১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাংস্কৃতিক জাগরণের পক্ষে তারুণ্য

  • অঞ্জন আচার্য

বিধান রিবেরু

লেখক, সাংবাদিক

রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে অন্যতম হলো মানুষকে স্বাধীনতা দেয়া ও তাদের নিরাপত্তা বিধান করা। সেই বিচারে মানুষ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করবে, ঘরে ও বাইরে সব জায়গায় নিরাপদে চলাফেরা করবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গত কয়েক বছরে শুধু সাংবাদিক, লেখক, ব্লগার, প্রকাশক, সাবেক সরকারী কর্মকর্তা নন; দায়িত্বরত সশস্ত্র পুলিশও খুন হয়েছেন, যখন তখন, প্রকাশ্যে। আর হামলা, ছিনতাই, রাহাজানি তো চলছেই। পুলিশের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠছে সন্দেহভাজনদের আটকের নামে তারা অর্থ আদায় করছে। উপায়হীন সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?

আরও একটি প্রশ্ন, যারা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার কথা তুলছেন তাদের প্রতি, অনুভূতি কি শুধু ধর্মীয় হয়? ওয়াজ মাহফিলে নারীদের উদ্দেশ করে ‘তেঁতুল’ হুজুররা যা বলছেন, সেটা কি কারও অনুভূতিতে আঘাত দেয় না? এই দুই ধরনের ‘আঘাত’-ই আমাদের বন্ধ করতে হবে। পরমত সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি না করতে পারলে, একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হতে পারলে, আমরা পাল্টাপাল্টি আঘাত করতেই থাকব। একজন কলম দিয়ে, অন্যজন তলোয়ার দিয়ে। আর ফাঁক বুঝে বাইরের তৃতীয় শক্তি ফায়দা লোটার চেষ্টা করবে। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়ার কথা ভুলে গেলে চলবে না। তাই সরকারের উচিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। দলীয় যেসব ক্যাডাররা সামাজিক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত তাদের নির্মূল করা। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের ভালবাসা অর্জন করা। এখানে আপনি কিউবা বা ভেনেজুয়েলাকে উদাহরণ হিসেবে নিতে পারেন। শত ষড়যন্ত্রের পরও মানুষের আস্থার কারণে সেসব দেশে শান্তি বিনষ্ট হয়নি। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে তার পরিণতি ভয়াবহ হয়- এই সত্য কারো অজানা নয়।

তানজীনা ইয়াসমিন

লেখক, কলামিস্ট

মুক্তমত প্রকাশের ওপর আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় প্রথমেই বলতে চাই ‘ব্লগার মানেই নাস্তিক’ এবং ‘ধর্মানুভূতিতে আঘাত’-এর কারণে এসব হত্যাকা- ঘটছে বলে এখনও যারা বিশ্বাস করেন, তারা আপদমস্তক ঘোর তমাসায় আছেন। এসব হত্যাকা-ে পর্দার আড়ালে আছে জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ; দেশী-বিদেশী মদদপুষ্টতার তর্কে যাওয়া এখন বাতুলতা। বিদেশী নাগরিক হত্যাকা-ের মাধ্যমে বহির্বিশ্বের কাছে ভাবমূর্তি ক্ষুণœ (অথবা মদদদাতা রাষ্ট্রের অনুক্রম পূরণ), আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর ওপর উপর্যুপরি আক্রমণে জনমনে আতঙ্ক, ক্ষোভের শেষ গজাল ঠোকা- এসবের গোড়া একই। সরকার পতনের আগ্রাসন। এবং এ সকল ঘটনায় সরকারের উপযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার এবং বিচার তৎপরতায় ব্যর্থতা সরকারের ইচ্ছা এবং ক্ষমতা দুইই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সকল অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। প্রথিতজনেরা ’৭১, ’৭৫-এর পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছেন। এর সরল কারণ- যেজন্যে বাংলাদেশকে ’৭৫ দেখতে হয়েছিল, সেই একই প্রশাসনিক ব্যর্থতার পুনরুত্থান ঘটেছে। যে কোন ঘটনায় সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সুবিধা লোটার অপচেষ্টা চলছে। একজন আইজিপির কাছে জনগণ পুলিশ বাহিনীর সুসংগঠন আশা করে, তাদের নৈতিকতার যে অবক্ষয়ে দু’জন চাপাতিওয়ালার ভয়ে আক্রান্ত সহকর্মীকে ফেলে তিনজন সশস্ত্র সহকর্মী ক্ষেতে লুকায়- সেই মর্মমূলে কাজ করার প্রত্যয় আশা করে; রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়। সরকার মহোদয়কে অতিসত্বর প্রশাসনের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য আনতেই হবে। নইলে ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস ফেলছে আরেকটি ’৭৫ এবং আজকের মতো সেদিনও তথাকথিত সুবিধাভোগীদের কাছে সেটি আরেকটি ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ই প্রতীয়মান হবে।

