১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দীপনরা কেন খুন হয় কেন খুন হবে

  • মুনতাসীর মামুন

(১৩ নবেম্বরের পর)

শেখ হাসিনা গত এক দশকে যেভাবে জঙ্গীদের গ্রেফতার করেছেন তাতে জঙ্গীবাদ সমূলে উৎপাটিত হওয়ার কথা। কিন্তু তা তো হয়নি, বরং বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ, জঙ্গী ধরা পড়ছে, জেলে যাচ্ছে, ফের জামিনে মুক্তি পেয়ে তার পুরনো কাজে ফিরে যাচ্ছে। এ এক পুনর্চক্রায়ন। জঙ্গী কত ধরা পড়েছে, কতজন জামিন পেয়েছে, দুর্বল চার্জশীটের কারণে অব্যাহতি পেয়েছে তার সঠিক হিসাব পুলিশ মুহূর্তে দিতে পারবে কিনা সন্দেহ।

যে স্থিতাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তার কারণে দেখি জঙ্গীদের গ্রেফতার করলে যে আচরণ করা হয় সাধারণ দুর্বৃত্তদের ধরলে সে রকম আচরণ করা হয় না। জঙ্গীরা তাদের কাছে ‘আপনি’, ‘হুজুর,’ অন্যরা ধরা পড়লে শুয়োরের বাচ্চা, হারামজাদা। মানবতাবিরোধীদের গ্রেফতার করে যে রকম রাজকীয়ভাবে রাখা হয়েছে, আদালত যত সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে, আমি বা শাহরিয়ার কবির বা সাবের হোসেন চৌধুরী তো তা পাইনি। ক্রসফায়ারে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, একজন জঙ্গীও ক্রসফায়ারে পড়েনি [এ ধরনের ক্রসফায়ার কাম্য নয়]। জঙ্গীদের বিরুদ্ধে এমনভাবে চার্জশীট দেয়া হয় যে, তা আদালতে নাকচ হয়ে যায়। কয়েকজন ছাড়া ধরাপড়া অজস্র জঙ্গীর বিচার হয়নি এখনও, দ- দূরের কথা। হেফাজত যখন ক্ষমতার কাছাকাছি বলে মনে করছে তখন যে কাজটি করেছিল প্রথম তাহলো অধ্যাপক অজয় রায়, শাহরিয়ার, জাফর ইকবাল ও আমাকে নাস্তিক বলে ঘোষণা করা। পুলিশ কোন উচ্চবাচ্য করেনি, ১৪ দলের কেউ বিবৃতিও দেয়নি। এটি এ ধারণার সৃষ্টি করে যে, এদের পিছে কেউ নেই, সুতরাং অন্যদের পিছে তো কারও থাকার কথা নয়। এবং সরকার যেহেতু কিছু বলছে না, তার মানে সরকারের এতে কিছু যায় আসে না।

তারপর ১৯৭১ সালের মুজাহিদ, আহমদ শফি ও তার হেফাজতিরা গণজাগরণ মঞ্চ এবং অন্তর্জাল লেখকদের ব্র্যান্ডিং করলেন নাস্তিক হিসেবে। চাপাতির প্রথম কোপ পড়ল রাজীবের ঘাড়ে। ব্লগার মানেই নাস্তিক এ ধরনের ব্র্যান্ডিং হয়ে গেল। দেখা গেল ব্লগার যাই লিখুন না কেন তিনি নাস্তিক। এ সমাজে যেখানে নতুন ধারণা জন্ম নেয়নি, স্থিতাবস্থার কারণে সেখানেও এ শব্দটি ভয়ঙ্কর। অন্তর্জাল লেখকরা তরুণ। তাদের চিন্তা সমাজে ব্যাপ্ত হলে স্থিতাবস্থা ভেঙ্গে যাবে। যেমন, তরুণদের কারণে মানবতাবিরোধীদের ক্ষেত্রে যে স্থিতাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল তা ভেঙ্গে গিয়েছিল। তরুণদের বিশাল সমর্থনের কারণে আওয়ামী লীগ এ ক্ষেত্রে স্থিতাবস্থা ভাঙতে সাহস করেছিল।

