২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

সিলেট মুরারীচাঁদ কলেজের আরও

স্মৃতি এবং ঢাকায় পাড়ি

(১৪ নবেম্বরের পর)

প্রথম খ-

কলেজে যখন ছাত্র ছিলাম তখনকার তিনটি স্মৃতি বেশ উজ্জ্বল রয়েছে। প্রথমটি হলোÑ তখন জেলা প্রশাসক হয়ে এলেন হামিদ হাসান নোমানি। তিনি বাংলা প্রেসিডেন্সির ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন, কথাবার্তা বলতেন উর্দু টানে। তবে তিনি ছিলেন খুবই সাম্প্রদায়িক এবং তাতে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়। তিনি ১৯৪৯ সালের আগস্ট মাসে আসেন আর কয়েক মাস পরেই ১৯৫০-এর মে মাসে বদলি হয়ে চলে যান। ১৯৫০-এর দাঙ্গায় তার ভূমিকা ভাল ছিল না বলেই সিলেটের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তার আশু বদলির ব্যবস্থা করেন।

এপ্রিল মাসে সিলেট ভ্রমণে এলেন তখন বাংলাদেশের সবচেয়ে সিনিয়র আইসিএস কর্মকর্তা টিআইএম নুরুন্নবী চৌধুরী। তিনি তখন ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার। তিনি ছিলেন রংপুরের মানুষ এবং ১৯২২ সালে তিনি আইসিএস-এ নিযুক্তি পান। তিনি ছিলেন আদর্শবাদী ও সৎ সরকারী কর্মকর্তা। তার স্লোগান ছিল ‘আমরা মৌমাছির মতো কাজ করে যাব।’ তিনি তার বক্তব্যে ও কর্মকা-ে দেশের উন্নয়নের জন্য গ্রামীণ পুনর্গঠনে জঁৎধষ জবপড়হংঃৎঁপঃরড়হ-এর ওপর খুব জোর দিতেন। তিনি কলেজে ১৯৫০ সালের ১০ এপ্রিলে একটি মনোগ্রাহী বক্তৃতা দেন, যেখানে জনসেবাকে একটি মহান ব্রত বলে উল্লেখ করেন। আমি ঢাকায় যখন ছাত্র তখন তিনি অবসরে যান এবং গ্রামীণ পুনর্গঠন আন্দোলনে নিজেকে নিবেদিত করেন। তার একটি মেয়ে আমাদের সঙ্গে ফরাসি ভাষা শিক্ষার ক্লাসে সহপাঠী ছিল। চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় এবং তিনি তার প্রাইভেট রিক্সায় চড়ে মাঝে মাঝে সলিমুল্লাহ হলে এসে আমার খোঁজ নিতেন। তৃতীয় বিষয়টি ছিল সিলেটের জন্য বেশ দুঃখজনক। জুন মাসে জানা গেল যে, সরকারী মহিলা কলেজটি সরকার আর পরিচালনা করবে না, যেহেতু কলেজের ছাত্রী সংখ্যা হিন্দু শিক্ষক ও ছাত্রীদের দেশান্তরের ফলে কমে গেছে। এই দুঃসংবাদ সিলেটে মোটেই গৃহীত হলো না। সবাই সিলেটের শিক্ষামন্ত্রীকে দুষলেন আর নাগরিক সিদ্ধান্ত হলোÑ যে করেই হোক কলেজটিকে চালু রাখতে হবে। ঠিক হলো কোন কলা বিভাগের ছাত্রীকে এমসি কলেজে গ্রহণ করা হবে না। সেখানে শুধু বিজ্ঞানের ছাত্রীদের নেয়া হবে। আমাদের মা-চাচিরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রীদের মহিলা কলেজে ভর্তি হতে তদ্বির করতে লাগলেন। অনেক শিক্ষিত নাগরিক অবৈতনিক শিক্ষাদানের দায়িত্ব নিলেন। এমসি কলেজে সাময়িকভাবে তাদের ক্লাস নেয়া চলতে থাকল এবং কলেজের জন্য নতুন উদ্যমে বাড়ি খোঁজা শুরু হলো। সৌভাগ্যের বিষয়, কলেজটি টিকে গেল এবং কয়েক বছর পর আবার সরকারী কলেজে পরিণত হলো। মুরারীচাঁদ কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক দ্বিজেন্দ্র বাবু কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিলেন।

