২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

সিলেট মুরারীচাঁদ কলেজের আরও স্মৃতি এবং ঢাকায় পাড়ি

(১৬ নবেম্বরের পর)

ঘিঞ্জি গলি বা উন্মুক্ত সড়ক সবখানেই হাঁটতে ভাল লাগত। রেললাইনের ওপর দিয়ে হাঁটাহাঁটি আমি খুব করতাম এবং ভাল লাগত। ঢাকার ঘোড়ার গাড়ি চালকের চাবুকাঘাতে যখন ঘোড়া দ্রুত চলতে থাকত তখন পথচারী হিসেবে ভয় লাগত, আরোহী হিসেবে খুব মজা লাগত। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন দেখে খুব দুঃখ লাগে। মনে হয় দৈন্য ও পরিসরে তা অতুলনীয়। ঠিক তেমনি কার্জন হল, ফজলুল হক হল, ঢাকা হল ও সলিমুল্লাহ্ হল দেখে খুব তৃপ্তি লাগে। ১৯৫২তে কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজ দেখে তেমন অভিভূত হইনি; তবে সিনেট বিল্ডিং-এর পিলার দেখে খুব ভাল লাগে। আরও কয়েক বছর পর এথেন্সে পারথেনান গিয়ে সিনেট ভবনের পিলারগুলোর কথা আবার মনে পড়ে। ওয়াইজঘাট ও সদরঘাটের ভিড় দেখে খুব খারাপ লাগে। বুড়িগঙ্গার তীরে বাঁধানো বাকল্যান্ড বাঁধের আকর্ষণটিই এত ভিড়ে বিনষ্ট হয়ে যায়। বাবুবাজার থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ইসলামপুর রোডের বাজার এবং বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত পাটুয়াটুলির বাজার ও দোকানপাট দেখে মনে হলো যে, মহানগরে এসেছি বটে। রেললাইন যেন পুরনো ঢাকা ও রমনার ঢাকাকে দুই স্বতন্ত্র ভাগে ভাগ করে রেখেছিল। পুরনো ঢাকায় যত ভিড়, স্বল্প পরিসর রাস্তাঘাট, ঘিঞ্জি গলি, দোকানপাট ইত্যাদি। আর নতুন ঢাকায় সুদৃশ্য দালান, সবুজের মহাসমারোহ ও নিভৃত সুপরিসর সড়ক এবং বৃহৎ এলাকাজুড়ে রেসকোর্স। তখনও আজিমপুরে বড় বসতি গড়ে ওঠেনি; বেইলি, হেয়ার, মিন্টো রোডে বৃহৎ এলাকাজুড়ে বড় বড় লাল বাড়ি ছাড়া আর স্থাপনা সীমিত। পুরনা পল্টনে তখন উন্মুক্ত খেলার মাঠ, গুলিস্তান এলাকা গড়ে ওঠেনি, স্টেডিয়ামেরও চিহ্ন নেই। শান্তিনগর এলাকায় জনবসতি নেই বললেই চলে। নটর ডেম কলেজ সদরঘাটে সেইন্ট গ্রেগরী স্কুল নামেই পরিচিত। বিমানপোত ছিল তেজগাঁয়েই, তবে গমনযোগ্য রাস্তা ছিল অলিগলি দিয়ে কারওয়ান বাজার হয়ে। দক্ষিণের সারা এলাকা খালি, ধানম-ি, গ্রীন রোড, মোহাম্মদপুর এলাকা ছিল সামান্য জনবসতির গ্রাম বিশেষ।

