২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নেদারল্যান্ডস থেকে ফ্রান্স...

  • এম নজরুল ইসলাম

২ নবেম্বর দুপুরে যখন নেদারল্যান্ডসের ডেনহাগ বিমানবন্দরে পৌঁছালাম স্থানীয় সময় তখন দুপুর ১টা ৩০। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শীত পড়তে শুরু করেছে। সকালে কুয়াশার আড়ালে মুখ লুকায় সূর্য। কোথাও কোথাও থেমে থেমে বৃষ্টি। শীতবস্ত্র ছাড়া বাইরে বের হওয়া যায় না। বিমানের ভেতরে বসেই দেখতে পাই। আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটা নেই। কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষায় ‘চারদিকে চিক চিক করছে রোদ্দুর’। বিমান থেকে নেমেই মনটা ভাল হয়ে যায়। কাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসবেন, প্রবাসী বাঙালীদের পক্ষ থেকে তাঁকে সংবর্ধনা জানাতেই আমাদের এখানে আসা। নেদারল্যান্ডসের প্রশাসনিক রাজধানী ডেনহাগ, এ নগরীকে অনেকেই জানেন হেগ নামে। বিমানবন্দরে আমাদের শুভেচ্ছা জানালেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে হোটেলের দিকে যেতে যেতে রাস্তার দুই পাশে তাকিয়ে মন ভরে গেল। এখনও সেভাবে গাছের পাতা ঝরে পড়েনি। ডেনহাগের বিভিন্ন রাস্তার পাশে লাইটপোস্ট ও দেয়ালে শোভা পাচ্ছে বঙ্গবন্ধুকন্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনার হাস্যোজ্জ্বল ছবি সংবলিত পোস্টার, ফেস্টুন ও ব্যানার। তাতে লেখা আছে, ‘শেখ হাসিনা-বাংলাদেশ ছাড়িয়ে আজ বিশ্বনেতৃত্বের একটি নাম, মুক্তির প্রতীক শেখ হাসিনা, গণতন্ত্রের দীপ্ত শিখা শেখ হাসিনা, গণমানুষের অধিকারের প্রতীক শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধুর যথার্থ উত্তরসূরি শেখ হাসিনা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত ও জঙ্গী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ত্রাস শেখ হাসিনা, ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন থেকে ‘আইসিটি টেকসই উন্নয়ন পুরস্কার’ অর্জন করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন, জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ অর্জন করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন, বিশ্বের গর্ব শেখ হাসিনার আগমন শুভেচ্ছা-স্বাগতম, প্রাণপ্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা স্বাগতম’, ইত্যাদি।

নেদারল্যান্ডস সফরকালে প্রধানমন্ত্রী অবস্থান করেন গ্র্যান্ড হোটেল আমরাত কুরহাউসে। নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটের আমন্ত্রণে সে দেশে তিন দিনের সরকারী সফরে রাজধানী আমস্টারডামে পৌঁছার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়। বিমানবন্দর সেন্টারে উষ্ণ সংবর্ধনা দেয়ার পর প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক মোটর শোভাযাত্রায় নেদারল্যান্ডসের প্রশাসনিক রাজধানী ডেনহাগ নগরীতে গ্র্যান্ড হোটেল আমরাথ কুরহাউসে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন হোটেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত করেন নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী লিলিয়ান প্লুমেন এবং পরিবেশমন্ত্রী মেলানি সুল্জ। অনুষ্ঠান শেষে শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে করে নেদারল্যান্ডসের ব-দ্বীপাঞ্চল (ডেলটিক আইল্যান্ড) এবং জাহাজে করে পোতাশ্রয় ফিউচার ল্যান্ড পরিদর্শন করেন। বুধবার স্থানীয় সময় সকালে নেদারল্যান্ডসের গ্র্যান্ড হোটেল আমরাত কুরহাউস দ্য হেগে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে নেদারল্যান্ডসের অবকাঠামো ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়। অনুষ্ঠানে ডাচ্মন্ত্রী মেলানি হেগেন নিজেই ‘ডেল্টা প্ল্যান এ্যাপ্রোচ’ উপস্থাপন এবং তাঁর নিজ দেশের ৬০ বছরের ব-দ্বীপ পরিকল্পনার বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা এবং নতুন আরেকটি ব-দ্বীপ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে দুই দেশের পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা যোগ দেন। আলোচনায় পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভূমি উদ্ধারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন মেলানি সুল্জ ভেন হেগেন। পানি ব্যবস্থাপনা ও বন্যা প্রতিরোধের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের গ্রহণ করা বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা (বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান) ২১০০ বাস্তবায়নে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে নেদারল্যান্ডসÑএ খবর বাংলাদেশের সব সংবাদ মাধ্যমেই বিস্তারিত এসেছে। বিকেলে ডাচ্ প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটের সঙ্গে তাঁর সরকারী বাসভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠক হয়।

