১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নবজাগরণের প্রত্যাশায় শেষ হলো লোকসঙ্গীত উৎসব

 নবজাগরণের প্রত্যাশায় শেষ হলো লোকসঙ্গীত উৎসব
  • সংস্কৃতি সংবাদ

মনোয়ার হোসেন ॥ হেমন্তের সন্ধ্যা নামতেই বাঁশিসহ বিচিত্র বাদ্যযন্ত্রের সহযোগে আর্মি স্টেডিয়ামে ঝড়ে পড়ল সুরের ধারা। জলের গানের শিল্পীরা গেয়ে উঠলেন ঝরা পাতার গান- ও ঝরা পাতা ও ঝরা পাতা গো/তোমার সাথে আমার রাত পোহানো কথা/তোমার সাথে আমার দিন কাটানো কথা...। এভাবেই গানে গানে কেটে গেল তিনটি রাত। সুরে সুরে বলা হলো শেকড়ের কথা। লোকগানের বাণীর মাঝে আবাহন করা হলো আপন সংস্কৃতি ও দর্শনকে। সেই সঙ্গে জানা হলো ভিন দেশের লোকগীতির ধারাকে। সময়ের হিসেবে প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে মোট ২৪ ঘণ্টার সঙ্গীতাসরটি এক আঙিনায় জড়ো করেছে ঢাকার নানা প্রান্তের মানুষকে। আট প্রহরের এই সঙ্গীতযজ্ঞ শুরু হয়েছিল বৃহস্পতিবার। রাজধানীর লক্ষাধিক সঙ্গীতানুরাগীর মন মজানো উৎসবটি শেষ হলো শনিবার। প্রাপ্তির বিবেচনায় দেশ-বিদেশের লোকজ সুরসুধার মাঝে উচ্চারিত হলো বাংলার লোকসঙ্গীতের নবজাগরণের প্রত্যাশা। চলমান অস্থির সময়ে অশুরের বিরুদ্ধে সুরের প্রতিবাদে স্বস্তির সুবাতাস ছড়িয়ে বিদায় নিল ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট।

মেরিল নিবেদিত মাছরাঙা টেলিভিশন ও সান ইভেন্টস আয়োজিত এ আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসবের সমাপনী রাত ছিল শনিবার। পাঁচ রাষ্ট্রের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত উৎসবে এ দিনের পরিবেশায় অংশ নেন বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও আয়ারল্যান্ডের শিল্পীরা।

ইতি টানা উৎসবের শুরুতেই শ্রোতাদের মন ভরিয়ে দেয় জলের গান। শেকড়সন্ধানী ও নিরীক্ষাধর্মী লোকগানের চর্চায় নিবেদিত সঙ্গীতদলটি মঞ্চে আসে সন্ধ্যা ছয়টায়। দলপ্রধান রাহুল আনন্দ মঞ্চে আসতেই ও গানপ্রেমীদের মধ্যে বয়ে যায় উচ্ছ্বাস। সেই উচ্ছ্বাসের প্রতিদান দিয়ে সবাইকে আনন্দে ভাসিয়ে তারা প্রথমে পরিবেশন করে ‘শুঁয়া যাও যাও রে তেপান্তর’ গানটি। উন্মুক্ত মাঠে যেন জলের মতো ঘুরেফিরে বেড়ায় লোকজ সুরের অনুরণন। দ্বিতীয় গানে উঠে আসে ফুলের কথা। গীত হয় দলটির জনপ্রিয় গান ‘বকুল ফুল বকুল ফুল সোনা দিয়া হাত কেনো বান্ধাইলি’। একই রকম আবেশ ছড়িয়ে পরিবেশিত হয় ‘ও ঝরা পাতা’ ‘এই পাগলের ভালবাসাটুকু নিয়ো’ ও ‘ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’। রাহুল ছাড়া এ দলের অন্যান্য সদস্যারা হলেন কনক আদিত্য, সাইফুল জার্নাল, শিউলি ভট্টাচার্য, রানা সারোয়ার, এবিএস জেম, শ্যামল কর্মকার ও অসির আরমান।

