২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বটতলা হাটখোলা ॥ এক সময়ের মিলনমেলা

  • আজ আর তেমন করে দেখা মেলে না

কাঁধে ধামা। হাতে দড়িতে ঝোলানো তেলের শিশি। ঠোঁটে হাসির রেখা। দুুপুর গড়িয়ে গেছে। রোদমাখা দিন। কাঁচাপথ ধরে দল বেঁধে গল্প-গুজব করে হাটে যাচ্ছে হাটুরে। ফিরছে রাতের অন্ধকারে। পথের ধারে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। জোনাকির মিটি মিটি আলো। এমন দৃশ্য আজ আর চোখে পড়ে না। তবে সেই হাট-বাজার আছে আজও। সেদিন মানুষে মানুষে মিলনমেলার হাটের সঙ্গে আজকের হাটের মিল থাকলেও আন্তরিকতার দূরত্ব বেড়েছে। একটা সময় হাট যতটা ছিল বাণিজ্যিক তার চেয়ে বেশি ছিল দশ গাঁয়ের সমাজ জীবনের ভাব আদান-প্রদানের তীর্থভূমি। সাধারণত সপ্তাহে দু’দিন হাট বসত। বলা হতো হাটবার। এই দু’দিন গ্রামের ছেলে বুড়ো সকলে হাটে না গেলে পেটের ভাত হজম হয়নি। কত কথা জড়ো হয়ে থেকেছে পেটের মধ্যে। হাটে গিয়ে কারও সঙ্গে শেয়ার না করা পর্যন্ত ষোলকলা পূর্ণ হয়নি।

একবিংশ শতকে ‘শেয়ার’ কথাটি সামাজিক সকল কর্মকা-ে এবং ডিজিটালাইজড হয়ে সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একান্ত জীবনের অনেক বড় অধ্যায়ে রূপ নিয়েছে। আজ যেভাবে প্রযুক্তির সঙ্গে একীভূত হয়েছে কাছের অতীতে তা ছিল মানব হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের (বা মনের সঙ্গে মনের) মিলনের মধুময়তার এক প্রান্তর। এই প্রান্তরটি ছিল ‘হাটখোলা’।

মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে একটি গান বেজেছে (আজও বাজে) ‘আবার জমবে মেলা বটতলা হাটখোলা অঘ্রাণে নবান্নের উৎসবে...’ সেই চেনা বটতলা ও হাটখোলার মধ্যে বটতলার দেখা আজ তেমন মেলে না। তবে হাটখোলা আজও আছে, থাকবে হয়ত অনন্তকাল। কিই না হতো এই হাটখোলায়! সেদিনের হাটখোলার চিত্র ছিল এ রকমÑ অনেকটা জায়গাজুড়ে চারটি বাঁশের খুঁটির ওপর খড়ের চালার ছোট ছোট ঝুপরিঘর। যার চারদিক ফাঁকা। হাটবারে সকালের পর পরই এই ঘরে পসরা সাজিয়ে বসেছে দোকানিরা। বেলা গড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাটুরেদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। গ্রামের মাতবর শ্রেণী ও দ্বিতীয় সারির উঠতি প্রভাব বিস্তার করে মাতবর হবার চেষ্টা করছে, এমন লোকজন হাটে অবস্থান নিত। সকাল থেকেই হাটের মিষ্টি ও চায়ের দোকানের ঝুপরিঘর সরব হয়ে উঠেছে। অন্যদিন টেবিল খালি পড়ে থাকলেও হাটবারে বাড়তি বেঞ্চ রাখতে হতো। সকালে আড্ডার প্রথম অধিবেশন কিছুক্ষণের জন্য মুলতবি হয়ে বিকেলের আগেই শুরু হয়ে গেছে তক্কযজ্ঞের মহা আয়োজন।

এই সময় শত সহস্র কথার ফুলঝুরির সঙ্গে সমাজবদ্ধ মানুষের সমাজ জীবনের হেন কিছু নেই যা আলোচনায় স্থান পায়নি। যদি কারও মনে না থাকত তা মনে করিয়ে দেয়ার সঙ্গীর অভাব ছিল না। গ্রামের মোড়ল মাতবর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হলে তো কথাই নেই। চামচা মোসাহেব কাকে বলে, কত প্রকার তা পরিষ্কার হয়ে যেত। এই চামচা ও নেতাদের হাতার বড় বৈশিষ্ট্য হলো এরা গাছের ওপরেরটা খাবে, তলারটাও কুড়াবে। আবার এদের ছাড়া মোড়ল মাতবর চলতেও পারে না। হাটবারের অপেক্ষায় থাকে তারা।