তিন দিনের সরকারী সফরের শেষদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যোগ দেন প্রবাসীদের দেয়া এক সংবর্ধনা সভায়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক, আমরা যারা প্রবাসে বসবাস করি তাদের জন্য এই দিনটি সব সময় স্মরণীয় হয়ে থাকে। সব সফরেই প্রবাসীদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। তিনি প্রবাসীদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলোচনা করেন। সবার খোঁজখবর নেন। দিয়ে যান দিকনির্দেশনা। এই দিনটি আমাদের কাছে এক পরম পাওয়া। এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান সর্বাঙ্গ সুন্দর করতেই আমাদের ডেনহাগ আসা।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রবাসীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। দেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। প্রবাসীরা যে অনেক কষ্ট করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রেমিটেন্স পাঠাচ্ছে সে কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগরতলা মামলা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসীদের ভূমিকার কথা স্মরণ করেন তিনি। বিপুল করতালির মধ্যে তিনি জানিয়ে দেন, কোন ষড়যন্ত্র বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের চলমান উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। কারণ, দেশের মানুষ উন্নয়নের অদম্য স্পৃহা নিয়ে পথ চলছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই একটি দিক সব সময় আমাদের দৃষ্টি কেড়েছে। কখনও হতোদ্যম হন না তিনি। ইউরোপে তাঁর প্রায় প্রতিটি সফরে গিয়েছি আমি। একান্তে কথা হয়েছে এবারও। সব সময় লক্ষ্য করেছি তাঁর চরিত্রের দাঢ্য। তিনি আশাহত হন না কখনও। কোন চাপের মুখে নতিস্বীকার করতে তিনি রাজি নন। তিনি জানেন কী করে বাংলাদেশের মানুষকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। এবারের সফরেও তাঁর নিজস্ব চিন্তা-চেতনার কথা বলেছেন। আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশকে কোন অবস্থানে নিয়ে যেতে চান, তা উল্লেখ করেছেন। সব ষড়যন্ত্র কাটিয়ে বাংলাদেশ যে ২০২১ সালের মধ্যে একটি মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে।

আজ ১৬ নবেম্বর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্যারিসে ইউনেস্কোর একটি সম্মেলনে যোগ দেয়ার কথা ছিলো। আমি ভিয়েনা থেকে রওনা হওয়ার আগেই পেয়ে যাই প্যারিসের অঘটনের খবর। আশঙ্কা ছিল, ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায় কি-না। অবশেষে স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে আটটায় প্যারিসে পা রাখা। না, আমার আগের দেখা প্যারিসে নয়। অন্যরকম এক নগরীতে এলাম যেন। এখানে শীত বেশ জেঁকে পড়ছে। আকাশ কুয়াশাচ্ছন্ন। তার আগে অন্য এক কুয়াশা দেখা দিয়েছে ফ্রান্সের আকাশে। স্বজন হারানোর বেদনায় আচ্ছন্ন পুরো ফ্রান্স। পরে জানলাম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ফ্রান্স সফর বাতিল করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে প্রবাসীদের পক্ষ থেকে আরেকটি সংবর্ধনা দেয়ার কথা ছিলো প্যারিসে। জানি প্যারিস শিগগিরই এ শোক কাটিয়ে উঠবে। আমরা আবারও অপেক্ষায় থাকবো প্রিয় নেত্রীর জন্য।

লেখক : অস্ট্রিয়া প্রবাসী মানবাধিকারকর্মী

হধুৎঁষ@মসী.ধঃ