১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় এই হামলা

‘খুব জোরে গান বাজছিল তখন। হঠাৎই একটা শব্দ শুনে ঘুরে দাঁড়াই। ক্যাপ পরা এক ব্যক্তির ছায়া দেখতে পাই, সে গুলি ছুড়ছিল। সে আমার দিক বরাবর গুলি ছুড়ছিল।’ শুক্রবার সন্ধ্যায় প্যারিসের বাতাক্লঁ কনসার্ট হলে সন্ত্রাসী হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া এক তরুণ তার রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। ওই তরুণ ফরাসী সংবাদমাধ্যম লিবারেশনকে বলেন, মানুষজন একে একে মাটিতে পড়ে যেতে থাকল। আমার পাশের জনও মরে গেছে বলে ধারণা করছি। সামনে থাকা এবং মঞ্চের আশপাশে থাকা অসংখ্য মানুষকে টপকে ঘরের উল্টোদিকে থাকা ইমার্জেন্সি এক্সিট দিয়ে দৌড়ে বের হয়ে আসি আমি। নাম না জানা ওই প্রত্যক্ষদর্শী বাতাক্লঁ থেকে বেরিয়ে একটি ক্যাফেতে লুকিয়ে পড়েন। ‘এখানে যুদ্ধ চলছে। কিছুক্ষণ আগেও গোলাগুলি হয়েছে’ বলছিলেন তিনি, আর সে কথা সবাই বিশ্বাসও করছিল। বাতাক্লঁ হলে তখন মার্কিন ব্যান্ড দল ইগলস অব ডেথ মেটালের কনসার্ট চলছিল। ওই সময়ই তিন বন্দুকধারী আক্রমণ চালায়। এক হামলাকারীকে ‘আল্লাহ আল্লাহ’ বলে চিৎকার করতে শুনেছেন বলে জানিয়েছেন জনাথন হিল নামে এক ব্রিটিশ। হামলার সময় সিটি হলের ৫০ গজের মধ্যে একটি এটিএম বুথে ছিলেন জনাথন। তিনি বলেন, যখন অর্থ তুলছিলাম তখনই তিনটি গুলির শব্দ পাই। যদিও প্রথমে আমি এগুলোকে গুলি বলে মনে করিনি, ভেবেছি রাস্তায় কেউ আতশবাজি ফুটাচ্ছে। একই সময়ে আমি ছয় ফুট ৪-৫ ইঞ্চির এক বিশালদেহী লোককে দেখতে পাই, রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যে ‘আল্লাহ-আল্লাহ’ বলে চিৎকার করছিল। ৫০ গজ দূর থেকে তাকে ককেসিয়ানদের মতো দেখাচ্ছিল। সে লোকজনকে ক্যাফে থেকে বের হয়ে এসে বাতাক্লঁর ভেতরে ঢুকতে বলছিল। ওই সময় আরেকটি গুলির শব্দ শুনি, আর বাইরে থেকে দেখতে পাই বাতাক্লঁর ভেতরে একজন পড়ে যাচ্ছে। আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ফ্রান্স ইনফোকে জানিয়েছেন, হামলা চালানো বন্দুকধারীরা ‘সেমি-অটোমেটিক অস্ত্র দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালায়।’ তিনি বলেন, ওখানে শুধু রক্ত আর রক্ত। আমরা কোনমতে জান নিয়ে পালিয়েছি। হামলা হয় স্টেডিয়াম স্তাদে দে ফ্রান্সের কাছেও। ওই স্টেডিয়ামে তখন খেলা দেখছিলেন সাংবাদিক ভিনসেন্ট।

তিনি বলেন, সবাই নামতে শুরু করে। শেষ বাঁশি বাজার পর পরই সবাই চলতে শুরু করে। কেউ জানে না বাইরে কী হয়েছে। খেলা চলার সময়ই হামলাকারীরা দুটো বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। খেলার প্রথমার্ধেই দুটো বিস্ফোরণের শব্দ শুনি। কিছুক্ষণ পর আরেকটা শুনি, যদিও পরেরটার আওয়াজ কম ছিল। মাঠের খেলায় এর প্রভাব না পড়লেও দর্শকরা বেশ বিচলিত হয়ে উঠেছিল বলে জানান ভিনসেন্ট। ওলাঁদের সঙ্গে ওই সময় গ্যালারিতে বসে খেলা দেখছিলেন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্যাঙ্ক ভালটার। বিস্ফোরণের পর পরই পুলিশের হেলিকপ্টারকে স্টেডিয়ামের ওপর চক্কর দিতে দেখা যায়। প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ দ্রুত চলে যান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, সেখানে বসে সব পরিস্থিতি দেখে জরুরী অবস্থার ঘোষণা দেন তিনি। স্টেডিয়ামের বাইরে আত্মঘাতী বোমা হামলা হলেও প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে একটি এশীয় রেস্তরাঁর বাইরে হামলা হয় কনসার্ট হলের মতোই আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে। বেন গ্রান্ট নামে একজন বিবিসিকে বলেন, হামলাকারীরা গাড়ি থেকে গুলি ছোড়ে। স্ত্রীকে নিয়ে বারে বসেছিলেন তিনি। সেখানেই বন্দুকধারীদের হামলার মুখে পড়েন। তিনি বলেন, সেখানে অনেক মৃতদেহ পড়েছিল। এটা একটা ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। আমি বারের পেছনে বসেছিলাম, তাই পুরোটা দেখতে পাইনি। গুলির শব্দ শোনার পরই কয়েকজনকে পড়ে যেতে দেখলাম। নিজেদের বাঁচাতে আমরা টেবিলের নিচে ঢুকে পড়ি। ঘটনার পরও আমরা অনেকক্ষণ বারে আটকেছিলাম, কারণ আমাদের সামনে তখন মৃতদেহের স্তূপ। রুয়ে বিশা রেস্তরাঁয় হামলা চালায় বন্দুকধারীরা। তার কাছাকাছি পেতি ক্যাম্বোজে থাকেন পিয়েরে মন্টফোর্ট। তিনি বলেন, আমরা ৩০ সেকেন্ড ধরে গুলির শব্দ পাই, এগুলো ছিল নীরবচ্ছিন্ন, যাকে আমরা প্রথমে আতশবাজি ভেবেছিলাম। রেস্তরাঁয় থাকা আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, গুলির পর পরই সবাই মাটিতে শুয়ে পড়ে। এক তরুণকে দেখলাম আহত এক মেয়েকে কোলে নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করছে। মনে হচ্ছিল, মেয়েটা বেঁচে নেই।