেষ্টা সফল হয়নি। এছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লন্ডন সফরকালে খালেদা জিয়া লন্ডনে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাত করার চেষ্টা করছেন বলেও জানা গেছে। একটি সূত্র জানিছেন, মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ না পেলে খালেদা জিয়ার দেশে ফেরার বিষয়টি আরও বেশি অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে।

সাত বছর ধরে লন্ডনে অবস্থান করছেন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান। ওয়ান-ইলেভেনের সময় যৌথবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কারামুক্তির পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে অবস্থান করে মা খালেদা জিয়ার কারামুক্তির দিন ১১ সেপ্টেম্বর তিনি উন্নত চিকিৎসার লন্ডন চলে যান। এরপর থেকে তিনি লন্ডনেই অবস্থান করছেন। তবে গত বছর রোজার মাসে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সৌদি আরবে হজ করতে গেলে মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা হয় তারেক রহমানের। এরপর টানা অবরোধ কর্মসূচী চলাকালে চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় থাকা ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো মারা গেলে পাসপোর্টের মেয়াদ না থাকায় ভিসার ব্যবস্থা করতে না পারায় তিনি ভাইয়ের লাশ দেখতে সেখানে যেতে পারেননি। একই কারণে এ বছর রোজার মাসে সৌদি আরবে যাওয়ার জন্যও ভিসা পাননি। আর তারেক রহমান সৌদি আরবের ভিসা না পাওয়ায় খালেদা জিয়াও এবার ওমরাহ করতে যাননি। তাই গত এক বছরে মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে তারেক রহমানের দেখা হয়নি।

জানা যায়, তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করলেও আগে থেকেই সেখানে বসেই বিএনপির রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতেন। এখন মাকে কাছে পেয়ে দলীয় রাজনীতি নিয়ে আরও কাছ থেকে পরিকল্পনা করতে পারছেন। এছাড়া নিজের নামে বেশ কয়েকটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকায় তিনি যেহেতু দেশে আসতে চাচ্ছেন না, তাই মাকে যতদিন সম্ভব লন্ডনে কাছে পেতে চাচ্ছেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের পক্ষ থেকেও খালেদা জিয়ার ওপর অনুরূপ চাপ রয়েছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে লন্ডনে তারেক রহমানের বাসায় খালেদা জিয়া তারেক রহমান ছাড়াও তার স্ত্রী ডাঃ জোবাইদা রহমান, মেয়ে জায়মা রহমান, প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শার্মিলা রহমান সিঁথি, তার দুই মেয়ে জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমানের সঙ্গে অবস্থান করছেন। এর আগে ২০১১ সালে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে লন্ডন সফরে গিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।

বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে কবে দেশে ফিরবেন জানতে চাওয়া হলে দলের মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন জনকণ্ঠকে বলেন, এ বিষয়ে আমার কাছে কোন তথ্য নেই। তবে এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান বলেন, চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য লন্ডন গেছেন। তবে তিনি কবে নাগাদ দেশে ফিরে আসবেন তা আমার জানা নেই।