ঢাকায় আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে আমরা বড় একটা বেড়াতে যাইনি। একমাত্র পূর্ববাংলা সচিবালয়ের (ইডেন বিল্ডিংস) কাছে নবাব আবদুল গনি রোডে যেতাম মন্ত্রী আবদুল হামিদের বাড়িতে। আগেই বলেছি যে, আবদুল হামিদ ছিলেন আমার আব্বার বড় মামা এবং দাদার বেশ কাছের লোক। হামিদ সাহেব ১৯১৬ সালে ওকালতি শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। কি কারণে জানি না তিনি যথাসময়ে বিয়ে করেননি। তাই ধারণা ছিল যে, তিনি চিরকুমারই থাকবেন। আসাম ব্যবস্থাপক পরিষদের প্রথমে সভাপতি ও পরে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি উচ্চপদে আসীন ছিলেন ১৯২৫ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত। কলকাতায় তিনি দাদা পীরের (মাওলানা সাফিউল্লাহ) মুরিদ ছিলেন। তিনি ১৯৩৪ সালে তাকে নির্দেশ দিলেন তার বিয়ে করা দরকার এবং তিনি পাত্রীও ঠিক করে দিলেন। পাত্রী ছিলেন তার আর এক প্রিয় মুরিদের কন্যা বেগম জামাল আরা। ১৯৩৪ সালে আবদুল হামিদ বিয়ে করেন। তখন তার বয়স ৪৮ এবং তার স্ত্রীর বয়স মাত্র ১৯। ১৯৪২ সালে তার স্ত্রী অল্পবয়স্ক দুই ছেলে ও তিন মেয়ে রেখে মৃত্যুবরণ করেন। হামিদ দাদার বাসায় তার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে অনেকদিন পর দেখা হলো। সেখানে পরিচয় হলো আর এক দাদার সঙ্গে। হামিদ সাহেবের চাচাতো ভাই কলকাতা নিবাসী আবদুর রসুলের সঙ্গে। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা সবই হয় কলকাতায় এবং কোনদিন তিনি সিলেটে যাননি। জয়নাগ রোডে গেলাম আব্বার সহপাঠী ও বন্ধু এ্যাডভোকেট আশরাফ উদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে। তার উত্তরাধিকারীদের কেউ কেউ এখনও ওখানেই লালবাগের প্রতিবেশী হিসেবে বিরাজ করছেন। তার ছেলে নাজেম আহমদ চৌধুরী আমার সামান্য জুনিয়র ছিল এবং চাকরি জীবনে ছিল আমার সহকর্মী ও প্রিয় জুনিয়রের মধ্যে অন্যতম। সে এখন আমেরিকার ভার্জিনিয়ায় থাকে এবং আমার সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রয়েছে।

ঢাকার দর্শনীয় জায়গা প্রায় সবই দেখা হলো। বাদ গেল শুধু বলধা বাগান। কারণ সেটা তখন তেমন পরিচিত ছিল না। নিউমার্কেট কিন্তু তখন ছিলই না। এটা নির্মিত হয় ১৯৫৩ সালে এবং সেখানে দোকানপাট বসে আরও প্রায় বছরখানেক পর। বইয়ের দোকান ছিল, অতি উত্তম ঙৎরবহঃ খড়হমসধহ’ং, কেন্দ্রীয় কারাগারের সামান্য দূরে এবং বংশালের ওয়ার্সি বুক সেন্টার। তাছাড়া বইয়ের বাজার বিশেষ করে পাঠ্যবইয়ের বাজার ছিল এখানও সেটা যেখানে আছে সেই সদরঘাটে। সিনেমা হাউস ছিল সদরঘাটে রূপমহল, ওয়াইজঘাটে মায়া, বংশালে নিশাত, সদরঘাটে জনসন রোডে মুকুল, আরমানিটোলায় নিউ পিকচার হাউস, পল্টন ময়দানের কোণে ব্রিটানিয়া।

বাজারে তখনও ভারতীয় ও বিলেতী পণ্যের অবাধ ব্যবসা অব্যাহত। ঢাকায় বেশ ভাল লাগত প্রতি সকাল বেলা ঠেলাগাড়ি ভরা সবজি ও গোশতের যাতায়াত। বিভিন্ন এলাকার কাঁচাবাজারে সেগুলো সকালেই বা ভোররাতে সরবরাহ হতো। সহজেই বোঝা যেত যে, ঢাকার চারপাশে জমিজমা ছিল উর্বর এবং সবজি উৎপাদনে এখানে খুব মনোযোগ দেয়া হতো।

চলবে...