জলের গানের পরই মঞ্চে আসেন আইরিশ শিল্পী নিয়াভ নি কারা ও তার দল। এ দলের বেহালার বাদন ইউরোপে দারুণ সমাদৃত। সেই সূত্রে এদেশের শ্রোতারা শুনতে পেল বিরহ ও মায়ার বাঁধনে গাথা অনবদ্য বেহালার সুর । পাশাপাশি দলের মূল শিল্পী গেয়ে শোনান আয়ারল্যান্ডের লোকগান। নিয়াভ শুরুতেই কথা দিয়ে শ্রোতাদের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে নেন। দর্শকদের প্রতি ভালবাসা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সাত হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে আমরা এসেছি তোমাদের দেশে। আমাদের দেশে দুটি ভাষাÑএকটি ইংরেজী, অন্যটি আইরিশ। আমরা গান শোনাব আইরিশ ভাষায়।’ কথা শেষেই বেজে ওঠে দলটির বেহালার সমুধুর সুর। এরপর আইরিশ ভাষায় তারা গেয়ে শোনান এমন এক প্রেমিকের কথা, যাকে ছেড়ে গেছে তার প্রেমিকা। ভাষা বোঝা না গেলেও সুরের সম্মোহনে, বেহালার মায়াবী আবেদনে শ্রোতাদের মানসপটে ভেসে ওঠে বিষাদের ছায়া। গানের সঙ্গে দলের এক সদস্যের নাচটিও উপভোগ করে দর্শক-শ্রোতা ।

এরপর ছিল সমাপনী দিনের আনুষ্ঠানিকতা। তাতে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বিশেষ অতিথি ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের। স্বাগত বক্তব্য রাখেন আয়োজক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার অঞ্জন চৌধুরী। এদিনের অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী অদিতি মহসিন।

আসাদুজ্জামান নূর বলেন, শুক্রবার ফ্রান্সে একটি কনসার্টে হামলায় প্রায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে, আমি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। যে গান পছন্দ করে না, সে মানুষ খুন করতে পারে, এ কথাটি আজ সত্য প্রমাণিত হয়েছে। বিশে^র অনেক দেশই বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, এই ফোক উৎসবই প্রমাণ করে, আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভাল। আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যের অংশ হচ্ছে লোকগান। তবে বর্তমানে লোকগানের ফিউশন হচ্ছে, আমি ফিউশনবিরোধী নই, লোকগানের আদি ধারাকে রক্ষা করতে হবে। লোকসঙ্গীতের আত্মাকে রক্ষা করতে হবে।

সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষে মঞ্চে আসেন দক্ষিণ ভারতের লোকগানের দল ইন্ডিয়ান ওশেন। দলটির পরিবেশনায় অভিভূত হয় দর্শক-শ্রোতা। ‘আরে রুখ জানে বন্দে’ গান দিয়ে শুরু হয় তাদের পরিবেশনা। এরপর একে একে ভারতের নানা ঘরানার লোকগান গেয়ে মুগ্ধতার বীজ বুনে দেন উন্মুক্ত মাঠের জমিনে। কণ্ঠসঙ্গীতের সঙ্গে দলটির গিটার, খমক ও তবলার সমন্বিত যন্ত্রসঙ্গীতের পরিবেশনাটি দারুণ উপভোগ্য হয়ে ওঠে শ্রোতাদের কাছে।

তারপর মঞ্চে আসেন ভারতের জনপ্রিয় লোকসঙ্গীতশিল্পী পার্বতী বাউল। কীর্তন আঙ্গিকের গানে উপস্থাপন করেন রাধা-কৃষ্ণের প্রেম উপাখ্যান। তার কয়েকটি পরিবেশনার শিরোনাম ছিল ‘পূজিতে শ্যাম নটরাজে’, ‘চোখ গেল চোখ গেল পাখি’ ও ‘আমি কালো রূপ আর হেরবো না’।

