২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দীপনরা কেন খুন হয় কেন খুন হবে

  • মুনতাসীর মামুন

(১৫ নবেম্বরের পর)

আওয়ামী লীগ আমলে মাদ্রাসা শিক্ষা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ আমলে অনাবশ্যক আরবী বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হয়েছে কওমিদের তুষ্ট করার জন্য। যেখানে মাদ্রাসার [উচ্চমাধ্যমিক বা বিশ্ববিদ্যালয়] ছাত্ররা ভালভাবে আরবী জানে না সেখানে আরবী বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে কী অর্জন হবে তা আমাদের জানা সম্ভব হয়নি। তবে নিশ্চয় মন্ত্রী ও সচিব জানেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের রিপোর্টের সামান্য অংশ উদ্ধৃত করছিÑ

‘আলীয়া মাদ্রাসাসমূহে ইসলামের সঠিক চর্চা হচ্ছে না। এমনকি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করার পরও একজন শিক্ষার্থী আরবী ভাষা বুঝতে পারছে না। শিক্ষার্থীরা সার্টিফিকেটসর্বস্ব পড়াশোনা করছে। এ কারণে, দেশে যোগ্য আলেম তৈরি হচ্ছে না। এরা ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করছে।...

কুরআন ও হাদিসের ভাষা আরবী হলেও আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে পাঠদানের ক্ষেত্রে টেক্সট হিসেবে পবিত্র কুরআন ও হাদিস যেভাবে পাঠদান করা উচিত ছিল সেভাবে পাঠদান করা হচ্ছে না। আরবী বিভাগের সিলেবাসে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের বিষয়সমূহ প্রতিফলিত হয়ে ওঠেনি। ফলে একজন শিক্ষার্থী দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে আরবী ভাষায় অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রী সমাপ্ত করার পরও পবিত্র কুরআন ও হাদিসের পূর্ণ জ্ঞানার্জনে সক্ষম হচ্ছে না।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই যা হচ্ছে না আপনি আশা করেন আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ে তা হবে?

ইংরেজী স্কুলে দেশের কৃষ্টি, ইতিহাস পড়ান হয় না, তারা মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে যা জানে, বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তা জানে না। ৯৫ ভাগ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ও ইতিহাস বিভাগ নেই। বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা। আমার এক সহকর্মী জানিয়েছেন, পাবনা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস ও হিসাববিজ্ঞান খোলার অনুমতি চেয়ে মঞ্জুরি কমিশনে পাঠানো হয়েছিল। কমিশন হিসাববিজ্ঞান খোলার অনুমতি দিয়েছে, ইতিহাসের নয় অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের-বিপক্ষের সবারই যারা এসটাবলিশমেন্টের সঙ্গে যুক্ত তাদের সবার দৃষ্টিভঙ্গি একÑ রক্ষণশীল এবং ডানপন্থী অর্থাৎ স্থিতাবস্থার পক্ষে। শুধু তাই নয়, সব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে এমনকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসা শিক্ষার। কিন্তু তার সঙ্গে মানবিক ও সমাজবিজ্ঞান নেই। ফলে, সমাজের ঝোঁক অর্থমুখী। আবার ব্যবসার মূল ভিত্তি দুর্নীতি। অবশ্যই তাতে সরকারের প্রশ্রয় আছে। না হলে আজ পর্যন্ত কোন ঋণখেলাপীর বিচার হয়নি কেন? বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেক হম্বি তম্বি শুনি কিন্তু হলমার্ক বা বেসিকের ব্যাপারে কি করতে পেরেছে? ইসলামী ব্যাংকের জঙ্গী অর্থায়ন ও টাকা পাচার প্রমাণিত হলেও কি করেছে? ব্যবসায়ীরা যেহেতু সরকার চালায়, সেহেতু এ অবস্থা। নীতিনির্ধারকরা বাজেট প্রণয়ন করে পুলকিত স্বরে বলেন, ‘বিজনেস ফ্রেন্ডলি বাজেট’; কখনও বলেননি ‘কনজিউমার ফ্রেন্ডলি বাজেট’। কনজিউমার তো সাধারণ মানুষ। তাদের তো ভোট ছাড়া অন্য সময় দরকার নেই। পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী। সে সুযোগে তরুণদের মনে আধিপত্য বিস্তার করছে জঙ্গীরা। জঙ্গীদের ৭০ ভাগই ছাত্র এটা লিখেছে কালের কণ্ঠ।

মানব মন সচল রাখে, নিশ্চল সমাজ এগিয়ে নেয় সংস্কৃতি। আমাদের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এ ক্ষেত্রে কী কাজ করছে? কিছু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দেয়া ছাড়া। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর পরীক্ষা ছাত্রদের নাজেহাল করে দিচ্ছে। সংস্কৃতি চর্চার কোন অবকাশ নেই। সংস্কৃতির চর্চা ছাড়া জাতি প্রগতির পথে যেতে পারে নিতান্ত মূর্খ বা মন্ত্রী ছাড়া কেউ তা ভাবে না। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঝেঁটিয়ে সংস্কৃতি চর্চা বিদায় করা হয়েছে। জঙ্গীবাদ রোধে, বাঙালী কৃষ্টির উন্নয়নে কোন পরিকল্পনা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় গ্রহণ করতে পারেনি। উল্লেখ্য, এর বাজেট সবচেয়ে কম এবং সেখানে পোস্টিং হলো ডাম্পিং পোস্টিং।

