২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কোন পথে সৌদি আরব

  • আরিফূর সবুজ

মধ্যপ্রাচ্যর সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশটিতে মন্দার ছোঁয়া লেগেছে বেশ ভালভাবেই। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশটি দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে আন্তার্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর এমন আশঙ্কার মধ্যে দিয়েই বোঝা যায় পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। জাঁকজমক আর বিলাসীতায় গা ভাসিয়ে দেয়া এই দেশের আমির-ওমরাদের মুখের হাসি তাই ফুরিয়ে গেছে। সাধারণ মানুষদেরও কপালে ভাঁজপড়া শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের মহাপ্রতাপশালী সৌদি আরবের রফতানি আয় এবং রিজার্ভ কমে যাওয়ার কারণেই জনমনে উঁকি দিচ্ছে শঙ্কা। তবে শঙ্কিত হওয়ার মতো কোন কারণ দেখছে না দেশটির সরকার। এ কারণে সৌদি রাজপরিবারের পেছনে বিশাল অংকের যে অর্থ ব্যয় হয়, তাতে কোন কাটছাঁট করা হবে না, এমন ইঙ্গিতই মিলেছে। তবে প্রকৃত পরিস্থিতি ভিন্ন। এই লক্ষণ জনকল্যাণ খাতে ব্যয় কাটছাঁট, তেল ছাড়া ভিন্ন আয়ের খাতের সন্ধান, ঋণপত্র বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধির মধ্যে দিয়েই বোঝা যায়।

দেশটির রফতানি আয়ের নব্বই শতাংশই আসে তেল খাত থেকে। গত এক বছর ধরে তেলের ধারাবাহিক দরপতনের কারণে দেশটির রিজার্ভ কমছে। যেখানে গত বছর তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ১০৭ ডলার, তা এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৪ ডলার। অর্ধেকেরও বেশি দামের পড়তির কারণে ইতোমধ্যে দেশটি সাত হাজার তিন শ’ কোটি ডলার লোকসান দিয়েছে। যে দেশটি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজের রাজ্যাভিষেক উদ্যাপন করতে গত বছর রাষ্ট্রীয় কোষাগার তিন হাজার দুই শ’ কোটি ডলার ব্যয় করতে পারে, তার জন্য এই লোকসান হয়ত তেমন কিছু না। কিন্তু বর্তমানে যে হারে লোকসান হচ্ছে, তা চিন্তার বিষয়। এ জন্য দায়ী দেশটির একগুঁয়ে নীতি। তেলের দাম ক্রমাগত কমতে থাকলেও দেশটি প্রতিদিন এক কোটিরও বেশি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে। মূলত প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলার জন্যই গত বছর থেকে তেলের উৎপাদন বাড়িয়ে তারল্য ধরে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু আদৌতে তাদের এই নীতি কোন কাজেই আসেনি। বরং বুমেরাং হয়ে দেশটির অর্থনীতিকে নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে এখন যেতে হচ্ছে।

আইএমএফ তাদের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলেছে, সৌদি আরব ২০১৫ সালে সাধারণ সার্বিক আর্থিক ভারসাম্য’ সূচকে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ নেতিবাচক অবস্থানে থাকবে। আর ২০১৬ সালে দেশটির আর্থিক ভারসাম্য ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ নেতিবাচক হতে পারে। দেশটি ২০১৪ সালের চেয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ আর্থিক ভারসাম্য হারাবে এই দুই বছরে। চলতি বছর দেশটি ২০ শতাংশ বাজেট ঘাটতির মুখে পড়বে। অনুমান করা হচ্ছে এ বছরের মধ্যেই সরকারের রাজস্ব কমে আসবে বিরাশি বিলিয়ন ডলারে, যা জিডিপির আট শতাংশের সমান। আর এভাবে চলতে থাকলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই দেশটি দেউলিয়া হয়ে যাবে। আইএমএফের এ পূর্বাভাস মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতাধর এই রাষ্ট্রটির জন্য ভয়ের বার্তাই দিচ্ছে।

তবে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মানামা সংলাপের প্যানেল আলোচনায় সেই শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘সৌদি আরবের জিডিপির অনুপাতে ঋণের হার ১২ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে, যা জি২০ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে এখনও পর্যন্ত সর্বনিম্ন। তাছাড়া সৌদি আরবের রয়েছে চমৎকার সব অবকাঠামো, ব্যাপক পেশাদারি উদ্যোগ, বিদেশী বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় আইন এবং আমরা দেখতে পাচ্ছি কী পরিমাণ বিদেশী বিনিয়াগকারী দেশে আসছে।’

