২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দীপনরা কেন খুন হয় কেন খুন হবে

  • মুনতাসীর মামুন

(১৬ নবেম্বরের পর)

তারা বিভিন্ন সংস্থা আক্রমণ, পবিত্র কোরআন শরিফে আগুন লাগানো, নাস্তিকদের হত্যার হুমকি সবই দিচ্ছিল। সরকারের দোদুল্যমানতার কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। সরকারে দু’পক্ষ হয়ে গিয়েছিল। এক পক্ষ চাচ্ছিল তোষণ, অন্যপক্ষ দৃঢ়ভাবে দমন। শেখ হাসিনা দৃঢ়ভাবে দমনের সিদ্ধান্ত নেন। এ ক্ষেত্রে দলের পক্ষে সৈয়দ আশরাফ ও সরকারের পক্ষে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর দৃঢ় ভূমিকা নেন। কোন রক্তপাত ছাড়াই হেজাবিদের বিতাড়িত করা হয়। হেজাবি নেতা বাবুনগরী, যিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন, কারাগারে যান। অন্য কয়েকজনকেও গ্রেফতার করা হয়। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় হেজাবিরা। সরকার যদি তার পদক্ষেপ অটুট রাখত তাহলে পরবর্তীকালে হত্যার ঘটনাগুলো ঘটত না।

হেজাবিরা দমিত হওয়ার পর শুনলাম এবং কাগজে দেখলাম, সরকারের তোষণ কৌশলের জন্য জয়লাভ করেছে। শুনেছি, যুক্তিটি ছিল ড. আলমগীরের কারণে আওয়ামী লীগের অনেক ভোট নষ্ট হয়েছে। এখন নষ্ট হওয়া ভোট পুনরুদ্ধার করা যেতে পারে একমাত্র তোষণে।

বাবুনগরীরা ছাড়া পেলেন, জমি পেলেন, টাকা পেলেন। তাদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোর কী হলো কেউ জানল না। সবার কাছে বার্তা গেল, সরকার ভুল করেছিল, সরকার হেজাবিদের পক্ষে। অর্থাৎ স্থিতাবস্থার পক্ষে। এরপর একজন দু’জন করে অন্তর্জাল লেখক খুন হতে থাকলেন। এখন পর্যন্ত কোন খুনের কিনারা হয়নি।

সাকা চৌ ও মুজাহিদের আপীল নিয়ে যে কোন কারণে হোক দেরি, জনমনে এ ধারণার সৃষ্টি করেছে যে, পর্দার অন্তরালে কিছু একটা হচ্ছে। হয়ত কিছুই হচ্ছে না। কিন্তু এ রকম ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। আর তারই মাঝে দুজন বিদেশী, পুলিশ এবং দীপনকে হত্যা করা হলো। তিনজন লেখক কোপ খেয়ে এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। প্রতিটি ঘটনার পর বলা হয়েছে, এগুলো ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা। তারপর বলা হয়েছে, ‘পরিকল্পিত’ ঘটনা। বিচ্ছিন্ন হলে পরিকল্পিত হয় কীভাবে? এখন বলা হচ্ছে সবগুলো ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা। আমরা তাহলে যাই কোথায়?

বিদেশী হত্যা ঘটনার সঙ্গে সরকারী ভাষ্য অনুযায়ী বিএনপি জড়িত, যদিও তদন্তের সম্পূর্ণ ফলাফল প্রকাশিত হয়নি। পুলিশ হত্যার ঘটনায়ও বলা হচ্ছে একই সূত্রে গ্রথিত। কিন্তু দীপন হত্যার আগে পর্যন্ত যারা নিহত হয়েছেন বলা হয়েছে, তাতে জঙ্গীরা জড়িত। এখন যদি সব কিছু একই সূত্রে গাঁথা হয় তাহলে জঙ্গীরা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। টেক্সটটা এরকম হলে বোধহয় সংহত হতোÑ কিছু ঘটনায় বিএনপি-জামায়াত জড়িত, কিছু ঘটনায় গোপন জঙ্গী সংগঠনগুলো যুক্ত। দুটি দলেরই লক্ষ্য অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি। তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা ভিন্ন; কিন্তু লক্ষ্য এক। সে লক্ষ্য হলো জনমনে ভীতি সৃষ্টি করা, বাংলাদেশ জঙ্গী অধ্যুষিত একথা প্রমাণ করা যা অন্তিমে বিনিয়োগে অভিঘাত হানবে। এভাবে চাপ সৃষ্টি করলে সরকার ‘বিরোধী’দের সঙ্গে আলোচনায় বসবে এবং নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। ইতোমধ্যে বিএনপি সর্বদলীয় আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে।

সরকারের মূল ভাষ্য, মানবতা বিরোধীদের বিচার বানচালের উদ্দেশ্যে একের পর এক খুন করছে বিএনপি-জামায়াত। তাহলে বিএনপি-জামায়াত নেতৃবৃন্দ যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের তথ্য প্রমাণ সহকারে গ্রেফতার করা হোক। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হোক। শেষোক্ত দাবি তো অনেক দিনের; কিন্তু তাতো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