অন্তর্জাল লেখক, হেজাবিদের ভাষায় ‘বলগার’দের বিরুদ্ধে এলিটরাও ইতিবাচক ধারণা পোষণ করলেন না। পুলিশ কয়েকদিন আগে পর্যন্ত অন্তর্জাল লেখকদের প্রতি সতর্কবাণী শুনিয়েছে যেন তারা বাড়াবাড়ি না করেন। বাড়াবাড়ি কয়েকজন করতে পারে, যা সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু সবাই কি তাই করে? অন্যদিকে, জঙ্গীদের ব্লগের ব্যাপারে কখনও তারা সতর্কবাণী উচ্চারণ করেনি। পত্রিকায় দেখিনি যে, বাঁশের কেল্লা জাতীয় ব্লগ বা ওয়েবসাইট বন্ধ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বা নীতিনির্ধারকদের নিয়ে অন্তর্জালে কোন কুৎসা লেখা হলে তখনই সেই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারে পুলিশ। কিন্তু সেক্যুলারপন্থীরা জিডি করলেও তাদের যারা হুমকি দিচ্ছে তাদের ধরতে পারে না পুলিশ। এক্ষেত্রে তথ্য ও আইন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি কমিটি থাকা উচিত জঙ্গীদের ব্লগ দেখে তাদের চিহ্নিত করা বা কুৎসা রটনাকারী লিংক বন্ধ করে দেয়া।

যা বলছিলাম, জঙ্গীদের জামিন হবে কেন? বিচারপতি শামসুদ্দীন চৌধুরী এ প্রশ্ন তুলেছিলেন, যা ছিল যৌক্তিক। আদালত শক্তিশালী হতে পারে। আইনে তেমন কিছু ত্রুটি থাকলেও জনস্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ তো নিতে পারে না। শুধু কাগজ পড়ে বিচার করলে তা যান্ত্রিক হয়ে যায়।

॥ তিন ॥

যে বিষয়গুলো আলোচনা করলাম সে সম্পর্কিত অতি সাম্প্রতিক কিছু রিপোর্ট আলোচনা করছি। গত ৫ বছরে ৪৮২ জন জঙ্গীকে জামিন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে হিযবুত তাহরীর ৪২১ জন। জেএমবি ৪২, হুজি ১৫, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ৪ জন। শুধু তাই নয়, জামিন পেয়ে আবার তারা পুরনো কাজে ফিরে যাচ্ছেন, যাকে আগে আমি পুনর্চক্রায়ন বলে উল্লেখ করেছি। শুধু তাই নয়, যে স্থিতাবস্থার কথা উল্লেখ করেছি তা যে যথার্থ তার প্রমাণ এই রিপোর্টÑ

“২০০৫ সালে সারা দেশে একযোগে বোমা হামলার ঘটনায় চট্টগ্রামে গ্রেফতার হয়েছিলেন নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নেতা তরিকুল ইসলাম। দুই বছর আগে জামিনে ছাড়া পান তিনি। এরপর গত ৫ অক্টোবর রাজধানীর বাড্ডায় পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও কথিত পীর খিজির খানকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগে আবার গ্রেফতার হন তরিকুল। গত ২৫ অক্টোবর আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে তিনি নিজ হাতে খিজির খানের গলা কাটার কথা স্বীকার করেন।...

আদালত সূত্র জানিয়েছে, আসামিপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ও ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন বিচারিক আদালত এসব আসামির জামিনের আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ এসব জামিন বাতিল চেয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আপীল আবেদন করেনি। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষ প্রভাবিত হয়েছে বলেও অভিযোগ আছে।

২০১৩ সালের ১৪ জানুয়ারি উত্তরায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীনকে কুপিয়ে জখম করা হয়। আসিফকে হত্যাচেষ্টা মামলায় ওই বছরের ২৬ জানুয়ারি গ্রেফতার হন সাদ আল নাহিন, কামাল হোসেন সর্দার, কাওছার হোসেন ও কামাল উদ্দিন নামে চারজন। এদের মধ্যে নাহিন বর্তমান শ্রম প্রতিমন্ত্রী জাতীয় পার্টির নেতা মুজিবুল হকের ভাতিজা। চার আসামিই আসিফ মহিউদ্দীনকে কুপিয়ে আহত করার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দীও দেন। তারা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জবানবন্দীতে সাদ আল নাহিন বলেছেন, তিনি নিজে আসিফ মহিউদ্দীনকে ধারালো ছুরি দিয়ে ঘাড়ে কোপ দেন। তসলিমা নাসরিনসহ নাস্তিক-মুরতাদদের হত্যা করার সিদ্ধান্তও নেয়া হয় বলে জবানবন্দীতে তিনি উল্লেখ করেন। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর পরেও ২০১৩ সালের ২৮ জুলাই নাহিনকে জামিন দেন ঢাকার তৎকালীন মহানগর দায়রা জজ জহুরুল হক। নাহিনের জামিনদার ছিলেন তার চাচা মুজিবুল হক।

নাহিনের জামিনের মাত্র দুই দিন পর কাওছার ও কামাল উদ্দিনকে জামিন দেন ঢাকার মহানগর হাকিম এম এ সালাম। কয়েক দিনের ব্যবধানে কামালউদ্দিনও জামিন পান। গত ৭ আগস্ট খিলগাঁও পূর্ব গোড়ানের ভাড়া বাসায় ব্লগার নীলাদ্রি চ্যাটার্জি ওরফে নিলয়কে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় করা মামলায় সাদ আল নাহিন, কাওসার ও কামাল হোসেন সর্দারকে আবারও গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।” [ প্রথম আলো, ৮.১১.২০১৫]

