১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিপন্ন বিশ্ব

পৃথিবী আজ বিপন্ন। মানব সভ্যতা আজ রীতিমতো হুমকির মুখে। মানবতা বর্তমানে সন্ত্রাস কবলিত। এর শেষ কোথায়, কিংবা পরিণতি কী, সেটা ভাবলেও শিউরে ওঠে মন-প্রাণ। বিশ্বের কোথাও মানুষ বুঝি আজ আর নিরাপদ নয়। গত শুক্রবার রাতের প্রথম প্রহরে বিশ্বের মনোরম ও সুন্দরতম নগরী হিসেবে খ্যাত প্যারিস যেভাবে জঙ্গী সন্ত্রাসীদের উপর্যুপরি বোমা হামলা ও গোলাগুলিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে, তা ভয়ঙ্কর, নজিরবিহীন, মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। অন্তত ছয়টি স্থানে প্রায় একই কায়দায় ভয়াবহ জঙ্গী হামলায় ১৩২ জন মানুষের তাৎক্ষণিক মৃত্যু এবং বিপুল সংখ্যক আহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির সম্যক গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য যথেষ্ট। সত্য বটে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ ও মারাত্মক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ফ্রান্সে। এর আগে ৭ জানুয়ারি প্যারিসে ব্যঙ্গ পত্রিকা শার্লি এবদো কার্যালয়ে জঙ্গী হামলায় ১১ জন নিহত হন। চলতি শতকে ইউরোপে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হামলা। ইতোপূর্বে ২০০৪ সালে স্পেনের মাদ্রিদে ট্রেনে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছিলেন ১৯১ জন। এর বাইরেও বিভিন্ন সময়ে হামলা হয়েছে নরওয়ে, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও তুরস্কে। প্যারিসে সংঘটিত ঘটনার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন আইএস দায়দায়িত্ব স্বীকার করে এক ভিডিও বার্তা প্রচার করে এবং আরও হামলার হুমকি দেয়। ফরাসী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদও ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) দায়ী করে বলেছেন, হামলার জবাব দেয়া হবে নির্মমভাবে। এর পাশাপাশি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারও করেন তিনি। উল্লেখ্য, ফ্রান্স আইএসবিরোধী কোয়ালিশনের একটি শরিক দেশ। দেশটিতে ইউরোপের মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক মুসলিম, প্রায় দশ শতাংশ বসবাস করেন।

ঘটনার পরপরই জাতিসংঘের মহাসচিব, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী, জার্মানির চ্যান্সেলর, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট, ভারতের প্রধানমন্ত্রী, ইরানের প্রেসিডেন্ট, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী, জাপানের প্রধানমন্ত্রী, পোপ ফ্রান্সিসসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ প্যারিসের ঘটনাকে অমানবিক, ভয়াবহ ও বেদনাদায়ক বলে অভিহিত করে ফ্রান্সের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করেন। প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেন, কেবল ফ্রান্সের জনগণের ওপর নয়; বরং সমগ্র মানবতা ও সর্বজনীন মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এই আক্রমণ। যে কোন মূল্যে একে প্রতিহত করতে হবে।

সার্বিক অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, পৃথিবী বুঝি আরও একটি বিশ্বযুদ্ধের প্রায় মুখোমুখি। আফগানিস্তানে একদা সোভিয়েত আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য সরাসরি মার্কিন মদদে যে মুজাহিদীন বাহিনীর সূত্রপাত; সেই বিষবৃক্ষই কালক্রমে তালেবান, আল কায়েদা, আল শাবাব, বোকো হারাম ইত্যাদি নানা নামে ডালপালা ছড়িয়ে চূড়ান্ত পরিণামে রূপ নেয় আইএস নামের ভয়ঙ্কর মহীরুহে। জিহাদের নামে এরা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে জঙ্গী নেটওয়ার্ক ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম। আইএসের পক্ষ থেকে এক টুইট বার্তায় অচিরেই রোম, লন্ডন এবং ওয়াশিংটনে হামলার হুমকি দেয়া হয়েছে । বিশ্বের সব প্রধান শহর ও রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, যার আওতায় রয়েছে বাংলাদেশও। এই পরিস্থিতিতেই ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গী গ্রুপ ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) কঠোর হস্তে মোকাবেলা করা বিশ্ববিবেকের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইএস নামের ভয়াবহ ‘বিষফোঁড়া’ তথা দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে যে কোন মূল্যে সারিয়ে তুলতে হবে পৃথিবীকে। তা না হলে বিশ্ববিবেক ও মানবতা মুক্তি পাবে না, মিলবে না শান্তির সুবাতাস।