মুক্তিযুদ্ধ তো হয়েছিল পাকিস্তানের ইসলামীকরণের বিরুদ্ধে। জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের লড়াইটাই তো হবে প্রধান। এদের মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন প্রতি আমলে একটি মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রকাশ করা ও সুযোগ-সুবিধা বিতরণ। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই তো মুক্তিযুদ্ধের জন্য কিছু না কিছু করেছেন। কিন্তু সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করে এতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের অনেক দেশে পার্টিজানরা দেশ রক্ষার লড়াই করেছেন। কোথায় পার্টিজানদের তালিকা হয়েছে বা পুরস্কৃত করা হয়েছে? সোনা চুরি, বাটপারিতে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা যত পারঙ্গম, বধ্যভূমি সংরক্ষণ, নির্মাণ বা চেতনা প্রজ্বলনের ক্ষেত্রে ততটাই নিরুৎসাহী। তবে, সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কীভাবে প্রজ্বলন করা যায় তা হাতে কলমে শেখার জন্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব ও অন্যান্য কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সংসদীয় কমিটির সদস্যরা ইউরোপের কয়েকটি দেশ ও রাশিয়া ভ্রমণ করে এসেছেন বলে শুনেছি। অথচ, দেশের বৃহত্তম চট্টগ্রামের পাহাড়তলি বধ্যভূমি সংরক্ষণে পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প পাঠালে তা পাস হয় না, মন্ত্রণালয়ও কিছু করতে পারে না। অথচ আমি আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গাজী সালাহ উদ্দিন এক দশক লড়াই করে সুপ্রীমকোর্টের আদেশ এনেছি দেশের সব বধ্যভূমি সংরক্ষণে যা মনে করিয়ে দেবে প্রজন্মকে যে আজকের জঙ্গীরা ১৯৭১ সালের গণহত্যাকারীদেরই দোসর।

শিক্ষা সংস্কৃতি ধর্ম ও মুুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় হন্তারকদের মানস জগতে আধিপত্যের বিরুদ্ধে অন্য একটি জগত তৈরি করতে পারত সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করে। করেনি। কেননা বিদেশ ভ্রমণ ছাড়া মন্ত্রী বা কর্মকর্তারা অন্য কোন বিষয়ে আগ্রহী নন। আর মন্ত্রীরা দূরদর্শী বা আমলাদের হুকুমের বাইরে চলেন এমন তথ্য কেউ এখন পর্যন্ত দিতে পারেনি।

॥ ছয় ॥

শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের প্রতিপক্ষ হিসেবে হেফাজতে ইসলামের উত্থান। শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের উত্থান হয়েছিল কাদের মোল্লার দ- নিয়ে। মঞ্চের দাবি ছিল মৃত্যুদ-। মঞ্চে সব ধরনের সব বয়সের মানুষই ছিলেন যুক্ত। তবে তরুণরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শাণিত করার ক্ষেত্রে তা এক ভিন্ন মাত্রার সৃষ্টি করেছিল।

হেফাজতকে সবাই জানত অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে। কিন্তু ইতোমধ্যে জামায়াত ও বিভিন্ন ধর্ম ব্যবসায়ীর দল যে হেফাজতকে একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত করেছিল তা অনেকের জানা ছিল না। গণজাগরণ মঞ্চ মানস জগতের স্থিতাবস্থা ভঙ্গের চেষ্টা করছিল। হেফাজতের নেতৃবৃন্দ দেখেছিলেন, এর উত্থান হলে তারা যে মানসজগত তৈরি করেছেন তা হুমকির মুখে পড়বে। সুতরাং মঞ্চ বিনষ্টের কৌশল তারা গ্রহণ করেছিল। প্রথমে আমাদের হুমকি, বিএনপি পত্রিকার মাধ্যমে মিথ্যা খবর ছেপে তারা নিজেদের মতামত সংহত করেছিল। তারপর রাজীব হত্যা ও অন্যদের ওপর আক্রমণ। সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, মঞ্চের নেতারা কখনও বিএনপির অপরাজনীতি ও তারা যে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সমর্থক তা কখনও বলেননি।

ঢাকা পতনের উদ্দেশ্যে হেফাজতীরা ঢাকা দখল করার আকাক্সক্ষায় মতিঝিলে সমাবেশ করেছিলেন। সেখানে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত নেতৃবৃন্দ প্রকাশ্যে হেফাজতকে মানি পানি বিরিয়ানী দিয়ে সহায়তা করেছিলেন। দেশে তখন দু’টি পক্ষ হয়ে গিয়েছিলÑ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ও তাদের বিরোধী পাকিস্তানী মানসের হেজাবি [হেফাজত + জামায়াত + বিএনপি]।

চলবে...