এ ক্ষেত্রে কাম্য ছিল জঙ্গী বিচারে দ্রুত বিচারের আলাদা ট্রাইব্যুনাল করা। জঙ্গী বিচারে দীর্ঘসূত্রতা না করা বাঞ্ছনীয়। হুমায়ুন আজাদ হত্যা প্রচেষ্টার বিচার এখনও হয়নি। এক দশক হয়ে গেল। এখন যারা নিহত হচ্ছেন তাদের বিচার হবে কখন? অভিজিতের হত্যাকারীও তো ধরা পড়েনি। তা’হলে নিহতের কোন পিতা যদি বলেন বিচারের দরকার নেই, সবার শুভবুদ্ধি হোক তা’হলে কি অন্যায় কথাটা তিনি বলেছেন? জঙ্গী দমনের জন্য আলাদা সেল থাকা উচিত, যারা গ্রেফতার ও আদালতের বিষয়টি শুধু মনিটরিং নয়, সমন্বয়ও করবেন। দক্ষ প্রসিকিউশন টিম থাকা উচিত। পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্র তা করেছে। আমাদের সরকার তা করেনি। ফলে প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক পদক্ষেপ ফলদায়ক হয়নি। বরং মনে হয়, সবার যেন এক ধরনের সহানুভূতি আছে জঙ্গীদের প্রতি, যেন তারা ইসলামের ধারক। চিন্তার স্থিতাবস্থা হলো তাই। পাকিস্তান আমল থেকেই কেউ ইসলামের কথা বললে তাকে কেউ ঘাঁটাতে চায় না। প্রশ্ন করলে মনে হয় তা ইসলামের বিরুদ্ধে করা হলো।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের কথা বলছিলাম। ২০০৯ সালে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট গঠনের প্রস্তাব করে পুলিশ বিভাগ। প্রধানমন্ত্রীর দফতর তা অনুমোদনও দেয় কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন আজ ৭ বছর পরও হয়নি। পত্রিকার প্রতিবেদন দেখুন-

“নানা ঘটনাপ্রবাহে দেশে জঙ্গীদের গোপন মিশন থাকার প্রমাণ মিললেও তা প্রতিরোধে সরকারের কার্যকর কোন কর্মকা- নেই বললেই চলে। একদিকে জঙ্গী গ্রেফতার হচ্ছে, অন্যদিকে তারা জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জঙ্গীদের জামিন বা মুক্তি ঠেকাতে কোন তৎপরতা নেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর। নজরদারির অভাবে সহজেই জঙ্গীরা পালিয়ে যাচ্ছে। ছয়টি জঙ্গী সংগঠন নিষিদ্ধ করা হলেও বাকিগুলো নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া থমকে আছে। জামায়াত-শিবিরের লোকজনও জঙ্গীদের সঙ্গে আঁতাত করছে বলে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত ‘জঙ্গীবাদ প্রতিরোধ এবং প্রতিকার জাতীয় কমিটি’ প্রায় অকেজো। ৬৪ জেলার কমিটিগুলোরও তদারকি নেই। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকা- চালু করতে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে অনুমোদন পাওয়ার পরও ‘রহস্যজনক’ কারণে তা শুরু হয়নি। এখনও দেশে ৪৭টি জঙ্গী সংগঠন সক্রিয় আছে বলে জানা গেছে।

এদিকে জঙ্গী দমনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ আছে খোদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। অনেক জঙ্গী মামলা রয়েছে, যা সাক্ষীর অভাবে দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে। এ ক্ষেত্রে সাক্ষ্য না দেয়ার বেলায় পুলিশও এগিয়ে আছে, যার কারণে গত পাঁচ বছরে সারা দেশে ৩৪২ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

কয়েকটি উপকমিটি ও টাস্কফোর্স গঠন করেও দেশে জঙ্গীবাদী-উগ্রবাদী গোষ্ঠীর বিস্তার বন্ধ হয়নি। অর্থের লোভে পড়ে নয়, আদর্শগত প্ররোচনার মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণরা যোগ দিচ্ছে বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাবে গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন নিষিদ্ধ সংগঠনের যত সদস্য গ্রেফতার হয়েছে তাদের অন্তত ৭০ শতাংশ তরুণ ও শিক্ষার্থী। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, পরিবার ও ব্যক্তি পর্যায়ের সচেতনতার অভাবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে উগ্রপন্থা ছড়িয়ে দিয়ে সফল হয়েছে জঙ্গী সংগঠনগুলো” [ঐ]।

চলবে...