২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জ্বালানি তেলের ভেজাল ঠেকাতে এবার মাঠে নামছে বিপিসি

রশিদ মামুন ॥ জ্বালানি তেলের ভেজাল প্রতিরোধে এবার মাঠে নামছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং বিপিসি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। জ্বালানি বিভাগ থেকে সকল জেলা প্রশাসককে সম্প্রতি চিঠি দেয়া হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, সম্প্রতি নওগাঁর জেলা প্রশাসক বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে ভেজাল জ্বালানি তেল বিক্রির কথা জানায়। এরই প্রেক্ষিতে বিপিসি নওগাঁর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে অভিযান চালিয়ে দেখে এক হাজার টন জ্বালানি তেল বিপণন কোম্পানির কাছ থেকে কিনলেও তাদের কাছে মজুদ রয়েছে দুই হাজার টন। অতিরিক্ত এক হাজার টন তেল কোন জায়গা থেকে এলো তার কোন উত্তর দিতে পারেনি ফিলিং স্টেশনগুলোর কর্তৃপক্ষ। ওই তেল পরীক্ষা করে দেখা গেছে তা মূলত গ্যাসের উপজাত কনডেনসেট।

বিপিসি সূত্র বলছে এর প্রেক্ষিতে বিপিসির পরিচালক (বিপণন) মীর আলী রেজা গত সেপ্টেম্বরে দেশের কিছু পেট্রোল পাম্পে আকষ্মিক অভিযান চালিয়ে দেখেছেন তাদের কাছে বিভিন্ন তেল কোম্পানির কাছ থেকে কেনা তেলের অতিরিক্ত মজুদ রয়েছে। এর পরই অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়।

বিপিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আমরা মাঠ পর্যায়ে অভিযান পরিচালনার জন্য প্রতিনিধি মনোনয়ন দিয়ে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়েছি। স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন তেল কোম্পানির প্রতিনিধিরা মোবাইল কোর্টকে সহায়তা করবে। তিনি বলেন, আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি এর পুরোটাই গ্যাস কোম্পানির কনডেনসেট। গ্যাস কোম্পানির কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দেশের একটি চক্র এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, মোবাইল কোর্ট জ্বালানি তেলের মান পরীক্ষা, সঠিক পরিমাপ এবং উৎস নিশ্চিতে কাজ করবে। তিনটি ক্ষেত্রেই তেল বিপণনকারীরা অসাধু পন্থা অবলম্বন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ জন্য শুধু তেলের মান পরীক্ষার মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। গ্রাহক হয়রানি প্রতিরোধের সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত হচ্ছে কি না তা দেখা হবে। দেশে এখন বছরে গড়ে ৫৫ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে ১৪ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল পরিশোধন করা হয়। বাকিটা পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। কিন্তু সারাদেশে ভেজাল তেলের রমরমা বাণিজ্য চলার অভিযোগ রয়েছে। এক শ্রেণীর অসাধু তেল বিক্রেতা দেশের গ্যাস কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাসের সহজাত হিসেবে প্রাপ্ত কনডেনসেট কিনেতেলে ভেজাল দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কমে যাওয়ার পরেও দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের চড়া দামের সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা এই সুযোগ নিচ্ছে।

