২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রক্তে ভেজা প্যারিসের প্রতি বিশ্ববাসীর সংহতি প্রকাশ

  • তুরস্কে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে সন্ত্রাস রুখতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অঙ্গীকার

জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ সন্ত্রাসী হামলায় রক্তে ভেজা প্যারিসের প্রতি সংহতি জানিয়েছে বিশ্ববাসী। এর অংশ হিসেবে শনিবার বিশ্বের বিভিন্ন শহরের প্রধান স্থাপনাসমূহের গায়ে ফরাসী পতাকা জড়িয়ে সন্ত্রাসের প্রতি তীব্র ঘৃণা দেখায় সকলে। সিডনি, সাংহাই বার্লিন, টরন্টো, প্রাগ, নিউইয়র্ক, লন্ডন, সাংহাই, ইস্তাম্বুল সর্বত্রই একই চিত্র দেখা গেছে। অনেকে ফরাসীদের প্রতি সহানুভূতি জানাতে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলের ছবি ফ্রান্সের পতাকার রঙে রাঙিয়েছে। আজ সোমবার ইউরোপজুড়ে শোক দিবস পালনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। প্যারিসের হামলাস্থলগুলোতে মোমবাতি জ্বালিয়ে নিহতদের স্মরণ করা হয়েছে। প্যারিসের প্রধান পর্যটন স্পট আইফেল টাওয়ার ছিল আলোহীন। খবর বিবিসি, এএফপি, আলজাজিরা ও ওয়াশিংটন পোস্ট অনলাইনের। সন্ত্রাসী হামলার ৪৮ ঘণ্টা পার হতে চলেছে, তবে প্যারিসে এখনও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা জারি রয়েছে। প্যারিসের যাদুঘর, আর্ট গ্যালারি, পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থানগুলো এখনও বন্ধ রয়েছে। শহরে তিন হাজার সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যেই শুক্রবারের আক্রমণকারীদের পরিচয় বের করার জন্য ব্যাপক অনুসন্ধান চলছে। ওই আক্রমণে ব্যবহৃত দুটি গাড়ি পেয়েছে পুলিশ।

শুক্রবার বিশ্বের শিল্প-সাহিত্যের শহর বলে খ্যাত প্যারিসের ছয় স্থানে নারকীয় সন্ত্রাসী হামলায় ১২৯ জন নিহত হয়। এ ঘটনায় আহত হয় সাড়ে তিনশ’ সাধারণ মানুষ। শুক্রবারের ওই হামলায় জড়িতদের মধ্যে একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তার নাম ওমর ইসমাইল মোস্তফাই। আনুমানিক ২৯ বছর বয়সী মোস্তফাই নিজেও ফরাসী নাগরিক। তার বাবা ও ভাইসহ মোট ৬ আত্মীয়কে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। মোস্তফাই বিষয়ে বলা হয়েছে, বাতাক্লাঁ কনসার্ট হলে হামলার পর যে তিন হামলাকারী বোমা ফাটিয়ে নিজেদের উড়িয়ে দিয়েছিল, মোস্তফাই তাদেরই একজন। ঘটনাস্থলে পাওয়া আঙুলের ছাঁপ মিলিয়ে তার পরিচয় জানতে জানা গেছে। প্যারিসের দক্ষিণে ওবা ও ইসন্নো এলাকায় মোস্তফাইয়ের আত্মীয়স্বজনের বাসায়ও তল্লাশি চালানো হয়েছে।

তুরস্কে অনুষ্ঠিত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্বনেতারা এই ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম রুখতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। রবিবার থেকে তুরস্কের আনতালিয়া শহরে শুরু হওয়া দুই দিনের এই সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ছাড়াও অন্যান্য বিশ্ব নেতারা অংশ নেন। ওবামা বলেছেন, যে কোন সন্ত্রাসী কার্যক্রম রুখতে যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্সের পাশে রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা ও চীনা প্রেসিডেন্ট জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান বলেন, যে কোন ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম মোকাবেলায় যৌথ ও সমন্বিত আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা দরকার। চীনা প্রেসিডেন্ট সন্ত্রাসবাদকে মানবতার প্রধান শত্রু বলে আখ্যা দেন। এই সম্মেলনে ফরাসী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদের অংশ নেয়ার কথা থাকলেও প্যারিসে হামলার কারণে অংশ নেননি।