কিন্তু সমস্যা একদিকে নয়, সমস্যা চারদিকে। যুক্তরাষ্ট্রের শেল তেলের উৎপাদন বৃদ্ধি সৌদি আরবের তেলের বাজারের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এতদিন ইরানের ওপর রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা থাকায় সৌদি আরব কাক্সিক্ষত মাত্রায় তেল রফতানি করতে পেরেছিল। কিন্তু এখন পরমাণু চুক্তির ফলে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞাগুলো ওঠে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। ইতোমধ্যে ইরান বাৎসরিক অপরিশোধিত তেল উৎপাদন দ্বিগুণ করার ঘোষণা দিয়েছে। এতে তেলের বাজারে সৌদি আরবের শক্তি প্রতিদ্বন্দ্বীর আবির্ভাব ঘটছে। পরিশোধিত তেলের বাজারেও পতন দেখা দিয়েছে। এশিয়ায় পরিশোধিত তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় পরিশোধক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। ফলে এই অঞ্চলে অপরিশোধিত তেলের আমদানি কমে যেতে শুরু করেছে। পড়ন্ত এই বাজার ধরে রাখতে সৌদি আরব বাধ্য হচ্ছে মধ্যম ও ভারি অপরিশোধিত তেলের দাম কমাতে।

একদিকে তেলের বাজারে ভরাডুবি, অন্যদিকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি দেশটিকে ভাবিয়ে তুলছে। ইরানের ভয়ে দেশটি সামরিক অস্ত্র আমদানিতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে। এ বছর দেশটি প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট ধরেছে আট হাজার আশি কোটি ডলার। ইয়েমেনে হামলা চালানোর পেছনে যে ব্যয় হচ্ছে, তাতে বাজেট অতিক্রম করে যাবে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন। তাছাড়া আইএস মোকাবেলাও প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। দেশটির অভ্যন্তরে বেকার সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এক হিসেবে জানা যায়, দেশটিতে ষোল থেকে উনত্রিশ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৯ শতাংশ। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো এদের বেশিরভাগই শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে অনগ্রসর। ফলে মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যেমে যে সৌদি সরকার বর্তমান সঙ্কট কাটানোর পরিকল্পনা নেবে তা এখনই সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন হবে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।

পিঠ দেয়ালে ঠেকায় এখন দেশটি তেলের দাম বৃদ্ধির চিন্তা করছে। কিন্তু সমস্যা হলো, তেলের দাম বাড়ালে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদন বাড়াবে। দেশটির অপরিশোধিত তেল উৎপাদন আরও উৎসাহিত হবে। কমতে শুরু করবে সৌদি তেলের ক্রেতাও। এতে আদৌতে সৌদি আরবকে আরও বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। পরিস্থিতি এমনটা দাঁড়িয়েছে, যে সৌদি সরকারকে বাজেট সঙ্কোচন করতে হবে। কিন্তু এতে তেল উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ কমে যাবে। তবু অনেকটা নিরুপায় হয়েই দেশটি এখন বাজেট সঙ্কোচন করছে।

অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হিসেবে চিহ্নিত খাতগুলোর ব্যয় কাটছাঁট করে প্রধান প্রধান উন্নয়ন প্রকল্প বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়নের পেছনে অর্থ ব্যয় করছে। তবে দুঃখের বিষয় রাজ পরিবারের বিপুল অপব্যয় থামানোর কোন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।

তেলের বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বীর আবির্ভাব, বাজার হারানো, দাম পতনের কারণে আয় হ্রাস, অন্যান্য আয়ের খাত সৃষ্টিতে অদক্ষ মানবসম্পদের বাধা, প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয় বৃদ্ধি এতসব ঝামেলার মাঝে আবার যুক্ত হয়েছে বাদশাহ সালমানকে হটানোর জন্য প্রাসাদে ছড়িয়ে পড়া বিদ্রোহের বীজ। একের পর এক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক যে সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে দেশটিতে, তাতে মনে হচ্ছে সহসাই কাটছে না মধ্যপ্রাচ্যর এই মহাপ্রতাপশালী দেশটির সঙ্কট।