কনডেনসেট প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল, কেরোসিন ইত্যাদি উৎপাদন করা হয়। এখন দেশে পেট্রোবাংলার অধীনস্থ কিছু প্ল্যান্ট, বিপিসির মালিকানাধীন ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) ও বেসরকারী কিছু ফ্রাকশনেশন কারখানায় কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন করা হয়। এ ছাড়া আরও কিছু বেসরকারী প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হয়েছে। অনেকক্ষেত্রেই অভিযোগ রয়েছে বেসরকারী কোম্পানিগুলো সারাদেশে তেল ভেজালের সঙ্গে জড়িত। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে এ রকম কিছু ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট মালিকদের বিরুদ্ধে তেলে ভেজাল মেশানোর অভিযোগ রয়েছে। সব থেকে বেশি ভোজাল মেশানো হচ্ছে অকটেন এবং পেট্রোলে। দামের দিক থেকে এই দুই ধরনের জ্বালানির দামই বেশি। তবে সব থেকে বেশি বিক্রি হওয়া ডিজেলে ভোজাল মেশানো সহজ হওয়ায় তাও বাদ পড়ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলেন, পেট্রোল এবং অকটেন হাল্কা জ্বালানি তেল কিন্তু ডিজেল তৃলনামূলকভাবে একটু ভারি হওয়ায় ভেজাল দেয়া সহজ।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময় এসব বিষয়ে তদন্ত করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করলেও ভেজাল প্রতিরোধ করতে পারেনি। সংশ্লিষ্টরা বলেন, সারাদেশের তেল বিপণন পর্যায়ে একটি চক্র গড়ে উঠেছে। ওই চক্র একটাই শক্তিশালী যে তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া সহজ হয়ে ওঠে না। বিভিন্ন সময়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এসব বিষয়ে জ্বালানি বিভাগকে সতর্ক করলেও ভেজাল প্রতিরোধ সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে পেট্রোল পাম্পগুলোয় শুধু ভেজাল তেল বিক্রি নয়, তেলের পরিমাণ কম দেয়ার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। এর আগেই বিভিন্ন সময় অভিযানে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে সে সব অভিযান অজানা কারণেই বন্ধ হয়ে গেছে। এবার সারাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে বা কতদিন চলবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এর আগে পেট্রোবাংলা সিএনজি স্টেশন মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে গ্যাস কম দেয়ার অভিযোগ পায়। কিন্তু অদৃশ্য কারণে ওই অভিযান মাঝ পথে এসে বন্ধ করতে হয়। সিএনজি স্টেশন মালিকরা এই অভিযানে সরকারকে সহায়তা করার আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে তারাই ধর্মঘট ডেকে বসে।

প্রতি লিটার পেট্রোল ৯৪ এবং অকটেন ৯৯ টাকা এবং ডিজেল ৬২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর বিপরীতে এক লিটার কনডেনসেটের দাম গড়ে মাত্র ২২ টাকা। কোন কোন ক্ষেত্রে ফ্রাকশনেশন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজে তেলে ভেজাল দিচ্ছে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে পাম্প মালিকরা অবৈধ উপায়ে কনডেনসেট কিনেও ভেজাল দিচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠলেও বিপিসি বা জ্বালানি বিভাগ তা বন্ধ করতে পারেনি।

এতে শুধু ক্রেতাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয় সরকারও বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। কেননা প্রতি লিটার তেল বিক্রি থেকে সরকার অন্তত সাত থেকে আট টাকা ভ্যাট পেয়ে থাকে। তেলে ভেজাল মেশালে সরকার কোন ভর্তুকি পায় না। উল্টো বিবিসির বিক্রিও কমে যায়। বিপিসি এখন জ্বালানি তেল বিক্রি করে লাভ করছে। তাদের মুনাফাও এর ফলে কমে যাচ্ছে।

বেশি দামে ভেজাল তেল কিনে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন। এ ছাড়া ভেজাল মিশ্রিত তেল ব্যবহারের ফলে গাড়ির ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ঘন ঘন বিকল হয়ে পড়ছে। এতে করে গ্রাহক অসন্তোষ বেড়ে চলেছে। জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এর আগে সিএনজি স্টেশনের বিরুদ্ধে গ্যাসের পরিমাণ কম দেয়ার অভিযোগে অভিযান চালানো হয়েছিল। কিন্তু মাঝপথে এসে সিএনজি ব্যবসায়ীদের চাপে মাঝপথে এসে অভিযান বন্ধ করে দিতে হয়। জ্বালানি অতি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য বিধায় মাঠ পর্যায়ের বিক্রেতারা জনগণকে জিম্মি করে দাবি আদায় করে থাকে। এসব বিষয়ে সতর্ক হয়ে অভিযান পরিচালনা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।