১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নিষেধাজ্ঞা শুধু কাগজে ফের মহাসড়কে থ্রি হুইলার ॥ হাইওয়ে পুলিশ নীরব

  • মন্ত্রণালয়ের দাবি ৯০ ভাগ সিদ্ধান্ত কার্যকর

রাজন ভট্টাচার্য ॥ অনেকটাই ঢাক-ঢোল পিটিয়ে মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন বা থ্রি-হুইলার বন্ধ ঘোষণা করেছিল সরকার। এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানও ছিল অন্তত এক সপ্তাহ। দেশব্যাপী আন্দোলন ও রাজনৈতিক ইস্যুতে একপর্যায়ে পিছু হটে সরকার। এখন আপোস আপোস খেলায় ফের মহাসড়কে ওঠেছে নিষিদ্ধঘোষিত সব রকমের পরিবহন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোতেই অটোরিক্সা, নসিমন, করিমন ভটভটি দিব্যি চলছে। একপর্যায়ে সরকার ২২টি মহাসড়কে এসব পরিবহন চলাচল নিষিদ্ধ করে। সে নির্দেশনাও টিকেনি। এখন শুধু কাগজপত্রে গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই। যদিও মন্ত্রণালয়ের দাবি সিদ্ধান্তের ৯০ ভাগ কার্যকর করা হয়েছে।

সরবে বন্ধ হয়ে নীরবে আবার নিষিদ্ধ পরিবহন চালু হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা। স্বল্পগতির এসব পরিবহনের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা আরও বাড়বেÑ এমন আশঙ্কা তাদের। ব্যাপক প্রচার চালিয়ে গত ১ আগস্ট ২২টি জাতীয় মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল নিষিদ্ধ করে সরকার। এসব যানের মালিক-শ্রমিকদের প্রতিবাদে মহাসড়কে নৈরাজ্যকর অবস্থা সৃষ্টি হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভসহ পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। জনভোগান্তি হলেও শুরুর দিকে সরকার চাপের কাছে নতিস্বীকার করেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় নিষিদ্ধ এসব যান চলাচল বন্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা মহাসড়কের পাশে পৃথক লেন করে এসব পরিবহন বন্ধের জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। এদিকে হাইওয়ে ও জেলা পুলিশও এসব পরিবহন নিয়ন্ত্রণে এখন আর খুব একটা কঠোর অবস্থানে নেই।

এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করার পর পরই সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ২২টি মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, অটো টেম্পো এবং অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে এবং মহাসড়কে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা বিধানে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এসব জাতীয় মহাসড়ক ছাড়া অন্য আঞ্চলিক সড়ক বা জেলা সড়কে অটোরিক্সা চলাচলে বাধা নেই বলে জানান তিনি।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ দেশের প্রধান মহাসড়কগুলোতে ধীরগতির গাড়ি চলাচলের জন্য আগামী বছর থেকে বাইলেন নির্মাণের কাজ শুরুর কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, অটোরিক্সা, টেম্পোসহ কমগতির তিন চাকার যানবাহনকে মহাসড়কে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করে গত ১ আগস্ট থেকে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। এতে গত কয়েক দিনে মহাসড়কে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমেছে বলেও দাবি করেন মন্ত্রী। দেশের আড়াই লাখ কিলোমিটার জাতীয়, আঞ্চলিক, জেলা ও গ্রামীণ সড়ক রয়েছে জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, এর মধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সড়ক-মহাসড়কের পরিমাণ ২১ হাজার কিলোমিটার। আর জাতীয় মহাসড়ক রয়েছে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার।

সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের আড়াই লাখ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ২১ হাজার ৩০২ কিলোমিটার সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরের অধীন। এর মধ্যে তিন হাজার ৮১২ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কে তিন চাকা নিষিদ্ধ। অন্যত্র চলতে বাধা নেই। ভবিষ্যতে মহাসড়কে ধীরগতির গাড়ির জন্য পৃথক লেন হবে। কিন্তু মহাসড়কে আর তিন চাকা ফিরবে না। ওবায়দুল কাদের বলেন, বিগত পাঁচ বছরে বন্ধ করা যায়নি। আমি দুই মাসে ৯০ ভাগ বন্ধ করে দেখিয়েছি। সময় দিন, বাকিটাও করব।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের অন্তত ২০টি পয়েন্টে এসব পরিবহন চলতে দেখা গেছে। আছে প্রায় শতাধিক টার্মিনাল। খোদ জয়দেবপুর চৌরাস্তায় এসব পরিবহনের দেখা মিলবে শত-ছাড়িয়ে হাজারে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ জনকণ্ঠকে বলেন, নিষিদ্ধ হলেও দেশের বিভিন্ন হাইওয়েতে সিএনজিচালিত অটোরিক্সা চলছে অথচ সরকার বলছে, এসব পরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি সিলেটে গিয়ে এ দৃশ্য দেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। সড়ক বিভাগ এ ব্যাপারে কিছু বলছে না। সবাই দেখেও না দেখার ভান করলে যাত্রীসহ পরিবহন মালিক শ্রমিকদের দুর্ভোগ কোনদিনই লাঘব হবে না। তিনি জানান, গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব মহাসড়কে অটোরিক্সাসহ অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করছে।

বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি রুস্তম আলী জনকণ্ঠকে বলেন, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বগুড়াসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুট ও চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিষিদ্ধ পরিবহন নিয়মিত চলাচল করছে। এছাড়া এসব মহাসড়কে একটু পর পর বাজারসহ স’ মিলের শেষ নেই। রাস্তার ওপর রাখা হচ্ছে কাঠ। অবৈধ টার্মিনাল তো আছেই। এসব সমস্যা দূর করতে দ্রুত সরকারের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান তিনি।

২২ মহাসড়কেই চলছে নিষিদ্ধ পরিবহন ॥ দেশের প্রধান ২২টি জাতীয় মহাসড়কে সিএনজিচালিত তিন চাকার যানবাহন, অটোরিক্সা, অটোটেম্পো ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করেছে সরকার। ৭ আগস্ট সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব মহাসড়কের নাম উল্লেখ করা হয়। এ ২২টি প্রধান মহাসড়ক ছাড়া অন্যান্য আঞ্চলিক ও জেলা সড়কে অটোরিক্সা চলাচলে কোন বাধা নেই।

মহাসড়কে চলছে ১৮ লাখ অনুমোদনহীন পরিবহন ॥ বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৮ লাখ নসিমন, করিমন, ভটভটি বিভিন্ন সড়কে চলাচল করছে। যার একটিও সরকারীভাবে অনুমোদিত নয়। তিন লক্ষাধিক ব্যাটারিচালিত রিক্সা ও ইজিবাইক মহাসড়কে চলতে দিয়ে কোন অবস্থাতেই নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমাদের দেশে প্রতি ১০ হাজার যানবাহনের মধ্যে ৮৬ দশমিক ৬টি যানবাহন প্রতিবছর মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়ছে। এই পরিসংখ্যানে নিহতের সংখ্যা এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১৬৯ জন। দুর্ঘটনার কারণে দেশের ২ শতাংশ জিডিপি ক্ষতি হচ্ছে।