২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হাট ছিল বিনোদন কেন্দ্র

গ্রামীণ হাট এক সময়ে ছিল বিনোদনের অন্যতম উৎস। হাটে মিলেছে বিনোদনের নানা উপকরণ। পেশার তাগিদে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ বিভিন্ন ধরনের বিনোদন নিয়ে গেছে। আর সেসব বিনোদনের উপকরণ শিশু, যুব, বৃদ্ধ সকলকেই সমানভাবে আকর্ষণ করেছে। কেনাবেচা, দেখা সাক্ষাতের পাশাপাশি অনেকে যেমন ফাঁকফোকরে বিনোদন উপভোগ করেছে। আবার বহু মানুষ সপ্তাহের একটা দিনের হাটে কেবলমাত্র বিনোদনের জন্যই গেছে।

বিনোদনের জনপ্রিয় মাধ্যমগুলোর মধ্যে শারীরিক কসরত বা সার্কাস ছিল অন্যতম। প্রধানত- দু’শ্রেণীর মানুষ এসব দেখিয়েছে। এক শ্রেণীর লোক ছিল সার্কাসনির্ভর। আরেক শ্রেণীর লোক ছিল যারা সার্কাস বা শারীরিক কসরত দেখিয়ে হাটুরে লোকজন জমিয়ে তাদের কাছে ওষুধ, তাবিজ-কবজ বিক্রি করেছে। তিন-চার দশক আগেও পটুয়াখালী-বরিশাল অঞ্চলের বড় বড় সাপ্তাহিক হাটে যে কয়েকজন ক্যানভাসার বা ওষুধ বিক্রেতা সার্কাস দেখিয়ে ‘মজমা’ জমিয়ে তুলতেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ইয়াছিন ডাক্তার ও ভূড়িয়ার জয়নাল ডাক্তার। ছিপছিপে গড়নের মুখ ভর্তি দাড়ি নিয়ে জয়নাল ডাক্তার দেখাতেন সরু লোহার শিকের রিংয়ের মধ্যে দিয়ে শরীর গলিয়ে দেয়ার কসরত। আর মোটাসোটা গড়নের ইয়াছিন ডাক্তার দেখাতেন লাফঝাঁপ কুস্তি। তারা দুজনেই বাত ব্যথার সালশা-বড়ি বিক্রি করতেন। এ রকম আরও বেশ কয়েকজন নামকরা ক্যানভাসার এ অঞ্চলে ছিলেন। পেশাজীবীরা দেখাতেন সার্কাস পার্টি থেকে শিখে আসা নানান খেলা। দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটা। সাইকেলের ওপর শারীরিক কসরত। ত্রিফলা বর্শাসহ বিভিন্ন ধরনের খেলা দেখিয়ে দর্শকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থের বিনিময়ে চালাতেন তাদের সংসার। শিশুদের দিয়েও সার্কাস দেখানো হয়েছে হাটে। সার্কাসের পাশাপাশি বলেছে জাদুপ্রদর্শন। হাত সাফাই থেকে গা শিউরে ওঠা গলা কেটে ফেলা, অনেক ধরনের খেলাই দেখানো হয়েছে।

সাপ খেলা দেখিয়ে তাবিজ বিক্রি ছিল গ্রামীণ হাটে বেদেদের আয়-উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন। হাটের লোকজনদের কাছে সাপের খেলার সঙ্গে বেদে নারীদের অঙ্গভঙ্গিও ছিল দর্শনীয়। সে সময়ে বেদেদের মধ্যে এক ধরনের অলিখিত প্রতিযোগিতা ছিল-কে কত বড় বা হিংস্র সাপ হাটে নিয়ে আসতে পারে। এ নিয়ে গ্রামে হৈ হুল্লোর পড়ে গেছে। গ্রামীণ হাটে ‘কবিয়াল’ নামে এক শ্রেণীর পেশাজীবী ছিল, যারা লোক জমা করে সুর করে কবিতা পড়তেন। আবার সে কবিতা বিক্রিও করতেন। চার পাতার কবিতার দাম ছিল এক/দু’ টাকা। সাম্প্রতিক চাঞ্চল্যকর ঘটনা অবলম্বন করে কবিয়ালরা কবিতা রচনা করতেন আবার তা ছাপিয়ে হাটে হাটে ঘুরে বেড়াতেন। রাজা-বাদশার জীবনী এবং ধর্মীয় বিষয় নিয়েও কবিতা হতো। গ্রামের মানুষ সেসব কবিতা কিনে রাত জেগে বাড়ির উঠোনে আড্ডা জমিয়েছে। বহুরূপী পোশাক পরে টিনের চোঙা নিয়ে এক শ্রেণীর মানুষ কৌতুকরস সৃষ্টি করে গ্রামীণ হাটে বিড়ি-সিগারেট বিক্রি করেছে, এটিও ছিল মানুষের কাছে বিনোদন।

গ্রামীণ হাটে গান-বাজনা ছিল বিনোদনের আরেক মাধ্যম। এ পেশাতেও দু’শ্রেণীর মানুষ সম্পৃক্ত ছিল। একদল ছিল গাননির্ভর পেশাজীবী। আরেক দল গান গেয়ে লোকজন জমায়েত করে ওষুধ বিক্রি করেছে। গাননির্ভর পেশাজীবীরা নিত্যনতুন বৈচিত্র্য নিয়ে এসেছে। ৮/১০ শিল্পী নিয়ে দল গঠন করে বাদ্যযন্ত্রসহ সাজু-গুজু হয়ে হাটে এসে তারা লোক জমায়েত করেছে। কোন কোন বড় হাটে হ্যাচাক লাইট জ্বালিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত গানের জলসা হয়েছে। যে দলে নারী শিল্পী ছিল, সে দলের কদরই ছিল আলাদা। তাদের আয়-রোজগারও ছিল ভাল। লাঠিখেলা ছিল হাটে বিনোদনের সঙ্গী। জমিদারদের রাজত্ব বিদায় নেয়ায় লাঠিয়ালরা বেকার হয়ে পড়ে। সময়ের পরিক্রমায় এদেরই একটি অংশ হাটে হাটে ঘুরে লাঠিখেলা দেখিয়ে সংসার চালিয়েছে। গ্রামীণ হাটে বসত পুঁথিপাঠের আসর। পয়সার বিনিময়ে এক শ্রেণীর মানুষ পুঁথিপাঠ করেছে। কাঠের চৌকোনা বাক্সে ‘বায়োস্কোপের’ পাশাপাশি দুরবিনের মতো ছোট্ট যন্ত্রে স্থির ছবি দেখানো হয়েছে। বায়োস্কোপের যেমন ছিল দর্শক, তেমনি দুরবিনের ভেতরে চোখ ঢুকিয়ে ছবি দেখার মানুষেরও ছিল না অভাব।

প্রথম যখন গ্রামের হাট-বাজারে কলের গান এবং আরও পরে মাইক এলো, মানুষের মাঝে তা নিয়ে সৃষ্টি হয় উন্মাদনা। কলের গান আর মাইকের শব্দ শুনতে হাজার হাজার মানুষ এসেছে ছুটে। মাইকের শব্দে গ্রামীণ হাট হয়েছে জমজমাট।

Ñশংকর লাল দাশ

গলাচিপা থেকে