রাত ১০টায় মঞ্চে আসেন এ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ উপমহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পী আবিদা পারভীন। সুফি ও গজল ঘরানার গান গেয়ে মুগ্ধ করেন পাকিস্তানী কুইনখ্যাত এই বিশ^ সমাদৃত গায়িকা। তাল ও লয়েরসহযোগে অনবদ্য কণ্ঠের খেলায় তন্ময় করে রাখেন সুর রসিকদের। সিতার-ই-ইমতিয়াজ পুরস্কারজয়ী সিন্ধি প্রদেশের এই শিল্পীর প্রথম পরিবেশনার শিরোনাম ছিল ‘আলী মওলা মওলা’। শ্রোতাদের সুুরের বিভোরতায় নিমজ্জিত করা তার পরিবেশনার শিরোনাম ছিল ‘ইয়ার তো হামনে যাব যা দেখা’। তৃতীয় গানের শিরোনাম ছিল ‘তেরে ইশক না চায়া’। এরপর দমের তরীতে ভেসে একসময় মাজার ও দরগায় গান গাওয়া এই শিল্পী গাইলেন ‘আলী আলী দম আলী আলী’। আর শেষ পরিবেশনায় সঙ্গীতানুরাগীদের মাঝে শিহরণ জাগিয়ে গাইলেন বিখ্যাত পাঞ্জাবী লোকগান ‘দামাদাম মাস্ত ক্যালেন্ডার। পরিবেশনা শেষে আবিদা পারভীনের হাতে উৎসব স্মারক তুলে দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

সব শেষে ছিল ভারতের রাজস্থানের হামিরা ফ্রম মাঙ্গানিয়ারস শীর্ষক গানের দলের পরিবেশনা। শেষ হয় রাজধানীর গানপ্রেমীদের সুরের মায়ায় ভাসিয়ে দেয়া আন্তর্জাতিক এই লোকসঙ্গীতের আসর।

বছরব্যাপী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কর্মশালা শুরু আজ ॥ ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে শিল্প-সংস্কৃতির আলো ছড়িয়ে দিতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। শিল্পের সকল শাখার ঐতিহ্য সংরক্ষণ, বিকাশ ও প্রসার শিল্পকলার অন্যতম লক্ষ্য। এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় মানব মনন বিকাশে সঙ্গীত-ঐতিহ্যের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা নিরীক্ষার উদ্দেশে একাডেমির আয়োজনে আজ রবিবার থেকে শুরু হচ্ছে বছরব্যাপী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, শাস্ত্রীয় নৃত্য, সেতার ও সরোদ বাদন প্রশিক্ষণ কর্মশালা।

আজ বিকেল ৫টায় একাডেমির জাতীয় সঙ্গীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে কর্মশালার উদ্বোধন করবেন ওস্তাদ মোঃ ইয়াছিন খান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক সচিব বেগম আক্তারী মমতাজ। স্বাগত বক্তব্য দেবেন প্রশিক্ষণ বিভাগের পরিচালক জনাব শাওকাত ফারুক এবং শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখবেন সঙ্গীত, নৃত্য ও আবৃত্তি বিভাগের পরিচালক জনাব সোহরাব উদ্দীন।

বছরব্যাপী কর্মশালায় প্রশিক্ষণ দেবেন উচ্চাঙ্গ নৃত্যে শিল্পী শর্মিলা বন্দোপাধ্যায় (মোহিনী আট্টম), মুনমুন আহমেদ (কত্থক), লুবনা চৌধুরী (কথাকলি), বেনজীর সালাম (ওডিসি), র‌্যাসেল এগনেস প্যারিস (গৌড়ীয়), শুক্লা সরকার (ভরত নাট্টম) ও তামান্না রহমান (মণিপুরী), উচ্চাঙ্গ কন্ঠে শিল্পী অসীত দে ও প্রিয়াংকা গোপ, সেতারে শিল্পী ফিরোজ খান ও রিনাত ফৌজিয়া এবং সরোদে শিল্পী শাহাদাৎ হোসেন খান ও ইউসুফ খান।

উদ্বোধনী ও আলোচনা শেষে বছরব্যাপী কর্মশালার প্রশিক্ষকদের অংশগ্রহণে পরিবেশিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।