১৯৫০ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফল বেরুলে সিলেটে খুশির জোয়ার বইলো। বিজ্ঞান বিভাগে মেধা তালিকায় সালাহুদ্দিন আহমদ প্রথম, আবদুল লতিফ চৌধুরী সপ্তম ও গোপিকা রঞ্জন চক্রবর্তী নবম স্থান অধিকার করলেন এবং বাণিজ্য বিভাগে মদন মোহন কলেজের অজিত মিত্র প্রথম স্থান দখল করলেন। বছরের শুরুতে ৩ জানুয়ারিতে গায়ক আব্বাসউদ্দিন আহমদ সিলেটে এলেন দেশাত্মবোধক গানের আসর জমাতে। তিনি মুরারীচাঁদ কলেজে অনুষ্ঠান করলেন। তার সঙ্গে যোগ দিলেন তার ছেলে মোস্তফা জামান আব্বাসী ও মেয়ে ফেরদৌসী বেগম। এছাড়া সম্ভবত গায়ক আবদুল লতিফও সঙ্গে ছিলেন। কলেজের দিনগুলো ছিল কর্মময় ও ব্যস্ত এবং অবশ্যই আনন্দদায়ক। কলেজে সহশিক্ষা থাকলেও ছাত্রীসংখ্যা ছিল খুব কম, শুধু বিজ্ঞান বিভাগে এবং বিএ ক্লাসে কতিপয় ছাত্রী ছিল। তাদের সঙ্গে ছেলেদের কথা বলার সুযোগ ছিল খুব কম, বন্ধুত্ব স্থাপনের সুযোগ ছিল প্রায় শূন্যের কোটায়। আমরা কলেজে প্রবেশ করেই এক মুখরোচক খবর পেলাম যে, ইংরেজীর অধ্যাপক ঢাকার হাসিনা মঞ্জিলের জামাই সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন কোন এক মেয়েকে চিঠিতে প্রেম নিবেদন করার প্রত্যুত্তরে স্যান্ডেলের পিট্টি খেলেন এবং কোনমতে রক্ষা পেয়ে ঢাকায় পলায়ন করলেন। অধ্যক্ষ সাহেব তার ভবিষ্যত বিবেচনা করে তাকে সিলেট ছেড়ে যেতে বাধ্য করেন। তার ভাল ছাত্র হিসেবে পরিচিতি তাকে সেবার রক্ষা করে। তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন পরে পেলাম যখন তিনি বিলেত থেকে পিএইচডি করে ইংরেজী বিভাগে রিডার হলেন। পরবর্তীকালে তিনি ছিলেন বড় মাপের রাজাকার এবং দেশ স্বাধীন হবার পর মুক্তিদের পিটুনিতে প্রায় মৃতাবস্থায় গুলিস্তান এলাকায় পরিত্যক্ত হয়েছিলেন। সেখান থেকে রক্ষা পেয়ে তিনি সৌদি আরবে পালিয়ে গিয়ে বাংলাদেশের শত্রুতায় লিপ্ত থাকেন এবং প্রায় ৫/৭ বছর পর দেশে ফিরে এসে যে কদিন বেঁচেছিলেন তার ব্রত দেশশত্রুতায় লিপ্ত থাকেন। বন্ধুমহলে আমরা তাকে বজ্জাত বলে ডাকতাম।

কলেজের লেখাপড়া ছিল যথেষ্ট ভিন্ন প্রকৃতির। এখানে শিক্ষকরা নিয়মিত কোন বই পড়াতেন না। লেখাপড়া ছিল বিষয়ভিত্তিক, বিভিন্ন নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে লেখাপড়া হতো। সেজন্য পাঠ্য নানা বই থেকে আহরণ করা যেত। ইংরেজী ও বাংলা বাধ্যতামূলক বিষয় দুটির জন্য অবশ্য নির্দিষ্ট বই ছিল। কলেজে পড়াশোনায় এবং পরীক্ষা প্রদানে আমার মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এলো। আমি যে কোন বিষয়ে অতিরিক্ত তথ্য আহরণে মন দিই এবং আমার মধ্যে প্রতিযোগিতার ইচ্ছা প্রবল হয়। আমি খোঁজ নিতে থাকি যে, অন্যত্র ভাল কলেজে কারা ভাল ছাত্র এবং তাদের উৎকর্ষ কি বিষয়ে বা কি কৌশলে। আমার এক বন্ধু যার নামটা ঠিক মনে নেই, সে ঢাকা কলেজে কিছুদিন পড়াশোনা করে। সে খবর দিল যে, ঢাকা কলেজে অনেক ভাল ছাত্র কলা বিভাগে পড়াশোনা করে এবং তাদের মধ্যে সবচেয়ে ভাল হলো গোলাম মোস্তাফা, যে প্রবেশিকা পরীক্ষায়ও প্রথম দশজনের মধ্যে উচ্চপর্যায়ে ছিল। মোস্তাফাকে আমার একজন অপরিচিত প্রতিযোগী হিসেবে মনে হলো। কলেজের লেখাপড়ায় আর একটি বড় পরিবর্তন হলো লেখাপড়ার মাধ্যম। এবার ইংরেজী হলো এই মাধ্যম এবং এতে আমি বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। ১৯৫০ সালে কলেজে প্রথম বার্ষিক পরীক্ষায় আমি প্রায় প্রতিটি বিষয়ে ৭০-এর অনেক বেশি নম্বর পাই এবং তাতে আমার আত্মবিশ্বাস বেশ চাঙ্গা হয়।

চলবে...