২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

সিলেট মুরারীচাঁদ কলেজের আরও

স্মৃতি এবং ঢাকায় পাড়ি

(১৫ নবেম্বরের পর)

১৯৫১ সালে শুরু হলো ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি। আমাদের পড়ার বিষয় ছিল দুটি বাধ্যতামূলক (ইংরেজী ও বাংলা) এবং চারটি ঐচ্ছিক। আমার ঐচ্ছিক বিষয় ছিল রাজনীতি ও অর্থনীতি, অঙ্ক, ইউরোপীয় ইতিহাস এবং যুক্তিবিদ্যা। আমাদের পরীক্ষা শুরু হয় ৭ এপ্রিল। তবে শেষ পরীক্ষা কবে দিই তা মনে নেই। জুলাই মাসে শুরু হলো পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা। ১৯ জুলাই ফলাফল বেরুবে বলে জানা গেল। আমরা অনেকে পোস্ট অফিসে ভিড় করলাম, কারণ সেখানেই ফলাফলের খবর প্রথম পাওয়া যায়। তারবার্তায় খবর আসে আবার টেলিফোনেও খবর পাওয়া যায়। দুপুরের পর কোন খবর না পেয়ে আমরা বাড়ি ফিরতে মনস্থ করলাম। ফেরার পথে নোয়াসড়কের মোড়ে সবাই ঢুকলাম মুসলিম লীগ নেতা নুরুর রহমান চৌধুরীর বাড়িতে। তার স্ত্রী আমাদের সহপাঠী ছিলেন। তবে পরীক্ষা আর শেষ পর্যন্ত দেননি। তাছাড়া তিনি ছিলেন আমাদের এক বড় ভাই তওফিক সিরাজের বড় বোন। বাড়িতে ঢুকতেই আসমা ভাবি জোর গলায় বললেন, ‘এই যে ফার্স্ট বয় আসো, তোমাকে অভিনন্দন।’ আমরা ফল জানতে পারিনি, তাই খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। তখন তিনি বললেন যে, একটু আগেই ঢাকা রেডিও থেকে ফলাফল ঘোষণার সংবাদ দেয় এবং প্রথম কয়েকজনের নাম করে। আর যায় কোথায়! আমরা হৈ-হুল্লোড় করে আমাদের বাড়ির দিকে রওনা হলাম। বাড়িতে তখনও সংবাদটি পৌঁছেনি, কারণ দুপুরে রেডিও সচরাচর কেউ শুনত না; শুনত সকাল, সন্ধ্যা ও রাতের রেডিও। বাড়িতে পৌঁছার পর সেদিনের হৈ-হল্লা শেষ হলো। বিকেলে আব্বার সঙ্গে দাদাবাড়ি গিয়ে দাদাকে খবরটা দেয়া হলো।

সেদিন সন্ধ্যার অনেক পরও বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনসহ আমরা খুব আড্ডা দিই ও গল্প করি। আমার কতিপয় প্রিয় শিক্ষকও বাড়ি এসে অভিনন্দন জানালেন। আমার বড় ভাই প্রথম বিভাগে আইএসসি পাস করলেন। আমার খুব কষ্ট হলো যে, আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এককালের সেরা ছাত্র সুবিমল দ্বিতীয় বিভাগে আইএসসি পাস করল। আমার আর এক কাছের মানুষ নুরুল হোসেন খান প্রথম বিভাগে আইএ পাস করল। আমাদের সঙ্গে মোজাম্মেল আলী নামে একজন ছাত্র কলেজে যোগ দেয় এবং সে মুখস্থবিদ্যায় খুব ভাল ছিল। তার প্রশ্নোত্তর ভাল হলে বলত, ‘লেগেছে, তাই ছাপার অক্ষরে উত্তর লিখে দিয়েছি।’ আবু বকর নামের একজন ছাত্র আমাদের সঙ্গে মাদ্রাসা থেকে পাস করে যোগ দেয়। সেও প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়। আমাদের পাসের হার খুব কম ছিল এবং প্রথম বিভাগে কলা অনুষদে প্রায় দু’শ’ ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে দশের কম সংখ্যা প্রথম বিভাগ পায়, বিজ্ঞানে এই সংখ্যা ছিল বেশ বেশি এবং বাণিজ্যে একজনও প্রথম বিভাগ পেল না। বলতে পারি কলা বিভাগে আমি প্রথম স্থান দখল করি এবং ঢাকায় আমার অপরিচিত প্রতিযোগী গোলাম মোস্তাফা দ্বিতীয় স্থান দখল করে। বেশ কদিন গেল এই আনন্দ উৎসব নিয়ে এবং যারা পাস করতে পারেনি তাদের সান্ত¡না দেবার বিষয়টি মনেই এলো না।