পাশাপাশি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যৌথ পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে মুসলিম বিশ্বের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ফোরাম ওআইসি। ওআইসি মহাসচিব আইয়াদ মাদানি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত সন্ত্রাসের মূলোৎপাটনে এক হওয়া। এ সময় শুক্রবারের ওই সন্ত্রাসী হামলার কড়া নিন্দা জানায় ওআইসি।

শুক্রবারের ওই হামলার ছক বেলজিয়ামে বসে কষা হয়েছিল বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। আর গত জানুয়ারিতে প্যারিসে নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলায় ১৭ জন নিহত হওয়ার পর থেকেই সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় শহরটিতে উচ্চ সতর্কাবস্থা জারি ছিল। তারপরও কীভাবে এ ধরনের একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ফ্রান্সের সঙ্গে এক যোগে এই হামলার তদন্ত চালাচ্ছে বেলজিয়াম, গ্রিস এবং জার্মানি। হামলার পর বাতাক্লাঁ থিয়েটারের সামনে পাওয়া যায় একটি ধূসর রঙের পোলো গাড়ি। এই গাড়ির ভিতর পাওয়া পার্কিং টিকিট দেখেই তদন্তকারীরা জানতে পারেন, গাড়িটি ভাড়া নেয়া হয়েছিল বেলজিয়ামে।

বরিবার ফরাসী বিচারবিভাগ সূত্র জানিয়েছে যে তারা প্যারিসের পূর্বদিকে আরও একটি কালো সিটের গাড়ি পেয়েছে। এতে অনেকগুলো কালাসনিকভ রাইফেল পেয়েছে তারা। মনে করা হচ্ছে বেশিরভাগ হামলাকারী এই রাইফেলগুলো গাড়ির মধ্যে রেখে পালিয়ে গেছে। পুলিশ বলছে, খুঁজে পাওয়া এ গাড়িটি খুব সম্ভবত শুক্রবার রাতে প্যারিসের রেস্তেরাঁয় সরাসরি গুলি চালানো হামলাকারীরাই ব্যবহার করেছিল। এটি কয়েকজন হামলাকারীর পালিয়ে যেতে সক্ষম হওয়ারই ইঙ্গিত। সম্ভবত তারা অন্য একটি গাড়ি নিয়ে উত্তরে বেলজিয়ামের দিকে চলে যায়। হামলার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে শনিবার ব্রাসেলসের কাছে একটি শহরে ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে অন্তত একজন শুক্রবার রাত প্যারিসে কাটিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফরাসী প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল ভালস জানিয়েছেন, শুক্রবারের সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ১০৩ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। আর বাকিদের পরিচয়ও শীঘ্রই জানা যাবে। এ ঘটনায় দেশটিতে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক চলছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে এক বছর ধরে নিষ্ফল যুদ্ধের পর প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় এই জঙ্গী সংগঠনকে নির্মূলে আরও সমন্বিত সামরিক উদ্যোগ নেয়ার চাপ বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ধারণা করা হচ্ছে, বিমান হামলা বৃদ্ধিসহ অভিযান জোরদার করতে বিভিন্ন পন্থা পর্যালোচনা করবে ওয়াশিংটন। আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নেতৃত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্র্র ‘যথেষ্ট চেষ্টা করছে না’ বলে ঘরে-বাইরে অভিযোগ উঠেছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। প্যারিসের হামলার পর ওয়াশিংটন এখন তাদের ইউরোপীয় ও আরব মিত্রদের নিয়ে ইরাক ও সিরিয়ায় সামরিক শক্তি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে বাধ্য হবে।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ইরাক ও সিরিয়ায় এ যুদ্ধে তাদের সামরিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির জন্য বিশেষ করে ইউরোপীয় ও আরব সহযোগীদের স্বার্থ দেখবে। প্যারিস ও ওয়াশিংটন তাদের বর্তমান সামরিক উদ্যোগের ব্যাপ্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করতে সম্মত হবে কিনা, তা মোটেই স্পষ্ট নয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লড়াই করার জন্য আরও প্রতিশ্রুতিশীল হতে দেখা গেছে এবং পার্লামেন্ট সদস্য ও সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষজ্ঞরা প্যারিস হামলার কারণে আইএসের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সামরিক শক্তি ব্যবহারের যুক্তি জোরদার হচ্ছে বলে মনে করেন।