২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আহারে খুশী খুশী মন নবান্নতে রইল বন্ধু তোমার নিমন্ত্রণ...

আহারে খুশী খুশী মন নবান্নতে রইল বন্ধু তোমার নিমন্ত্রণ...
  • নবান্ন উৎসবে মুখর চারুকলা

মোরসালিন মিজান

বেদনারই বলতে হবে, এখন গ্রামীণ জনপদেও আগের সেই নবান্ন উৎসব হয় না। হয় না মানে, কমে গেছে। অন্যের আচারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে শহুরে প্রজন্ম। এই যখন অবস্থা, তখন বছর ঘুরে আবারও এসেছে অগ্রহায়ণ। রবিবার ছিল মাসের প্রথম দিন। আর অগ্রহায়ণের প্রথম দিন মানেই নবান্ন উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। এক সময় গ্রামের ঘরে ঘরে নতুন ধান থেকে চাল, চাল থেকে পিঠে-পুলির আয়োজন করা হতো। এখন সেসব আনুষ্ঠানিকতায় ভাটা পড়েছে; তবে হারিয়ে যায়নি। বাঙালীর নিজস্ব সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে আছে নবান্ন উৎসব। লোকজ ঐতিহ্যের উৎসবটি গ্রামে নানা সংযোজন-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হয়। বাদ যায় না শহরও। এমনকি রাজধানী ঢাকায় আয়োজন করা হয় বর্ণাঢ্য নবান্ন উৎসবের। বিগত দিনের ধারাবাহিকতায় রবিবার শেকড় সন্ধানী মানুষ সমবেত হয়েছিলেন চারুকলার বকুলতলায়। এখানে দিনব্যাপী নবান্ন উৎসবের আয়োজন করে জাতীয় নবান্ন উৎসব উদ্যাপন পর্ষদ।

এদিন খুব সকাল বেলায় সরব হয়ে ওঠে চারুকলা অনুষদের সবুজ আঙিনা। উৎসবস্থলে আসতে শুরু করেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। সকলেরই পোশাকে বাঙালীয়ানা। সাজগুজেও তা-ই। কিশোরী-তরুণীরা বড়দের সহযোগিতায়, কী সুন্দর, শাড়ি পরে এসেছিল! তরুণরা গায়ে চাপিয়েছিল পাঞ্জাবি। বেশ দেখতে লেগেছে। গানে কথায়ও বাঙালীর নিজস্ব সংস্কৃতির গৌরবময় প্রকাশ। সব মিলিয়ে যেন ছোট সোনার গাঁ।

উৎসবের শুরু হয় সকাল ৭টা ১ মিনিটে। রাগসঙ্গীতে শুরু করেন প্রিয়াঙ্কা গোপ। কণ্ঠসঙ্গীতের সঙ্গে ছিল ইফতেখার আলমের তবলা। ভোর বেলাটিকে রাঙিয়ে দিয়ে যান শিল্পীরা। বিখ্যাত শিল্পী ফরিদা পারভীনের কণ্ঠটিও নবান্ন উৎসবের বিশেষ সংযোজন। প্রিয় গানে স্বদেশ ভূমির বন্দনা করেন গায়িকা। একইরকম পরিবেশনা ছিল মহাদেব ঘোষের। তার কণ্ঠে ছিল ফসল কাটার বর্ণনা। সুরে সুরে শিল্পী গেয়ে যানÑ আয়রে মোরা ফসল কাটি ফসল কাটি...। অপেক্ষাকৃত জুনিয়র শিল্পীরাও লোকজ সুরে নিজেদের মেলে ধরেন। সম্মেলক গানগুলো উৎসবের প্রাণ বলা যায়। এ দিন বহ্নিশিখার শিল্পীদের গান নির্বাচন ছিল চমৎকার। সবাইকে নেমন্তন্ন করেন তারা। সুরে সুরে বলে যানÑ আহারে খুশি খুশি মন/নবান্নতে রইলো বন্ধু তোমার নিমন্ত্রণ...।