কত রকমের মানুষের যে দেখা মেলে হাটে...। হাটবার অনেকটা মেলার রূপ নেয়। সর্বরোগের ওষুধ থেকে শুরু করে দাঁতের মাজন, দাদ ও কাউরের মলম নারী পুরুষের গোপন বিষয়ের মুশকিল আসানের ক্যানভাসারসহ কত কিছিমের ক্যানভাসার যে কত ধরনের ম্যাজিক-মজমা নিয়ে পসরা বসায়...। কেউ দেখায় বানরের খেলা। লোকজন তাদের ঘিরে ভিড় করে, কা--কারখানা দেখে মজা পায়। হাটবারের এই বিনোদন একেবারে অকৃত্রিম। হাটুরেদের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তারা হাটে গিয়ে যা দেখে যা শোনে তা বাড়িতে গিয়ে প্রিয়জন প্রতিবেশীর সঙ্গে শেয়ার না করলে মনে করে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে। গ্রামের কোন বাড়িতে কি হলো, কার বাড়ির কোন ছেলে বা মেয়ে কি করল, কার বিয়ে-থা হলো কি হলো না, না হলে কেন হলো না, গৃহস্থ বাড়ির কে কোথায় কি বলেছে কি করেছে, মোড়ল মাতবর কে কোথায় কি করল... হাঁড়ির খবর থেকে ঘরের খবর পাড়া-পড়শীর খবর কিছুই বাদ যায় না। ভিলেজ পলিটিকসের সঙ্গে ট্রিকস, কার জমি জিরাত কিভাবে ভোগ দখল করা যায় কে কিভাবে তা করছে আগামীতে কে চেয়ারম্যান মেম্বারে দাঁড়াবে, কার সঙ্গে কার দহরম মহরম, কার সঙ্গে কার পীরিত, কে কার বউয়ের দিকে তাকাল এসব কথাও বাদ যায় না। পরনিন্দা পরচর্চা তো কথামালার বাড়তি আকর্ষণ। আলাপের সূত্রে এমন অলঙ্কার ছিল অপরিহার্য।

সেই দিনের হাটে হাঁড়ির খবর ভেঙ্গে দেয়ার চল আজও রয়ে গেছে। সঙ্গে আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল যুগের পরশ পড়েছে। হাটখোলায় এমন রসাল সরস আলাপের কারণে হাটের দিনে গ্রামের টাউট শ্রেণীর মানুষের শুধু নয় গৃহস্থ ও বড় কৃষকদেরও হাটে যাওয়া নেশায় পরিণত হতো। কোন ইলেকশনের সময় প্রার্থীর প্রচারের বড় জায়গা হাট। ইলেকশন যদি হয় শীতের সময়, তাহলে শীতের থাবাকে কাবু করে ইলেকশনের প্রভাবে হাটে উষ্ণতা বেড়ে গেছে। ওই সময় চায়ের দোকানের সামনে ভিড় লেগেই থাকত। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো যখন যে প্রার্থী আসে, সে প্রার্থীর পক্ষে একই ধরনের কথা বলে তাকে ওপরে তুলেছে হাটুরেরা। হাট শেষে বাড়িতে গিয়ে ভোট নিয়েও হয় সরস আলোচনা। হাটে যিনি এত খাতির যতœাদি করলেন তার প্রতিক্রিয়া কিষান ও গৃহস্থ বাড়ির উঠান হয়ে ফের পরের হাটে নানা কথায় উপস্থাপিত হয়েছে।

হাটখোলায় আরেক পেশার মানুষের আগমনও হাটের আলাপচারিতায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। এরা হলো ঘটক। কারও বাড়ির উঠানে গিয়ে সাহস করে কথা বলতে না পারলে মোক্ষম জায়গা হাট। এই ঘটক শ্রেণী এতটাই সুচতুর যে বুঝতেই দেবে না প্রস্তাব কেন সরাসরি বাড়িতে না গিয়ে হাটে দেয়া হচ্ছে। কৌশলী ঘটক হাটে পাত্র বা পাত্রীপক্ষকে পরখ করে। কতটা নিরাপদ না অনিরাপদ। পছন্দ হলে ঘটক নজরানার মাত্রা কেমন হবে তাও অনুমান করার কাজ সেরে নেয়।

সন্ধ্যায় বড় কুপি বাতি জ্বালানো হতো প্রতিটি দোকানে। মোটা সলতের কুপি বাতির উজ্জ্বল আলো দূর থেকে দেখা গেছে। সেদিনের সেই হাট বর্তমানের আদলে আধুনিকায়ন হয়েছে। এখন আর কুপিবাতি নেই। বিদ্যুতায়িত হয়েছে। খড়ের চালার ঝুপরি ঘরের বদলে পাকা অবকাঠামোর ওপরে টিন সেডের নিচে দোকানিরা বসে। মিষ্টি ও চায়ের দোকানেও পরিবর্তন এসেছে। ঝুপরি ঘর নেই। বেঞ্চের বদলে টেবিল চেয়ার। হাটেও ফাস্টফুড ঢুকেছে। পোশাক-আশাক ও আড্ডার আলাপচারিতায় পরিবর্তন এসেছে। ঘরের খবর হাঁড়ির খবরের চেয়ে বেশি ভাবনা আগামীকে নিয়ে। উন্নত সড়ক ব্যবস্থা ও অবকাঠামো বিদ্যুতায়ন আধুনিক সরঞ্জামাদি মানুষকে দ্রুত বেগে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, কেড়ে নিচ্ছে আবেগ...। তারপরও হাটখোলার আবেদন চিরন্তন।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে