২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আক্রান্ত প্যারিস

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস আবার আক্রান্ত। ফ্রান্সে এই প্রথম আত্মঘাতী হামলার ঘটনা ঘটল। প্যারিসের অন্তত ছয়টি স্থানে সন্ত্রাসী হামলায় কমপক্ষে ১২৯ জন নিহত হয়েছেন। ভয়াবহ এসব হামলায় আরও কয়েক শ’ আহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যায় এসব সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। দেশটিতে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির সকল সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম দেশটিতে জারি করা হয়েছে কারফিউ। এগার বছর আগে স্পেনের মাদ্রিদে ট্রেনে হামলার ঘটনার পর প্যারিসে এই হামলাটিই ইউরোপে সবচেয়ে ভয়াবহ। শিল্প ও শিল্পীদের পীঠস্থান বলে খ্যাত প্যারিসে বছরের শুরুতেই ঘটেছিল জঙ্গী হামলা। রম্য পত্রিকা শার্লি হেবদোর দফতরে দুই জঙ্গীবাদীর হামলায় ১০ জন কার্টুনিস্ট সাংবাদিক এবং পুলিশের দুই সদস্য নিহত হওয়ার পরে বিশ্বজুড়ে এই হামলার নিন্দা এবং নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সংহতি প্রকাশ করার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যে প্যারিসের প্লাস দো লা রেপুবলিক চত্বরে সমবেত হন ১৫ লাখ মানুষ। একাত্মতা প্রকাশ করতে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন অন্তত ৪০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান। স্মরণযোগ্য, ফরাসী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ সেসময় যথার্থই বলেছিলেন, ‘প্যারিসই আজ পুরো বিশ্বের রাজধানী। আজ জেগে উঠেছে পুরো দেশ।’ ওই অভূতপূর্ব সমাবেশের মধ্য দিয়ে ফরাসীরা বার্তা পেয়েছিল : তারা একা নয়, তাদের পাশে রয়েছে সারাবিশ্ব। ওই তাৎক্ষণিক বিপুল প্রতিক্রিয়া ও সংহতি বিশ্বব্যাপী জঙ্গীবাদের জন্য ছিল নিঃসন্দেহে এক কঠোর হুঁশিয়ারি। এর মাধ্যমে জাতিধর্ম নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল জঙ্গীবাদের বিপক্ষে একতাবদ্ধ রয়েছে গোটা বিশ্ব। এরপরও পুনরায় প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা স্পষ্টত জানিয়ে দেয়Ñ আজ পৃথিবীর ঘোর দুর্দিন।

প্যারিসে হামলা ও হত্যাযজ্ঞের ঘটনাগুলোকে শুধু মর্মান্তিক বলে বর্ণনা করলে পুরোটা বোঝানো যায় না। সংগঠিতভাবে চালানো এই হামলাগুলো নিঃসন্দেহে দীর্ঘ পরিকল্পনার ফসল। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন যে, আইসিসের পক্ষ থেকে এর দায়িত্ব স্বীকার করে বিবৃতি আসলে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না। অতীতে অভিন্ন হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে আল কায়েদা ইন ইয়েমেন এবং আইসিস বিবৃতি দিয়েছে। এগুলো আইসিসের বা আল কায়েদার ‘আদর্শে অনুপ্রাণিত’ ফরাসী গোষ্ঠীর চালানো হামলা হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। হামলা যারাই পরিচালনা করে থাকুক না কেন, তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় তারা মানবতাবিরোধী। এই ধরনের হামলা ও হত্যাযজ্ঞ কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিশ্বব্যাপী মানুষ এখন জঙ্গীবাদ সম্পর্কে সচেতন। দেশে দেশে সাধারণ মানুষের বিন্দুমাত্র সমর্থন নেই এদের প্রতি। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রশক্তি জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে সতত সোচ্চার থাকলেও হঠাৎ হঠাৎ জঙ্গী আক্রমণে বিপদাপন্ন হয়ে উঠছে প্যারিসের মতো বিশ্বের আরও স্থান। দুঃখজনক হলো জঙ্গীবাদের ফ্রাঙ্কেনস্টাইন সৃষ্টির পেছনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে একাধিক রাষ্ট্রের। আমরা আশা করেছিলাম বছরের গোড়ার দিকে প্যারিসে বিশ্বনেতৃবৃন্দের সমাবেশ, শোভাযাত্রা এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিন্ন বক্তব্য ও অঙ্গীকার তুলে ধরার ফলে আগামীতে জঙ্গীবাদ অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়বে। চরম পরিতাপের বিষয়Ñ বাস্তবে তা হয়নি। তাই বিশ্বনেতৃবৃন্দকে আজ নতুন করে ভাবতে হবে মানববিনাশী অপশক্তিকে কী উপায়ে প্রতিরোধ করা যায়। বিশ্বমানবতার কল্যাণের লক্ষ্যে শুভবোধ জাগ্রত রাখা এবং শুভ শক্তির ঐক্য খুব জরুরী। নিহতদের স্বজন ও ফ্রান্সের নাগরিকদের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা।