১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফ্রান্সে মানববোমা যুদ্ধ ॥ সন্ত্রাসীদের নির্দয়ভাবে দমন করা হবে- প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ

ফ্রান্সে মানববোমা যুদ্ধ ॥ সন্ত্রাসীদের নির্দয়ভাবে দমন করা হবে- প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ
  • নিহত ১২৯;###;৬ স্পটে হামলা, হামলাকারী ৭ জন নিজ শরীরের বোমায় নিহত;###;দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এই প্রথম ফ্রান্সে জরুরী অবস্থা জারি;###;গ্রেফতার ৩

নাজিম মাহমুদ ॥ ছয় দফা সন্ত্রাসী হামলায় কাঁপল প্যারিস। শুক্রবার রাতের এই হামলায় ১২৯ জন নিহত এবং ৩৫০ জনের বেশি আহত হয়েছে বলে ফরাসী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। আহতদের মধ্যে ৮০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় ফ্রান্স জুড়ে জরুরী অবস্থা জারি করা হয়েছে। প্যারিসে জারি করা হয়েছে সান্ধ্য আইন। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশটির স্থানীয় কর্তৃপক্ষকেও কার্ফু জারি করার ক্ষমতা দিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম প্যারিসে সান্ধ্য আইন জারি হলো। শুক্রবারের হামলার দায় স্বীকার করেছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেছেন, ফ্রান্সকে নিরাপদ রাখতে সম্ভব সবকিছু করা হবে। ২৮ সদস্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্যারিসে নিহতদের স্মরণে সোমবার গ্রীনিচ মান সময় বেলা ১১টায় ১ মিনিট নীরবতা পালনের আহ্বান জানিয়েছে। প্যারিসে নিহতদের সম্মান জানাতে আইফেল টাওয়ারের সব বাতি নিভিয়ে রাখা হয়। প্যারিসের প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, শনিবার সকালে ফ্রান্সে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে একজনকে ফ্রান্স-বেলজিয়াম সীমান্ত থেকে আটক করা হয়। এছাড়া প্যারিসে হামলায় জড়িত সন্দেহে ব্রাসেলসে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে বেলজিয়ামের বিচারমন্ত্রী জানিয়েছেন। নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম থেকে ফ্রান্সগামী একটি যাত্রীবাহী বিমান আতঙ্কজনক টুইট বার্তা পেয়ে যাত্রা স্থগিত করেছে।

প্যারিসের বাতাক্লাঁ কনসার্টে হামলাকারী ফরাসী নাগরিক পুলিশের পরিচিত ছিল। আর স্তাদে দে ফ্রান্সে হামলাকারীদেও সিরীয় ও মিসরীয় পাসপোর্ট ছিল। হামলাকারীদের তিনটি দল হামলায় সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করে। খবর এএফপি, বিবিসি, আলজাজিরা ও টেলিগ্রাফ অনলাইনের।

তিন দিনের শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ। পাশাপাশি দেশের সব সীমান্ত বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। সন্ত্রাসীদের নির্দয়ভাবে দমন করার ঘোষণা দিয়েছেন। সোমবার দেশজুড়ে এক মিনিট নীরবতা পালনের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল ভালস। তবে নিহত ও আহতদের মধ্যে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোন বাংলাদেশী থাকার খবর পাওয়া যায়নি। হতাহতদের মধ্যে দুজন সুইডিশ ও বেলজিয়ামের নাগরিক রয়েছে। প্যারিসজুড়ে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ব্রিটিশ রানীসহ অন্যান্য বিশ্ব নেতা এই ঘটনায় শোক জানিয়েছেন।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এই হামলার নিন্দা জানিয়ে হোতাদের বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানিয়েছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ফ্রান্সের পাশে থাকার কথা বলেছে ন্যাটো।

ওবামা ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এ অবস্থায় ফ্রান্সের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছেন। এই হামলা ঘটনায় ফ্রান্সের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাঠাগার, পানশালা, বিপণিবিতান, ক্লাব, জাদুঘর ও প্রধান প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। জরুরী ভিত্তিতে চলছে কিছু রেল ও বিমান। এ ছাড়া ফরাসী পুলিশ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্যারিস এলাকায় সব ধরনের জনসমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

