১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বেচ্ছাচারি অধ্যক্ষ

  • পাবনা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

নিজস্ব সংবাদদাতা, পাবনা, ১৪ নবেম্বর ॥ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী এসএম ইমদাদুল হকের ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থ লোপাটের ঘটনায় ৯ বছরে দফায় দফায় তদন্ত হলেও অদৃশ্য কারণে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, অধ্যক্ষ প্রকৌশলী ইমদাদুল হক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ছাত্র ভর্তিতে সরকারী আইন অমান্য করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। সরকারী নিয়মে নিয়মিত কোর্সে ছাত্র ভর্তির বয়সসীমা সর্বোচ্চ ২০ বছর নির্ধারিত থাকলেও তিনি আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে তা কমিয়ে ১৭ করেছেন। বয়স কমানোর কারণে যে ছাত্র নিয়মিত কোর্সে ৫শ’ ৭৪ টাকায় ভর্তি হতে পারত তাকে স্বনির্ভর কোর্সে ভর্তি হতে বাধ্য হচ্ছে। স্বনির্ভর কোর্সের ভর্তিতে ছাত্রপ্রতি ২ হাজার ৬শ’ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এতে ছাত্রপ্রতি অধ্যক্ষ ৬শ’ ২৬ টাকা অতিরিক্ত আদায় করে বছরে লাখ লাখ টাকা আত্মসাত করছে। কম্পিউটার অপারেশন বিভাগে নিয়মিত ব্যাচে ১শ’ ছাত্র ভর্তি করা হলেও ৫৪ জনের কাছ থেকে স্বনির্ভর কোর্সের ভর্তি ফি আদায় করেছেন ২ হাজার ৬শ’ টাকা করে। যদিও এরা নিয়মিত কোর্সে ক্লাস করছে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তিতে মেধাবী ছাত্র বাদ দিয়ে অধ্যক্ষ কর্তৃক কথিত টাইগার বাহিনীর মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা নিয়ে ছাত্র ভর্তি করা হচ্ছে। অধ্যক্ষের দেয়া নামকরণকৃত এ টাইগার বাহিনীর সদস্যরা হচ্ছেÑ সুইপার, দারোয়ান ও এমএলএসএস। ভর্তির সময় ডিজেল ক্রয়ের নামে ছাত্রপ্রতি ২শ’ ও জেনারেটর ক্রয় বাবদ ২শ’ টাকা আদায় করা হচ্ছ। জেনারেটর ক্রয়ের ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এক ব্যাচের ছাত্রদের কাছ থেকে পরিশোধ হলেও ৩ বছর ধরে এ টাকা তোলা হচ্ছে। প্রতি সেশনে সাইকেল গ্যারেজ বাবদ ছাত্রপ্রতি ১শ’ টাকা করে আদায় করে আত্মসাত করা হচ্ছে। মেয়েদের কাছ থেকেও এ টাকা আদায় করা হচ্ছে। ছাত্রদের ইন্টারনেট লাইন হলেও ছাত্রপ্রতি ১শ’ টাকা আদায় করছেন অধ্যক্ষ। অধ্যক্ষ ইমদাদুল হক নামে-বেনামে ৪শ’ বিও হিসাব খুলে শেয়ার ব্যবসা করছেন। প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক হিসাব থাকলেও সেখানে লেনদেন না করে সমুদয় টাকা তিনি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছেন। জনশক্তি ব্যুরোর ৬ মাস মেয়াদী স্বনির্ভর প্রশিক্ষণ কোর্সের ২০ টাকার ফরম ১শ’ টাকা নিচ্ছেন।

এসআইইপি প্রকল্পের বিনামূল্যে ছাত্র ভর্তির সরকারী বিধান থাকলেও তিনি ছাত্র ভর্তি ২শ’ ১০ টাকা নিচ্ছেন। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় এসইআইইপি প্রকল্পের ভর্তি ও কোর্স ফি ফ্রি থাকলেও অধ্যক্ষ ভর্তি ফরম ১শ’, ভর্তি ১শ’ ১০ টাকা করে নিয়ে ৪ ট্রেডে বছরে লাখ টাকা করে আত্মসাত করছেন। পদমর্যাদা অনুযায়ী অধ্যক্ষ এসি ব্যবহার করতে পারেন না। কিন্তু তিনি কনফারেন্স কক্ষের এসি তার বাসায় এবং কম্পিউটার অপারেশন বিভাগের এসি অফিসে ব্যবহার করছেন। তার বাসায় পৃথক মিটার না লাগিয়ে অফিসের মিটার ব্যবহার করে সরকারের প্রায় ৬ লাখ টাকা বাড়তি খরচ করছেন। তিনি বিজ্ঞানাগারের ল্যাব সহকারী আব্দুল রাজ্জাককে মারপিট করাসহ সিনিয়র ইন্সটাক্টরদের ভুয়া বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর আদায় করতে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখান বলেও জানা গেছে। সৌদি, কাতার, হংকংয়ে হাউস কিপিংয়ে রেজিস্ট্রেশনকৃত মহিলা প্রশিক্ষণার্থীদের খাবার বরাদ্দ হচ্ছে জনপ্রতি ১শ’ ৫০ টাকা। তিনি নিজেই বাজার করে প্রশিক্ষণার্থীদের কাছে চাল, ডাল পৌঁছে দেন। কম দামে নিম্নমানের খাবারসামগ্রী সরবরাহ করা হয় বলেও জানা যায়। এসব প্রশিক্ষণার্থীর ভর্তি ফ্রি থাকলেও তাদের কাছ থেকে ফরম ও সার্টিফিকেট বাবদ ২শ’ টাকা করে আদায় করা হয়। অধ্যক্ষ স্টাফদের বেতন-ভাতা উত্তোলনে ১৫ টাকা করে তার কাছ থেকে রেভিনিউ স্ট্যাম্প কিনতে বাধ্য করেন। চলতি মাসে ৬ তারিখে ওয়েল্ডিং এ্যান্ড ফেব্রিকেশন ট্রেড বিভাগে ৬ জন নিরাপত্তাকর্মী থাকা সত্ত্বেও লক্ষাধিক টাকার মালামাল চুরি হয়। তিনি অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও থানায় কোন জিডিও করেননি।

অধ্যক্ষের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ২০১০ সালে একাডেমিক কমিটির সদস্যরা পদত্যাগ করলেও এখন পর্যন্ত কোন কমিটি নেই। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক তদন্তের জন্য উপ-পরিচালক নাজমুল হক ভূঁইয়াকে নির্দেশ দেন। উপ-পরিচালক গত ৯ আগস্ট অভিযোগের তদন্তে এসে সত্যতা পেলেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ইতোপূর্বে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে তদন্ত হলেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানের একটি সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত দল এসে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত না করে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধেই তদন্ত করায় অধ্যক্ষ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।

এছাড়াও তদন্ত দলকে ম্যানেজ করতে প্রতি বিভাগ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে অধ্যক্ষ তাদের নজরানা দিয়েছেন বলেও জানা গেছে। এ ব্যাপারে অধ্যক্ষ প্রকৌশলী এসএম ইমদাদুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে তোলা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।