২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমাধান দেয়ার বুদ্ধিবৃত্তিও আজ বিপাকে

  • সিডনির মেলব্যাগ ॥ অজয় দাশগুপ্ত

দেশের অবস্থা যখন অশাস্ত যখন তার গায়ে শয়তানের থাবা তখন বিদেশে আমরাও ভাল থাকি না। ভাল থাকার কি উপায় আছে? এই তো গেল সপ্তাহে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা এসেছিলেন সিডনি। তাঁর সঙ্গে একবেলা আলাপচারিতার সুযোগ ঘটে। ছিল মতবিনিময়ের সুবর্ণ সুযোগ। বিকেল গড়ানোর আগেই পৌঁছে গিয়েছিলাম হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের লবিতে। ঘরোয়া আড্ডার আয়োজকরা সুযোগ দেয়ায় নিজেকে সম্মানিত বোধ করেছি। না হলে গুটিকয় মানুষের মাঝে এভাবে তাঁকে পাওয়ার সুযোগ হতো না। কে না জানে বাংলাদেশে এখন নেতারা অভিনেতা। রাজনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। কেউ জানে না কোথায় আসলে কি ঘটছে। জানলে সরকার কি এভাবে হত্যাকা- চলতে দিত? যারা করছে তারা কি পার পেয়ে যেত? এসব প্রশ্ন যখন মাথা তুলছে তখন সামনে এসে দাঁড়াচ্ছেন সচিব আমলা উপদেষ্টা বা বিচারপতিরা। তাঁদের কথা তাঁদের বক্তব্যে আমরা অনেক কিছু জানতে পারি। এককালে মানুষ রাজনীতিবিদদের কথায় যা জানত তা এখন চলে গেছে এদের এখতিয়ারে। সেদিক থেকে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। তাঁর সঙ্গে আলাপ করার সুযোগও কম কিছু না। তাঁকে দেখে আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশের গায়ে যে আধুনিকতার হাওয়া লেগেছে তিনি তাঁর জ্বলন্ত প্রতীক। আমরা যেখানে পাঁচতারা হোটেলে জ্যাকেট স্যুট চাপিয়ে গেছি তিনি আসলেন রঙিন পাঞ্জাবি পরে। তাঁর কথা ও বলার ধরনও ছিল সাদামাটা। কিন্তু খুব বেশি আশা ভরসার কথা বলতে পারেননি। মনে হলো রাজনীতির নামে দলের যে চাপ তাতে তিনি ভারি বিরক্ত। বলার সময় বার বার বলে দিয়েছেন সবকিছু লেখার অধিকার নেই। সে পথে পা বাড়াব না। তবে তাঁর কণ্ঠে যে অনুযোগ আর অভিমানের সুর সেটাই আজ আমাদের জাতীয় সমস্যা।

এই যে এখন তালিকা করে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার খবর দেখছি তার আগে কারও টনক নড়ল না কেন? কেন এখন আমরা বলছি ভীত হয়ে লাভ নেই, সংঘবদ্ধ হতে হবে। কি ভেবেছিলেন তাঁরা? চুপ থাকলে বা আমি নিরাপদ ভাবলেই কি পার পাওয়া যাবে? বাংলাদেশের ইতিহাস কি বলে? আমাদের শত্রুরা কখনো ছাড় দেয়নি। তারা এককালে পরাজয়ের আগের মুহূর্তে বুদ্ধিজীবীদের চোখ বেঁধেছিল। এখন আর তার দরকার পড়বে না। বলে-কয়ে হুমকি দিয়েই মারছে এখন। কলম কখন থেকে চাপাতির দুশমন হলো? যখন থেকে আমাদের জীবনে উদারতা আর শান্তির ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করা হলো তখন থেকেই এর শুরু। কোন বুদ্ধিজীবী এ বিষয়ে মুখ খোলেননি। তারা চুপ থাকলেও আমাদের বিপরীত প্রান্তের বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের কাজ করে গেছেন। ফরহাদ মজাহার, আসিফ নজরুল কেউ চুপ ছিলেন না। তারা জামায়াতীদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে সমানে উস্কে দিয়ে গেছেন। আজ যখন গায়ে থাবা তখন কথা বলে কি পার পাওয়া যাবে? ধীরে ধীরে কখন চাপাতি কলমকে খতম করার কাজে নেমেছে জানার পরও কেউ উচ্চবাচ্য করেননি। একদিকে সতর্কতা আরেকদিকে বিরোধিতা। এমন উদ্ভট আর গোলমেলে চেহারায় জাতিকে যখন উদ্ধার করার কথা তখন যারা শীতনিদ্রায় বদলে যাবার সেøাগানের সঙ্গে পা মেলাচ্ছিলেন। তারা এখন বদলে যাওয়া বাঙালীর চেহারা দেখে ভয়ে বিবৃতি দিয়ে বলছেন আসুন একসঙ্গে পথ চলি। যাদের এখন ডাকছেন তাদেরই তো বদলে যেতে বলেছিলেন তাই না?

কিছুদিন থেকে বাংলাদেশে খুন খারাবির লীলা চলছে। ক’দিন পর পর যার যাকে খুশি কুপিয়ে মারছে। কলমকালি লেখাপড়া বা ভাল কিছুর চাইতে চাপাতির মতো ভয়াবহ এক অস্ত্র হয়ে উঠেছে শিরোনাম। কে বা কারা তা করে আর কেউ না জানলেও প্রশাসনের তো না জানার কথা নয়। সে প্রশাসন বা বাহিনীও আজ আক্রান্ত। এটা কি সহজ ব্যাপার? এর পেছনে কি শুধু ভয় ধরিয়ে দেয়া না আরও কিছু কাজ করছে? কোন্ নেতা দেশে আছেন কোন্ নেতা নেই সবাই জানেন। যারা দেশের বাইরে তারা কি নিরাপদ জায়গায় যেতে পেরে এখন দেশকে বিপদের মুখে ঠেলতে উদ্যত? না এ ঘরশত্রু বিভীষণদের খেলা? এসব প্রশ্নের জবাব পাওয়া দরকার। প্রধান বিচারপতি যখন বলেন, জামায়াত-বিএনপির চাইতেও কাছের মানুষ নামে পরিচিতজনরা তাঁকে বেগ দেয়, তাঁর ঘুম কেড়ে নেয় আমরা কি ভয় পাব না? এই চক্রান্ত আমাদের যৌবনের শুরুতেও দেখেছিলাম। তখন বঙ্গবন্ধুর আমল। সদ্য স্বাধীন দেশ। নতুন প্রশাসন। সামাল দেয়া যায়নি। আর সামাল দিতে না পারার কারণে আমরা কি কি হারিয়েছি তার কথা কি খুলে বলার দরকার আছে? সে ঘা, সে আঘাত এখনও শুকোয়নি। এত বছর পরও সে ভুলের মাসুল দিয়ে চলেছি আমরা। কিন্তু এখন তো ডিজিটাল আমল। এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। সব প্রায় হাতের মুঠোয়। এখনও যদি আমরা তা সামাল দিতে না পারি এ জাতি কি আসলে মাথা তুলে বাঁচতে পারবে? এস কে সিনহার সঙ্গে আলাপের পর আমার ধারণা বদ্ধমূল কোথাও সাংঘাতিক কিছু ঘটছে। যার নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে না পারলে একদিন আমাদের পরিচয় সূত্রগুলো বদলে যেতে বাধ্য।