একজন আত্মঘাতীর পকেটে সিরীয় পাসপোর্ট পেয়েছে ফরাসী পুলিশ। ওদিকে ফ্রান্সে বিদেশী দূতাবাস ভবনসহ অন্যান্য স্থাপনাকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেয়ার কথা বলেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লঁরা ফেবিয়াস।

কোথায় কোথায় হামলা ॥ শুক্রবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৮টা নাগাদ প্রথম হামলাটি হয় স্ট্যাডে ডি ফ্রান্স স্টেডিয়ামের বাইরে। এ সময় স্টেডিয়ামটিতে তখন ফ্রান্স-জার্মানির মধ্যে প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচ চলছিল। স্টেডিয়ামে হাজির ছিলেন ফরাসী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ। তারপর শহরটির বিভিন্ন জায়গা থেকে একে একে হামলার ঘটনা শুরু হয়।

তবে সবচেয়ে বড় হামলাটি হয়েছে বাতাক্লাঁ কনসার্ট হলে। হলটিতে কনসার্ট দেখতে হাজির হয়েছিল হাজার দুয়েক লোক। ভিড়ে ঠাসা হলটিতে জিহাদী সেøাগান দিয়ে ঢুকে পড়ে আত্মঘাতীর দল। এ সময় সিরিয়ায় ফরাসী বাহিনীর হামলার বিরুদ্ধে সেøাগান দেয় জঙ্গীরা। তারা একে একে ১২০ জনকে হত্যা করে। তারপর সেনারা উপস্থিত হতেই শুরু হয় আত্মঘাতী বিস্ফোরণ।

অপর হামলাগুলো হয়েছে কয়েকটি বার ও রেস্তরাঁয়। এর মধ্যে স্টেডিয়ামের কাছের ঘটনাটি আত্মঘাতী হামলা বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব হামলায় কম্বোডিয়ান একটি হেটেলে ১৪ জন, একটি পানশালার বাইরে ১৯ জন, এক এ্যাভিনিউতে চারজন এবং নগরের বাইরে এক স্থানে চারজন নিহত হয়েছেন।

আমাদেরই জয় হবে - ওলাঁদ ॥ ফরাসী প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ এই ঘটনাকে বর্ণনা করেছেন নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে। মন্ত্রিসভার জরুরী বৈঠক করে তিনি টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে দেশজুড়ে জরুরী অবস্থা জারির ঘোষণা দেন।

টেলিভিশন ভাষণে তিনি বলেন, হামলাকারীদের কাউকে দয়া দেখানো হবে না। ফের আমাদের ওপর ভয়াবহ হামলা হবে। এসব হামলাকারী কোথা থেকে এসেছে তা আমরা জানি। তিনি বলেন সন্ত্রাসীরা আমাদের ভয় দেখাতে চায়। কিন্তু আমরা সেই জাতি, যারা নিজেদের রক্ষা করতে জানে। কীভাবে নিজেদের শক্তি কাজে লাগাতে হয় এটাও আমাদের জানা। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের জয় হবে।

দেশের এই পরিস্থিতিতে জি-টোয়েন্টি সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্কে যাওয়ার পরিকল্পনা বাদ দেন ওলাঁদ। তিনি আরও বলেন, প্যারিসের ওপর সন্ত্রাসী হামলা ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ইসলামিক স্টেটের যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। এই হামলার পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি বাইরে থেকে করা হলেও সন্ত্রাসীরা ফ্রান্সের ভেতর থেকে সহায়তা পেয়েছে বলে জানান তিনি।

ফিলিপিন্স, সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য দেশে নিরাপত্তা জোরদার ॥ ম্যানিলায় আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় অর্থনৈতিক শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দর জন্য নিরাপত্তা জোরদারের অঙ্গীকার করেছে ফিলিপিন্স। শীর্ষ এই সম্মেলনটিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অংশ নেবেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছাড়াও চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও আরও ১৫টি দেশের নেতৃবৃন্দ এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কনফারেন্স সামিটে যোগ দেবেন। ম্যানিলায় ১৮ ও ১৯ নবেম্বর এই সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হবে।

