২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ধান কাটা বন্ধ॥ ‘রাসেল ভাইপার’ আতঙ্ক

মামুন-অর-রশিদ, রাজশাহী ॥ বরেন্দ্র অঞ্চলে ফের বিস্তার লাভ করেছে বিলুপ্তপ্রায় বিষধর সাপ রাসেল ভাইপার। বিলুপ্তপ্রায় এ বিষধর সাপটি ২৫ বছর পর গত বছরের ডিসেম্বরে প্রথমে তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউনিয়নে দেখা মেলে। এবারও ওই সাপের বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে। এরই মধ্যে উপজেলার জুমারপাড়া, শিবরামপুর, সাইধাড়া, মাড়িয়া, জোকারপাড়া এলাকার কৃষকরা ধান কাটতে গিয়ে এ প্রজাতির ৬টি সাপ মেরেছে। শনিবারও একটি সাপ মারা হয়। এখন সাপ আতঙ্কে ক্ষেতের পাকা ধান কাটতে মাঠে নামছে না কৃষক।

জুমারপাড়া গ্রামের কৃষক শাহজাহান আলী, জাহাঙ্গীর আলম ও আব্দুর রাজ্জাক জানান, ১০ দিন ধরে প্রায় দিনই বিষাক্ত এ সাপ দেখা যাচ্ছে। শনিবার পর্যন্ত রাসেল ভাইপার সাপ মারা হয় ৬টি। এরপর থেকে কৃষকরা ভয়ে মাঠে নামছে না। ডাবল মজুরি দিয়েও মিলছে না ধান কাটার শ্রমিক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্বশেষ ভয়ঙ্কর রাসেল ভাইপার দংশনে গত ১৫ অক্টোবর উপজেলার সাঁইধাড়া গ্রামের ইয়ামিন কালু নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়। এর আগে গত বছরের নবেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সাপের দংশনে প্রাণ হারায় আরও অন্তত পাঁচজন। গত বছর এ সাপের দংশনে কয়েকজনের মৃত্যুর পর এ অঞ্চলে বিষধর এই সাপের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

চিকিৎসকরা বলছেন, এ সাপের দংশনে মানবদেহে পচন শুরু হয়। এর কিছু দিনের মধ্যেই মৃত্যু হয়। কোন প্রতিষেধকেই রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. আবু শাহীন জানান, এই সাপ বাংলাদেশে প্রায় বিলুপ্ত। ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে দেখা মেলেনি। তবে গত বছরের জুনে নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার আগ্রাদ্বিগুণ গ্রামের জামাল নামের কৃষককে প্রথম দংশন করে। সেই দিনই তাকে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর বিভিন্ন এ্যান্টি ¯œ্যাক ভেনম দিলে তিনি স্বাভাবিক হয়ে ওঠেন। তবে তিন দিন পর তার পায়ে কামড়ের জায়গায় পচন ধরে। ওই সময় মেডিক্যালে জরুরী টিম করে তার যে পায়ে কামড় দিয়েছিল সেই পা অর্ধেকটা কেটে ফেলতে হয়। কিন্তু ৮ দিনের মাথায় তার পা থেকে সারাশরীরে পচন ছড়িয়ে পড়লে তিনি মারা যান।

এর এক মাস পর চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার বরেন্দ্রা গ্রামের আব্বাস আলীর ছেলে আক্কাসকে (১৮) তার হাতের আঙ্গুলে সাপ কামড় দেয়।

এ রোগীকে দেখে সেই প্রথমের সাপে কাটা ব্যক্তির মতো একই ধরন মনে হয়েছিল। ৬ দিন পর হাত কেটে ফেলে দেয়ার পরও সে মারা যায়। এরপর একই বছরের ২৫ নবেম্বর তানোর উপজেলার শিবরামপুর গ্রামের নওসাদ আলীর ছেলে তাজিমুদ্দিনকে (২৫) পায়ে সাপ কামড় দেয়। একইভাবে তারও পা কাটার পর তার সারাশরীর পচন ধরে ৯ দিন পর সে মারা যায়।

ডা. আবু শাহীন আরও জানান, এই বিষধর সাপ বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্তি হয়ে যাওয়ার পর এর কোন ভ্যাকসিন বা ইনজেকশন নেই। সে কারণে তাদের বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, তিন জনের মৃত্যুর পর আমরা আন্তর্জাতিক বিষ গবেষণা কেন্দ্রের সাহায্য চেয়ে চিঠি দিয়েছিলাম। পরিপ্রেক্ষিতে জার্মান থেকে একটি গবেষণা টিম গত বছর তানোরের শিবরামপুর গ্রামের মাঠে মাঠে গিয়ে সেই বিষধর সাপ ধরে এনেছে। এ সাপের নমূনা সংগ্রহ করে বিশেষজ্ঞ দল পরীক্ষা নিরীক্ষা করছে।

তিনি জানান, রাসেল ভাইপার নামের এই সাপটি বরেন্দ্র এলাকায় বিস্তার লাভ করেছে। এই সাপ বছরে ২ বার বাচ্চা দেয় এক সঙ্গে ২০ থেকে ৩০টি। আর লম্বা হয় ২ থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত। এই সাপ ২৫ থেকে ৩০ বছর আগে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে দেখা যেত।

এদিকে ভয়ঙ্কর রাসেল ভাইপারের অস্তিত্বে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন তানোরের কৃষক। শনিবার উপজেলার জুমারপাড়ার মাঠে আরও একটি সাপ মারার পর আতঙ্কিত কৃষক এখন মাঠে ধান কাটার কাজে নামছেন না। অনেক জমির মালিক ডাবল মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাচ্ছেন না। স্থানীয় বাধাইড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান হেনা জানান, উপজেলার জুমারপাড়া, শিবরামপুর ও সাইধাড়া এলাকায় ধান কাটার কৃষক পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক দিন ধরেই ক্ষেতে ধান পেকে গেলেও কৃষকরা জীবন বিপন্নের ভয়ে মাঠে নামছেন না। এ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। তিনি জানান, এ সাপের অস্তিত্ব সবচেয়ে বেশি ধানের ক্ষেতে।

নির্বাচিত সংবাদ