১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অন্তরালে

  • তাপস মজুমদার

সালাবি ॥ গুপ্তচর ও বিশ্বাসঘাতক

সময়ের অমোঘ নিয়মে অনিবার্য চলে গিয়েছিলেন বিস্মৃতির আড়ালে। কিন্তু চিরন্তন মৃত্যু তাকে আবার এতদিন পর তুলে আনল ইতিহাসে আঁস্তাকুড় থেকে। মরে গিয়ে হলেন খবরের শিরোনাম। সালাবি মূলত ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের উৎখাতের নাটের গুরু। ব্রিটিশ-মার্কিন সামরিক অভিযানে মূল মন্ত্রণাদাতা, যেটি পরিচালিত হয়েছিল সালাবি প্রদত্ত ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে। এই সালাবি সাদ্দামকে উৎখাতের পর ইরাকের প্রায় একচ্ছত্র রাজা বনে যান।

আহমেদ আবদেল হাদি সালাবি ২০১৫ সালের ৩ নবেম্বর মারা গেছেন বলে জানিয়েছে ইরাকের রাষ্ট্র পরিচালিত টেলিভিশন। বাগদাদে নিজ বাড়িতে শয়নকক্ষে সালাবির মৃতদেহ পাওয়া যায়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭১। অনুমান করা হয়, সালাবি মারা গেছেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। মৃত্যুকালে তিনি ছিলেন ইরাকী পার্লামেন্টের একজন সদস্য এবং ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান।

পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, কে এই সালাবি, যিনি হঠাৎ করে হলেন খবরের শিরোনাম? সেক্যুলার এই শিয়া নেতাকে ইরাকে ২০০৩ সালে ব্রিটিশ ও মার্কিন যৌথ হামলার অন্যতম প্রবক্তা ও সমর্থক বলে মনে করা হয়। ইরাকী ন্যাশনাল কংগ্রেসের (আইএনসি) প্রতিষ্ঠাতা সালাবি সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে নির্বাসনে থাকার সময় নিয়মিত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যকে তথ্য সরবরাহ করতেন। ক্রমশ তিনি হয়ে উঠেছিলেন টনি ব্লেয়ার ও বুশ প্রশাসনের প্রিয়পাত্র। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের প্রাক্কালে তিনি ওয়াশিংটনকে এই মর্মে তথ্য দিয়েছিলেন যে, সাদ্দাম হোসেনের কাছে ব্যাপক গণধ্বংসাত্মক অস্ত্রসহ বিপুল রাসায়নিক অস্ত্রের মজুদ আছে এবং ইরাক এমনকি পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী জঙ্গীগোষ্ঠী আল কায়েদার সঙ্গেও সাদ্দাম হোসেনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। তবে পরে যুদ্ধশেষে এসবের পক্ষে আদৌ কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিশনে ভুয়া প্রমাণিত হয়। কিন্তু এতদিনে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। শুধু ইরাকীরাই নয়, বরং সিরিয়াসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধবিগ্রহ ও জঙ্গী সন্ত্রাসী কার্যক্রমে ক্ষতবিক্ষত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে প্রতিদিন।

এই প্রেক্ষাপটে সালাবিকে কি বলে অভিহিত করা হবে? একজন বিশ্বাসঘাতক নাকি দেশপ্রেমিক! বিতর্কিত এবং বর্ণময় চরিত্রের অধিকারী সালাবিকে দু’ভাবে মনে রাখবে ইরাকীরা। এক পক্ষ তাকে অভিহিত করেছে বিশ্বাসঘাতক ও রাষ্ট্রদ্রোহী এবং অন্য পক্ষ তার ভূমিকার প্রশংসা করেছে। ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে ফ্রান্সের গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সালাবি ছিলেন ইরানী এজেন্ট! মূলত তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ও মার্কিনীদের হাতের পুতুল তথা ক্রীড়নক। সাদ্দাম হোসেনের পতনের কিছুদিনের মধ্যেই সালাবি নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে আসেন। কিছুদিন তেলমন্ত্রী এবং পরে উপ-প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

ইরাকের বিশাল তেলসম্পদ লুটপাটের সঙ্গেও সালাবির সম্পৃক্ততা অস্বীকার করা যাবে না। শিয়া নেতা হলেও আরব ও কুর্দী রাজনীতিকদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক সুবিদিত। সর্বোপরি বুশ ও ব্লেয়ার প্রশাসনের তিনি ছিলেন সমধিক প্রিয়পাত্র। ইতিহাসের সার্বিক বিচারে শেষ পর্যন্ত আহমেদ সালাবি একজন খলনায়ক তথা বিশ্বাসঘাতক হিসেবেই চিহ্নিত হবেন।