পররাষ্ট্র বিভাগের মুখপাত্র চার্লস জোস বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এই শীর্ষ সম্মেলনটিকে সামনে রেখে প্রায় ২০ হাজার গৃহহীন লোককে ম্যানিলার রাস্তা থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এক হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল করেছে। এ ছাড়াও শীর্ষ সম্মেলনটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৮ হাজার পুলিশ মোতায়েন এবং ম্যানিলায় সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

ফিলিপিন্সে দীর্ঘদিন ধরেই ইসলামী জঙ্গী তৎপরতা চলে আসছে। পাশাপাশি সিঙ্গাপুরে শনিবার নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কে শানমুগাম এক বিবৃতিতে বলেন, এসব হামলার মানে বিশ্বের কোন দেশই আর নিরাপদ নয়। এমনকি নিরাপত্তা ব্যবস্থা যতই জোরদার হোক।

তিনি বলেন, আমরাও আমাদের সতর্কতার স্তর বাড়িয়ে দিয়েছি। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারসহ সীমান্তে তল্লাশি ও প্রহরা জোরদার করেছি।

বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, সিঙ্গাপুরকে নিরাপদ ও নিশ্চিত রাখতে প্রত্যেকেরই ভূমিকা রাখতে হবে। সতর্ক থাকতে এবং সন্দেহজনক যে কোন কর্মকা- সম্পর্কে রিপোর্ট করতে আমরা সকলকে উৎসাহিত করছি।

সকল হামলাকারী নিহত ॥ ফ্রান্সের ছয় স্থানে হামলাকারী সব জঙ্গীই নিহত হয়েছে। ফরাসী নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সকল জঙ্গীকে হত্যা করতে পেরেছে বলে দেশটির প্রেসিডেন্ট এবং পাবলিক প্রসিকিউটর জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ বলেন, গুলি চালানোর পর ওই সন্ত্রাসীরা বেশ কয়েকজনকে জিম্মি করেছিল। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে তারা সবাই নিহত হয়। দেশটির পাবলিক প্রসিকিউটর ফ্রাঙ্কোয়িস মোলিনসের মুখপাত্র জানিয়েছেন, হামলাকারী আটজনই নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে সাতজন বিভিন্ন স্থানে নিজেদের শরীরে বেঁধে রাখা বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের উড়িয়ে দিয়েছেন। আর একজন হামলাকারী পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন।

ফ্রান্সে ফের হামলার হুমকি আইএসের ॥ আইএসের বিরুদ্ধে ফরাসী অভিযান অব্যাহত থাকলে এই দেশটিই তাদের শীর্ষ টার্গেটে থাকবে বলে হুমকি এসেছে। শনিবার এক বিবৃতিতে এই হুমকি দিয়েছে আইএস।

বিবৃতিতে আইএস বলেছে, আমাদের যোদ্ধারা দেহে বোমাধারণ করে ও মেশিনগান হাতে প্যারিসের হৃৎপিণ্ডের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে। যদি ফ্রান্স তার নীতি পরিবর্তন না করে, তাহলে টার্গেটের শীর্ষেই থাকবে তারা।

হামলা পরিকল্পনা ছিল নিখুঁত ॥ সব মিলিয়ে মোট দেড় ঘণ্টা সময়ের মধ্যে শুক্রবার বিশ্বের অন্যতম পরিপাটি শহর ফ্রান্সে শুক্রবার সফল অভিযান চালায় আইএস। হামলার পরিকল্পনা ছিল নিখুঁত। প্রথমে স্টেডিয়াম। তার পরে একে একে পানশালা, রেস্তরাঁ এবং শপিং সেন্টার। এত অল্প সময়ের মধ্যে এই বড় মাপের হামলা সম্পর্কে কিছুই জানত না ফরাসী পুলিশ। হামলার পর ফ্রান্সের পরিস্থিতি এখন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও আর কোন জঙ্গী লুকিয়ে রয়েছে কি না তার খোঁজে চলছে চিরুনি তল্লাশি।

(আরও খবর ৫-এর পাতায়)