॥ সাত ॥

বিশ্বজুড়ে ইসলামী জঙ্গীবাদের যে বিকাশ হচ্ছে তার প্রভাব বাংলাদেশের জঙ্গী সংগঠনগুলোর ওপর পড়বে না যেখানে জামায়াত প্রকাশ্য রাজনীতি করছে, তা কষ্টকল্পনা। কোন না কোনভাবে জঙ্গীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। পুলিশ কর্তৃক চার পাকিস্তানীসহ জামায়াত কর্মী গ্রেফতার এর প্রমাণ। মানবতাবিরোধী বিচারিক কার্যক্রম বানচাল করা তাদের কাছে এখন গৌণ ব্যাপার। কারণ এখন পাগলও বোঝে যে, শেখ হাসিনা বেঁচে থাকতে এই বিচারিক কার্যক্রম বানচাল করা যাবে না। দ- কার্যকর করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। তাদের মূল লক্ষ্য, শেখ হাসিনার জীবননাশ, দেশে আরও হত্যার মাধ্যমে আতঙ্ক ও অস্থির অবস্থার সৃষ্টি এবং শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন। সুতরাং সাকা চৌ-মুজাহিদের দ- কার্যকর হওয়ার পর জঙ্গী তৎপরতা বন্ধ হবে এটি বোধহয় সম্পূর্ণ সঠিক ধারণা নয়। আর বাংলাদেশে জঙ্গী আছে তা অস্বীকার করে কী লাভ? যেখানে জঙ্গী দমনের জন্য শেখ হাসিনা বিদেশে প্রশংসিত।

এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে এবং দৃঢ়ভাবে। কিন্তু তা কি হবে? শেখ হাসিনার নিষেধ সত্ত্বেও আঞ্চলিক নেতারা টাকার বিনিময়ে বা ভোট প্রাপ্তির আশায় বিএনপি-জামায়াতকে আশ্রয় দিচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে দেখা যাচ্ছে শিবির কর্মীর সংখ্যা বেশি। শোনা যায়, বিএনপি টাকা নেয়, কিন্তু টাকা খেয়ে আওয়ামী লীগ কর্মীকে চাকরি দেয় না। অন্যদিকে, সরকারী দলের নেতা টাকা খেয়েও আওয়ামী লীগ কর্মীকে চাকরি দেয় না। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত কর্মীকে দেয়। একথা সত্য হলে আমাদের বলার কিছু থাকে না। বরং তা আমাদের তাত্ত্বিক ফ্রেমের সঙ্গে মিলে যায়।

তোষণ করলে নৌকা ভোটে ভরে উঠবে এ দুরাশা। তা কখনও হবে না- একথা আওয়ামী নেতৃবৃন্দ মানতে চান না। শেখ হাসিনা বলেছেন, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। আর এত তোষণের পরও আহমদ শফি বলছেন, ধর্ম যার যার, উৎসবও তার তার।

‘শেখ হাসিনা চাইলে পারবেন না’ এমন কিছু নেই- একথা এখন অনেকেই বলেন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তার নেতৃত্ব অটুট রাখতে হলে সমান্তরাল কিছু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। সময়ের তাগিদে এখন জঙ্গী দমন অগ্রাধিকার পাবে। জঙ্গী দমনের জন্য সমন্বিত সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। এর অর্থ স্থিতাবস্থার অবসান। সে অবস্থা অবসানে বিভিন্নভাবে জঙ্গী সৃষ্টির পথ রুদ্ধ করা ও তোষণ নীতির পরিবর্তন আনা বাঞ্ছনীয়। এ ক্ষেত্রে সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের সমর্থন অবশ্যই পাবেন। সেজন্য তার নেতৃত্বে মানুষকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ একটি পদক্ষেপ নেয়া জরুরী। সরকারের সমালোচনা করা, যুক্তি স্থাপন স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে, সরকারের সঙ্গে সব বিষয়ে ঐকমত্য না হওয়া সরকার বিরোধিতা নয়, এ কথাটিও মনে রাখা বাঞ্ছনীয়।

সরকারের কাজ সরকার করবে। তার দায়-দায়িত্ব তাদের। শুধু সরকারের সমালোচনায় এ অবস্থার পরিবর্তন হবে না। আমাদেরও ঐক্যবদ্ধভাবে সাধারণের কাছে এ বার্তাটি উপস্থাপন করা প্রয়োজন যে, জঙ্গীবাদের উত্থান রাষ্ট্র বিনাশ করবে। অসাম্প্রদায়িকতাই আধুনিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। আর নীতিনির্ধারকদের কাছে অনুরোধ এই যে, শুধুমাত্র অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দিলে তা হবে ভঙ্গুর। বাংলাদেশের জিডিপি বাড়বেই। কিন্তু দেশে এ অবস্থা চলতে থাকলে অর্থনীতি বিপন্ন হবে। অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানসজগতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আধিপত্য কীভাবে বিস্তার করা যায় তার কৌশল প্রণয়ন করা।

১৯৭১ সালে আলবদররা টার্গেট করে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল যেন বাংলাদেশে আলো জ্বালানোর কেউ না থাকে। তাদের উত্তরসূরিরা আজ আবার বুদ্ধিজীবী ও তাদের সহযোগীদের [যেমন, প্রকাশক] হত্যার ষড়যন্ত্র করছে যেন যে আলো আবার জ্বলে উঠেছিল তা চিরতরে নিভিয়ে দেয়া যায়।

যুক্তি টিকে থেকেছে দেখেই সভ্যতা এগিয়েছে যা আগেই উল্লেখ করেছি। এই যুক্তির [মুক্তমনা] কারণেই হুমায়ুন আজাদ থেকে দীপন খুন হয়েছেন। তাদের খুনের বদলা নেয়া যাবে খুন দিয়ে নয়, সমাজে যুক্তির আধিপত্য বিস্তার করে। দীপনরা কী কারণে খুন হন তার পটভূমি বিশ্লেষণ করেছি। এই অবস্থাটার বদল না হলে আরও দীপন খুন হবেন। সে জন্য অবস্থাটা বদলানোর জন্য আমাদেরও ঐক্যবদ্ধভাবে পথে থাকা উচিত। যুক্তি সব সময় জিতেছে। এখনও জিতবে। কারণ, ইতিহাস যুক্তির পক্ষে, আমাদের পক্ষে।

সমাপ্ত