ন্যূনতম মজুরি ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

আসন্ন নির্বাচন নিয়ে খুব হৈহৈ, রৈরৈ কা- চলছে মার্কিন মুলুকে। প্রায় প্রতিদিনই উৎসাহী ও উদ্যমী প্রার্থীরা বিভিন্ন স্টেটে জনসভা, সভা-সেমিনার, প্রতিনিধি সম্মেলনে ‘হেন করেঙ্গে তেন করেঙ্গে’ বলে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু শ্রমজীবীদের ন্যূনতম মজুরি নিয়ে তেমন একটা মুখ খুলছেন না। তবে এদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে জাতীয় পর্যায়ে রীতিমতো হৈচৈ ফেলে দিয়েছেন সিয়াটল সিটি কাউন্সিলের এক নির্বাচিত প্রতিনিধি শামা সাওয়ান্ত। স্যোসালিস্ট অল্টারনেটিভ পার্টির সদস্য শামার দাবি, শ্রমজীবীদের ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টাপ্রতি ১৫ ডলার করতে হবে। তার এই দাবি ইতোমধ্যেই সর্বস্তরে সাড়া জাগিয়েছে।

২০১৬ সালে অনুষ্ঠেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে বেশ জোরেশোরে। ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে হিলারি ক্লিনটন, সাবেক গবর্নর মার্টিন ও মেলি এবং সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এগিয়ে আছেন প্রার্থীর চূড়ান্ত তালিকায়। অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টি থেকে সাবেক গবর্নর জেব বুশ, ডা. বেন কারশন, গবর্নর ক্রিস ক্রিস্টি ও সিনেটর টেড ক্রুজ এগিয়ে আছেন মনোনয়ন দৌড়ে। এবারের নির্বাচনে অর্থনৈতিক সংস্কার, ন্যূনতম মজুরি সর্বোপরি অভিবাসন ইস্যু প্রাধান্য পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত বছর জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ৭ দশমিক ২৫ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১০ দশমিক ১০ ডলার করার জন্য মার্কিন কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেটি বাস্তবায়িত হলে কমবেশি ২ কোটি ৮০ লাখ আমেরিকান উপকৃত হতেন, যার মধ্যে অধিকাংশ শ্রমিক ও কর্মী। তবে সে সময় রিপাবলিকানদের চরম বিরোধিতার মুখে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির কোন বিল পাস করানো যায়নি। কংগ্রেসের উভয় কক্ষে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ থাকায় প্রেসিডেন্ট ওবামা কেন্দ্রীয়ভাবে মজুরি বৃদ্ধির চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে স্টেটগুলো তাদের নিজস্ব বিধি অনুযায়ী ওয়াশিংটন, নিউইয়র্কসহ ২৯টি স্টেটে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়, যা কার্যকর হচ্ছে নতুন বছরের জানুয়ারি থেকে। ২০০৭ সালে কংগ্রেসে পাস হওয়া বিধি অনুযায়ী, ফেডারেল প্রশাসনের কর্মচারীদের ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ৭ দশমিক ২৫ ডলার করা হয়। এর ফলে প্রবাসী বাংলাদেশীসহ প্রায় ৩৩ লাখ আমেরিকান উপকৃত হবেন।

তবে এটুকুই যথেষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় এর মধ্যে বহুগুণ বেড়েছে এবং তার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ ও শ্রমিক শ্রেণী হিমশিম খাচ্ছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে প্রেসিডেন্ট ওবামা ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি বিদায়ের প্রাক্কালে ন্যূনতম মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ১২ ডলার করে দেয়ার চেষ্টা করবেন।