আমাদের বাড়িতে সিদ্ধান্ত হলোÑ আমি ঢাকায় যাব এবং সলিমুল্লাহ্্ হলে ভর্তি হব। আমার পড়ার বিষয় হবে ইংরেজী সম্মান। বড় ভাই প্রকৌশল বা মেডিক্যাল কলেজে যাচ্ছেন না। তাই তিনি সিলেটেই বিজ্ঞানে বিএসসি পড়বেন। ২৪ জুলাই মুরারীচাঁদ কলেজের অধ্যক্ষের ইচ্ছায় আমাকে কলেজ থেকে একটি বিদায় সংবর্ধনা প্রদান করা হলো। সারা দেশে তখন একটিই বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এবং শুধু সেখানেই তিন বছরের সম্মান বিষয়গুলো পড়ানো হতো। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির তারিখ ঘোষণার জন্য আমরা অপেক্ষায় থাকলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিকালে পরীক্ষার ফল দিয়ে বিষয় পছন্দের বিচার হতো। তবে ভাল খেলোয়াড় বা অন্য বিশেষ গুণে ভূষিত ছাত্রদের জন্যও বিশেষ বিবেচনার সুযোগ ছিল। আগস্ট মাসের দু’একদিন আগে ঢাকায় গেলাম এবং একসঙ্গে বেশ ক’জন রেলে চড়লাম। ১৯৫১ সালের জানুয়ারিতে আমার সতেরো বছর পূর্ণ হয়। এতদিন সিলেটের ধোপাদীঘির পাড়ের বাড়িটিই ছিল আমার একমাত্র ঠিকানা। পিতামাতা, ভাইবোন নিয়ে আমাদের পরিবার ছিল বেশ বড়। সেখানে ঝগড়া-ঝাটি, চিৎকার, কান্না, রাগ দুঃখ কোন কিছুরই কমতি ছিল না। পরিচিত বলয়ও ছিল বৃহৎ। সেখান থেকে ঢাকায় স্থানান্তর হলো এক বিরাট পরিবর্তন। প্রথমেই ছাত্রাবাসে অবস্থান হলো নতুন অভিজ্ঞতা। কত জাতের, কত বর্ণের, কত পরিবারের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে নতুন সূত্রে পরিচয় হতে থাকল। জানামতে দুই বন্ধুই ছিল ঢাকায়; সহপাঠী রাফিকুল ইসলাম থাকত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই রেলওয়ে কলোনির একটি বাড়িতে। তার আব্বা ছিলেন রেলওয়ের ডাক্তার। আমরা একসঙ্গে সাহিত্যে পড়াশোনা করি, রাফিক বাংলায় আর আমি ইংরেজীতে। রাফিক সারাজীবন শিক্ষাজীবনেই বহাল থাকে। অন্য বন্ধুটি ছিল জিয়াউল হক টুলু; সে কিন্তু তখন ঢাকায় ছিল না, সে চলে যায় পশ্চিমে। পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান ছিলেন টুলুর চাচাসম এবং সে ছিল তার আশ্রয়ে। আমাদের এক বছর পর আইএ পাস করে সে এটাসেটা ঘুরে বিমান বাহিনীতে যোগ দেবার প্রচেষ্টা নিয়ে সবশেষে ব্যবসা-বাণিজ্যকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে। তবে তার ঢাকায় প্রত্যাবর্তন হয় আমার ছাত্রজীবনের প্রায় শেষে। টুলু পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে চাকরি পায়; কিন্তু সেখানে প্রশিক্ষকের সঙ্গে ঝগড়া করে চাকরি ছেড়ে তার চাচার কাছে ফেরত যায়।

এখানে আমার জীবনের প্রথম ঢাকা ভ্রমণের কাহিনী বলা যেতে পারে। ১৯৪৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেবার পর আমরা দুই ভাই আমাদের রীতিমতো বেড়ানোর জায়গা হবিগঞ্জে লাকুড়িপাড়ায় আমাদের ছোট খালার বাড়ি গেলাম। নানা আমাদের নিয়ে গেলেন। আমরা আর একটি জায়গায় বেড়াতে গেলাম, সুনামগঞ্জের দিরাই থানায় আমাদের বড় মামা ছিলেন স্কুল সাব-ইন্সপেক্টর। ভরা বর্ষায় তার ওখানে ক’দিন কাটালাম বিস্তীর্ণ জলাভূমির একটি দ্বীপে। ওখানে মজার ব্যাপার ছিলÑ প্রতিদিন কাজের মানুষ জাল ও পলো নিয়ে মাছ শিকারে যেত। সেসব ধরা মাছ আমরা খেতাম। গোশত বা সবজি ইত্যাদি পাওয়া যেত সপ্তায় এক বা দুদিন, যেদিন হাট বসত। সকলের বাড়িতেই মুরগি ও হাঁস পোষা হতো এবং তাদের মাঝে মাঝে জবাই করে খাওয়া হতো।

তৃতীয় বিশেষ ভ্রমণ ছিল ঢাকায় এবং সেটা নির্ধারণ করা হয় স্বাধীনতা দিবসটিকে খেয়ালে রেখে। আমাদের লক্ষ্য ছিল গোটা দশ-পনেরো দিন আমরা ঢাকা চষে বেড়াব এবং স্বাধীনতা দিবসের (১৪ আগস্ট) উৎসব উপভোগ করব। আমরা থাকব আমাদের ফুফুর বাড়িতে আরমানিটোলায়। প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ল তা হলো ঢাকা মহানগরের আয়তন, কি বৃহৎ নগর। ১৯৫২ সালে কলকাতায় গিয়ে বৃহৎ মহানগরের আর এক মাত্রার সঙ্গে পরিচয় হয়। মহানগরের বিশালত্ব নিয়ে এর পর আর কখনও এমন অনুভূতি হয়নি, যদিও সুযোগ-সুবিধার পরিসর ও চরিত্র নিয়ে এমন অনুভূতি আরও অনেকবার অনেক মহানগরে গিয়ে হয়েছে। ঢাকা মহানগরের যানবাহন নিয়ে অভিজ্ঞতাটি ছিল বেশ খারাপ। রিক্সা বেশ আরামদায়ক মনে হয়। ঘোড়ার গাড়ি মোটেই পছন্দ হয়নি এবং বাস সার্ভিসকে মনে হয় বিপজ্জনক ও দুর্বিনীত। চলবে...