উদীচীর গানে কিছুটা বেদনা। সমবেত কণ্ঠে তারা গেয়ে যানÑ হায়রে কোথায় সোনার ধান, শূন্য খামার কাঁদে...। সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর যেন আশ্বস্ত করেন এই বাংলাকে। শিল্পীরা গেয়ে শোনান সেই প্রিয় গানÑ আবার জমবে মেলা বটতলা...। আনন্দন নামের সংগঠনটি গায় ‘বকুল ফুল বকুল ফুল’ গানটি। কবিতায়ও হয় নবান্ন। উৎসবে আবৃত্তি করেন জনপ্রিয় আবৃত্তিশিল্পী আহকাম উল্লাহ। লায়লা আফরোজও প্রিয় কবিতায় নবান্ন উৎসবের কথা বলেন। তার কণ্ঠে ছিলেন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্।

নাচের পরিবেশনাগুলো বরাবরের মতোই ছিল বর্ণাঢ্য। লোকগানের সঙ্গে নাচ। গ্রামীণ জনপদের বিস্মৃত প্রায় জীবন ও আচার নিখুঁতভাবেই তুলে ধরেন নৃত্যশিল্পীরা। ফসলের মাঠের রূপ বর্ণনার পাশাপাশি তারা আহ্বান করেÑ সোনালী ধানের ইশারাতে আয়রে ছুটে আয়...। অনিক বসুর পরিচালনায় যে নৃত্য, সত্যি মন ভরিয়ে দেয়। কিশোরীদের একটি দল রীতিমতো ঢেঁকি নিয়ে মঞ্চে আসে। দলের নাম নটরাজ। ‘ঢেঁকি নাচে ঢাপুর ঢাপুর আর কি নাচে সই’ গানের সঙ্গে অসাধারণ নাচে তারা। নন্দন কলা কেন্দ্রের শিল্পীরা নাচেন আঞ্চলিক ভাষায় লেখা ‘বোয়াল মাছ খাই না মুই’ গানটির সঙ্গে। নবান্ন উৎসব দারুণ বাঁচিয়ে রেখেছেন আদিবাসীরা। তাদের প্রতিনিধি হয়ে উৎসব মঞ্চে ওঠে গাড়ো কালচারাল একাডেমির শিল্পীরা। নিজস্ব সংস্কৃতির উপস্থাপনা দিয়ে দর্শকদের তারা মুগ্ধ করে রাখে। উৎসবের প্রথম পর্বে আরও ছিল রাজশাহীর আলকাপ রঙ্গরস থিয়েটারের পরিবেশনা।

এর আগে দিনব্যাপী উৎসবের উদ্বোধন করেন শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। নবান্ন কথনে অংশ নেন পর্ষদের চেয়ারপার্সন লায়লা হাসান, আহ্বায়ক শাহরিয়ার সালাম। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেনÑ কাজী মদিনা, মাহমুদ সেলিম, বাবুল বিশ্বাস, কাজী মোঃ শীশ প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মানজার চৌধুরী সুইট। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় অনেক উৎসব আছে। নবান্ন উৎসব আমাদের সর্বজনীন উৎসব। সর্বজনীন উৎসব চর্চা বাড়াতে হবে। এ উৎসবে সব ধর্ম, শ্রেণী-পেশার মানুষ একত্রিত হতে পারে। আজকের বিশ্বে এর কোন বিকল্প নেই। আলোচনার পর ছিল বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। নবান্ন শোভাযাত্রা চারুকলার বকুলতলা থেকে বের হয়ে টিএসসি চত্বর ঘুরে পুনরায় বকুলতলায় এসে শেষ হয়। বিকেলেও ছিল একই রকম আয়োজন। বিভিন্ন পরিবেশনার পাশাপাশি ছিল মুড়ি মুড়কির আয়োজন। এভাবে নবান্ন উৎসবে মুখর হয়েছিল আস্ত একটি দিন। অবশ্য আনন্দঘন দিনে আয়োজকরা ফ্রান্সে বোমা হামলায় নিহতদের কথা ভুলেননি। বাঙালীর অসাম্প্রদায়িক উৎসব থেকে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়।