২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বন্দী হস্তান্তর

ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সাধারণ সম্পাদক অনুপ চেটিয়া ও বাংলাদেশের আলোচিত সেভেন মার্ডারের অন্যতম আসামি নূর হোসেনের শান্তিপূর্ণ ও সফল হস্তান্তর সম্পন্ন হয়েছে। আইনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই হস্তান্তর সম্পন্ন হয়। এতে দুই দেশের নেতৃত্বের সন্ত্রাসবিরোধী মনোভাব, জনগণের প্রতি ভালবাসা এবং সর্বোপরি ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন ঘটেছে। এটা নিঃসন্দেহে দুদেশের পররাষ্ট্র ও কূটনীতির বড় সফলতাও বটে। উল্লেখ্য, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অসমকে বিচ্ছিন্ন করে একটি আলাদা রাষ্ট্র কায়েমের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে সশস্ত্র সংগঠন উলফা। অনুপ চেটিয়া দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক ছিলেন। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার মোহাম্মদপুরে তিনি গ্রেফতার হন। তিনটি মামলায় আদালত বিভিন্ন মেয়াদে তাকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেয়। সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জরিমানা না দেয়ায় আরও দেড় বছর সাজা ভোগ করেন তিনি। সাজা ভোগ শেষ হলেও মুক্তির ব্যাপারে আইনী জটিলতা ছিল। মূলত বিদেশী হিসেবে তিনি বাংলাদেশে বন্দী ছিলেন। এরপর জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে চিঠি দেন। এক সময় বাংলাদেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন কিন্তু মঞ্জুর হয়নি। যেহেতু বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্দী বিনিময় চুক্তিও ছিল না তাই মুক্ত কয়েদি হিসেবে তিনি কারাগারে ছিলেন। ২০১৩ সালে দুই দেশের মধ্যে বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর বন্দী হস্তান্তরের পথ খোলে। বিভিন্ন সময় ভারতও বাংলাদেশের কাছে অনুপ চেটিয়াকে তাদের কাছে হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ করে আসছিল। তিনি নিজেও ভারতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে হস্তান্তর করা হয় বলে জানিয়েছেন আইজি প্রিজন। অনুপ চেটিয়াকে হস্তান্তরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুনের আসামি নূর হোসেনকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করে ভারত। উল্লেখ্য, গত বছরের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লার শিবু মার্কেট এলাকা থেকে কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। এর তিন দিন পর তাদের লাশ নারায়ণগঞ্জের উপকণ্ঠে শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে ওঠে। নির্মম এই হত্যার ঘটনা দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচিত হয়।

ভারতে বাংলাদেশের অনেক অপরাধী পালিয়ে আছে। ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী, জঙ্গী, চোরাকারবারিসহ বিভিন্ন অপরাধী ভারতে পালিয়ে থেকে বাংলাদেশে অপরাধমূলক তৎপরতা চালাচ্ছে। দেশে এসে অপরাধ করে আবার ভারতে পালিয়ে যায় এই অপরাধীরা। তাদের একজন নূর হোসেন। সম্প্রতি ভারতের একটি আদালত তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেয়।

অনুপ যে তথাকথিত স্বাধীন ভূমির জন্য আন্দোলন করেছেন সেপথ ছিল নিষ্ঠুর এক সন্ত্রাসের। এর জন্য অনেক নিরীহ মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। প্রাণ দিতে হয়েছে দেশটির প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেককে। বাংলাদেশের ভূখ- ব্যবহার করে উলফা এককালে এসব সন্ত্রাসী কাজ চালাত। বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আস্তানা ও বিপুল অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। নূর হোসেনের সন্ত্রাসের পথ একই কারণে না হলেও তার অপরাধ চরম নিষ্ঠুরতাকে হার মানাবে।

ভারত আমাদের নিকট প্রতিবেশী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে দেশটির অবদান অনস্বীকার্য। এ অবদান এবং ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে উভয় দেশেরই সুসম্পর্ক জরুরী। অনুপ চেটিয়া ও নূর হোসেনের হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতার পথ আরও প্রশস্ত হলো। সবার প্রত্যাশা, শুধু নূর হোসেন নয়, আলোচনার মাধ্যমে এবং আইনী প্রক্রিয়ায় ভারতে পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধু হত্যার সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে আনা হবে।