এই পরিস্থিতিতে সিয়াটল সিটি কাউন্সিলের এক প্রতিনিধি শামা সাওয়ান্ত ন্যূনতম মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ১৫ ডলার করার দাবি জানিয়েছেন। সাওয়ান্ত দ্বিতীয়বারের মতো তার এই বিজয়ের জন্য কৃতিত্ব দিয়েছেন বার্নি স্যান্ডার্সকে। স্বভাবতই ব্যবসায়ী শ্রেণীসহ মেয়র ও অন্য কাউন্সিলররা সাওয়ান্তের এই দাবির বিরোধিতা করেছেন। এরপরও এটি কাউন্সিলের অন্যতম এজেন্ডা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং জাতীয় পর্যায়ে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। নিউইয়র্কের মেয়র এন্ড্রু কুওমো ঘণ্টাপ্রতি সবনিম্ন বেতন ৭.২৫ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৫ ডলারে উন্নীত করার প্রস্তাব করেছেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির দুই প্রধান প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন এবং বার্নি স্যান্ডার্সও শ্রমজীবীদের সর্বনিম্ন বেতন বৃদ্ধির দাবি সমর্থন করেছেন। তবে তা কত হতে পারে, তা বলেননি। রিপাবলিকান প্রার্থীদের সবাই বেতন বৃদ্ধির ঘোর বিরোধী। এখন দেখার বিষয়, আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এটি কতটা প্রভাব ফেলতে সমর্থ হয়?

বোমা ফাটালেন সিনিয়র বুশ

সবাই জানেন, ২০০৩ সালে ইরাকে সাদ্দাম সরকারকে উৎখাতে সামরিক অভিযানের মূল নায়ক ছিলেন জর্জ ডব্লিউ বুশ। আর এ কাজে তাকে সর্বাত্মক সহায়তা দেন যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। ব্রিটিশ-মার্কিন পরিচালিত এই সামরিক আগ্রাসনের গুপ্তচরবৃত্তিসহ সব রকম সহযোগিতা প্রদান করেন ইরাকের ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা আহমদ সালাবি। তবে সরাসরি ইরাক আক্রমণে জর্জ বুশকে প্ররোচিত করেন তৎকালীন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি এবং প্রতিরক্ষা সচিব ডোনাল রামসফেল্ড। দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর এ ব্যাপারে মুখ খুলেছেন জর্জ বুশের বাবা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ হারবার্ট বুশ তার প্রকাশিতব্য আত্মজীবনীতে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ হারবার্ট ওয়াকার বুশ সিনিয়র তার ছেলের হোয়াইট হাউসে থাকার দিনগুলোতে নেয়া ‘অনেকগুলো বাজে সিদ্ধান্তের’ জন্য এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ডোনাল্ড রামসফেল্ড ও ডিক চেনির কড়া সমালোচনা করেছেন।

এক স্মৃতিকথায় মার্কিন সরকারের প্রভাবশালী এ দুই সাবেক কর্তাব্যক্তিকে ‘অহঙ্কারী’, ‘দাম্ভিক’ ও ‘নিজ সাম্রাজ্যের রাজা’ আখ্যায়িত করেছেন বুশ সিনিয়র। তার জীবনীকার জন মেয়াচেমের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ‘ডেসটিনি এ্যান্ড পাওয়ার : দ্য আমেরিকান ওডিসি অব জর্জ হারবার্ট ওয়াকার বুশ’ নামের এক জীবনীগ্রন্থে এ বিষয়গুলো থাকবে, যা বাজারে আসছে আগামী সপ্তাহে।

সাক্ষাতকারভিত্তিক এ বইয়ে ছেলে জর্জ বুশেরও সমালোচনা করেছেন ‘বড়’ বুশ। তিনি লিখেছেন, ‘ওর বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য নিয়ে আমি প্রায়ই উদ্বিগ্ন থাকতাম।’ সিনিয়র বুশ ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৪১তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। তার ছেলে জর্জ বুশ ২০০১ সালে একই পদে নির্বাচিত হন।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে রামসফেল্ড প্রেসিডেন্টকে সহায়তার ক্ষেত্রে তার দায়িত্ব ‘অত্যন্ত বাজেভাবে’ পালন করেছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন সিনিয়র বুশ। ‘সে যা করেছে, তা আমি পছন্দ করতে পারি না। অন্যরা কি ভাবছে তা থোড়াই কেয়ার করার প্রবণতা ছিল তার মধ্যে। নাম কামাতেই তার বেশি আগ্রহ ছিল।’ এ কারণেই তাকে দ্বিতীয় মেয়াদে সরিয়ে দেয়া হয় বলে মন্তব্য করেন সিনিয়র বুশ।

অতঃপর দেখার বিষয়, মার্কিন জনগণ ছেলের পক্ষে বাবার এই সাফাইকে কিভাবে গ্রহণ করে!

বিদেশী পত্রপত্রিকা অবলম্বনে