১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এসডিজিতেও আমরা এমডিজির মতো সফল হব

  • বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের বৈঠক উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) মতো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে আমরা একই ভাবে সফল হব। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ওপর যথাযথ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে উন্নত দেশসমূহকে আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় প্রথাগত আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা যাতে দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ বৈশ্বিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে সে বিষয়ে আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়কে আরও মনোযোগী হতে হবে। রবিবার দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের (বিডিএফ) বৈঠকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।

ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অতিথি ছিলেনÑ এশিয়ান ইনফ্রাসটাকচার ব্যাংকের (এআইআইবি) প্রেসিডেন্ট জিন লিকুন, ইউএসএআইডির কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ ও লোকাল কন্সালটেটিভ গ্রুপের কো-চেয়ার ইয়ানিনা জেরুজালেস্কি, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়েনচাই ঝাং, জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল কিনগো তৈয়দা এবং বক্তব্য রাখেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন। উদ্বোধন ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী ডেভেলপমেন্ট ফেয়ার ঘুরে দেখেন।

প্রধান মন্ত্রী বলেন, আমরা আমাদের সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে এ দেশের মানুষের সার্বিক উন্নয়নে বদ্ধপরিকর। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আমাদের সরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কর্মসূচী নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়ন ধারা এগিয়ে নিতে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান অব্যাহত রাখবে। বাংলাদেশকে অমিত সম্ভাবনার দেশ অভিহিত করে তিনি বলেন, বিশ্বের বুকে একটি গতিশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার মতো সব উপায় ও উপকরণ আমাদের রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালে উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা। উন্নয়নের এ অগ্রযাত্রায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের পেলে আমরা আনন্দিত হব।

এসডিজি অর্জনে উন্নত দেশগুলোকে আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে ব্যাপক বিনিয়োগের প্রয়োজন। এ উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় আমরা আন্তর্জাতিক সহযোগী দেশ ও সংস্থাসমূহসহ ব্যক্তি খাতের অংশীদারিত্বকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। এ প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকার প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ করছে এবং অধিকতর বৈদেশিক বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি আমরা প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ বৃদ্ধির সুবিধার্থে এ অঞ্চলের মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজে হাত দিয়েছি। চারটি দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন শুরু হয়েছে। এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি, বিদ্যুত, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবেশ ও কারিগরি খাতে পারস্পরিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯১ সালে আমাদের দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ। আমরা সেই দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। অতিদারিদ্র্যের হার ৭ দশমিক ৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এখন আমাদের লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এ সময়ে দারিদ্র্যের হার ১৪ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ছয় বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর (এডিপি) আকার তিনগুণ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর অর্থায়নে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতার প্রবণতা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। আমরা আত্মমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছি।

অভিবাসীদের কল্যাণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্যোগের আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বব্যাপী অভিবাসী শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা ও তাদের কল্যাণে উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশসমূহকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। অভিবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে বৈশ্বিক পর্যায়ে যৌথ প্রচেষ্টা চালানো উচিত। এ সময় তিনি জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক তহবিলের অর্থ ছাড়ের ধীরগতির অবসান ঘটানো এবং এ তহবিলের অর্থ পেতে জটিল শর্তের বিষয়টিও তুলে ধরেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, বৈশ্বিক পর্যায়ে কিছু অগ্রগতির পরও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক তহবিলগুলোর বিপুল পরিমাণ সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান শর্তসমূহ কঠিন ও জটিল। এ বিষয়ক তহবিলগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশসমূহের চাহিদা ও অগ্রাধিকার অনুযায়ী কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধা ও অর্থ ছাড়ের ধীরগতি অপসারণ করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা শুধু সাহায্যের জন্য বসে নেই। নিজস্ব অর্থায়নে বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করে মানুষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার উদ্যোগ নিয়েছি।

অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, দারিদ্র্য নিরসন ও বৈষম্য হ্রাসে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তারপরও বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। আমরা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে রাইট টু ইনফর্মেশন এ্যাক্ট করেছি। উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে শক্তিশালী পার্টনারশিপ গড়ে তুলতে আমরা ইতোমধ্যেই ইআরডিতে নতুন উইং খুলেছি। আশা করছি পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বাড়বে। ১৬ কোটি মানুষের দেশে গত কয়েক বছর আমরা ৬ শতাংশের উপরে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিটেন্স, বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাল অবস্থানে রয়েছি। আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছি। এসব অগ্রগতি ধরে রাখতে উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন।

এআইআইবির প্রেসিডেন্ট বলেন, বাংলাদেশ শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে এগিয়ে যাচ্ছে। এশিয়ার আর্থসামাজিক উন্নয়নে বৃহত্তর পরিসরে কাজ শুরু করছে এআইআইবি। এআইআইবি দুর্নীতিকে জিরো টলারেন্স দেখতে চায়। গ্যানি ফাইন্যান্সিং এবং বিনিয়োগের গুরুত্ব দিচ্ছে এক বছর আগে যাত্রা শুরু করা এই নতুন ব্যাংকটি। আগামীতে বাংলাদেশের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখবে এই ব্যাংক। ইয়ানিয়া জেরুজালেস্কি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন অর্জনের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

প্রথম দিনই তিনটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমটিতেই উপস্থাপন করা হয় সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। এতে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম। পরে আরও দুটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়।