২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সামাজিক প্রতিরোধ

গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে বাল্যবিয়ের খবর যেমন আসে, তেমনি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের খবরও মেলে মাঝে-মধ্যে। সমাজ প্রগতির ধারায় এটি একটি আশাব্যঞ্জক খবর বটে। ঘটনাস্থল গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার সিংদীঘি গ্রাম। স্থানীয় সিংদীঘি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর নীলিমা নাম্নী ১১ বছর বয়সী এক কিশোরী কন্যার বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করেছিল তার বাবা-মা। পাত্রপক্ষ যথাসময়ে এসে হাজির। অকস্মাৎ প্রায় বজ্রপাতের মতো ঘটে ঘটনা। স্থানীয় মাওনা ইউনিয়ন শিশু সুরক্ষা দলের উপদেষ্টা সাহিদা আক্তার স্বর্ণার নেতৃত্বে নীলিমার সহপাঠী ও সতীর্থ সিংদীঘি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একদল শিশু শিক্ষার্থী সদলবলে হাজির হয় অকুস্থলে। খবর পেয়ে বরপক্ষ আগেভাগেই পালিয়ে যায়। এ বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ এবং শিশু সুরক্ষা দলের সদস্যরা বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে নীলিমার বাবা-মাকে বোঝাতে সক্ষম হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিয়েটি ভেঙ্গে যায়। বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ায় নীলিমাও খুশি। এক প্রতিক্রিয়ায় সে জানায়, লেখাপড়া শিখে ভাল মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করাই তার স্বপ্ন।

এখানে সাহিদা আক্তার স্বর্ণার যৎসামান্য পরিচয় দেয়া দরকার। গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারী কলেজের সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সাহিদা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও ঢাকা আহসানিয়া মিশন পরিচালিত মাওনা শিশু ফোরামের উপদেষ্টা। এর আগে সাহিদা নিজের বাল্যবিয়ে রুখে দেয়া ছাড়াও অন্তত ৩০টি বাল্যবিয়ে বন্ধের ব্যাপারে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে সমর্থ হয়। এর জন্য সে নরওয়ে থেকে পুরস্কৃতও হয়েছে। তবে সাহিদার কৃতিত্ব বোধকরি এখানেই নিহিত যে, বিয়ে বন্ধের জন্য সে আদৌ কোন জোর জবরদস্তি, হুমকি ধমিক অথবা হৈ হট্টগোল, থানা পুলিশ করেনি। বরং নীলিমার বিয়ের খবরটি বিভিন্ন পর্যায়ে সংগ্রহ করে সুনিশ্চিত হয়েই সে কাজে নামে। সরাসরি যোগাযোগ করে নীলিমার স্কুলের প্রধান শিক্ষক, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য, উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তাসহ স্থানীয় গণ্যমান্যদের সঙ্গে অর্থাৎ সাহিদার গোটা কার্যক্রম ও সাফল্যের মূলে রয়েছে মোটিভেশনাল পদ্ধতি। ফলে শেষ পর্যন্ত সাহিদা ও তার সহযোগীরা কমিউনিটি লিডারদের সহায়তায় নীলিমার বাবা-মাকে বোঝাতে সক্ষম হয় বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে।

প্লান ইন্টারন্যাশনাল একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। ঢাকায় সম্প্রতি সংস্থাটি ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে পরিচালিত এক গবেষণা জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে। তাতে তারা দেখিয়েছে যে, বাংলাদেশে ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই ৭৩ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। আরও যা উদ্বেগজনক তা হলো ১২ থেকে ১৪ শতাংশ মেয়ের বিয়ের হার ২৭ শতাংশ। নীলিমা বোধ করি তাদের একজন। সত্য বটে, দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে এমনকি পারিবারিক স্তরেও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এর প্রকোপ বেশি। পরিবারে ছেলে ও মেয়ে শিশুকে অনেক ক্ষেত্রেই একই চোখে দেখা হয় না। শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে মেয়েদের প্রাথমিক স্তরে অংশগ্রহণ বেশি হলেও পঞ্চম শ্রেণীর পর ঝরে পড়ার হার বেশি। মেয়েদের উচ্চশিক্ষার প্রতি এক শ্রেণীর মানুষের নেতিবাচক মনোভাব এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে পরিবার থেকে মেয়েদের বিয়ের ব্যাপারে প্রবল চাপ পরিলক্ষিত হয়। সে ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা মেয়েদের বাল্যবিয়ে রোধ করতে পারে। ঝরে পড়ার হার প্রতিরোধসহ মেয়েদের ক্ষেত্রে সুনিশ্চিত সর্বজনীন শিক্ষা বিশেষ করে ব্যবহারিক শিক্ষা তাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনে সহায়ক হবে। স্বনির্ভর হলেই মেয়েরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে সক্ষম হবে এবং তাতে বাল্যবিয়ের হার খুব দ্রুতই কমবে বলে আশা করা যায়।