জুয়েইরিযাহ মউ

লেখক, সাংস্কৃতিককর্মী

‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’- শব্দযুগল প্রকৃতপক্ষে একটি ব্যাপক আর বিস্তৃত পরিসর নিয়ে আলোচনার বিষয়। এটা নিয়ে যদি কথা বলতে চাই তবে প্রথমেই বিশ্লেষণ করা দরকার কোন্ ধরনের মত প্রকাশের স্বাধীনতা চাইতে হচ্ছে যে স্বাধীনতা দেয়া হচ্ছে না বা বিঘিœত হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এটা কিন্তু স্পষ্ট, বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সমাজে সব ধরনের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় কিন্তু বাধা আসছে না। কেননা আইনত অবৈধ অনেক বিষয়ের পক্ষেও ‘ফতোয়া’ দেয়া হচ্ছে এবং লক্ষণীয় সেগুলোর বিপরীতে প্রতিবাদ চলছে।

একটা দীর্ঘ সময় আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ে সুস্থ কোন চর্চা করতে পারিনি। পুরো একটা প্রজন্ম গড়ে উঠেছে এসব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে। শুধুমাত্র পারিবারিকভাবে বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে যারা সচেতন থাকার শিক্ষাটুকু পেয়েছেন তারাই চর্চা করে গেছেন।

যখন একটা সমাজে অধিকাংশ মানুষ মত প্রকাশের স্বাধীনতার ব্যাপারেই সচেতন নয় কিংবা অধিকাংশ কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বাধীনতাকে রয়ে-সয়ে ছাড় দিতে আগ্রহী তখন সামগ্রিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতা হুমকির সম্মুখীন হওয়াটাই স্বাভাবিক। তার ওপর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ যখন ‘হত্যা’র মতো ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে আর সরকার তাতে দিনের পর দিন নিষ্ক্রিয় অবস্থানে আছে। মূলত মানুষকেই যথার্থভাবে জানাতে হবে তার নিজ ধর্ম তাকে কি বলে আর আদতেও ‘বিশ্বাস’ এতটাও ঠুনকো হওয়াটা নিজের জন্যই অসম্মানজনক কী না? প্রশ্ন হলো- যারা মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আজ কথা বলতে চাইছে তারা কতটা সংগঠিত এবং একত্র? কেননা এটা তো এখন সুস্পষ্ট যে, যারা মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাইছে তারা বেশ সুসংগঠিত।

ফকির ইলিয়াস

কবি ও কলামিস্ট

বাংলাদেশ এখন নানা কারণেই বিশ্বে শিরোনাম। অন্যতম কারণ মুক্তচিন্তার কণ্ঠরোধে একটি কালোশক্তির উত্থান। কেন এমন হচ্ছে? কারা করছে এসব? বাংলাদেশে বহুল আলোচিত রাজন ও রাকিব হত্যার রায় দেয়া হয়েছে। এই রায় দেয়া হয়েছে খুব দ্রুত। রাজন হত্যা মামলায় চার জন ও রাকিব হত্যা মামলায় দু’জনের ফাঁসি দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে- এমন দ্রুত বিচার করা সম্ভব। দেশের বিচারব্যবস্থা দ্বারা এটা করা যায়। বাংলাদেশ ঐশীকে ফাঁসির রায় দিয়েছে। ভারত থেকে নূর হোসেনকে ফিরিয়ে এনেছে। তাহলে পারছে না- এটা বলা যাবে না। কিন্তু শাহ এএমএস কিবরিয়া, হুমায়ুন আজাদ, রাজীব হায়দার, অভিজিত রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাশ, নীলাদ্রী চট্টোপাধ্যায় (নিলয় নীল), ফয়সাল আরেফিন দীপন এদের হত্যাকারীদের ধরা হচ্ছে না কেন? অথবা বিচার শেষ করা হচ্ছে না কেন? এর নেপথ্যে কারণ কি? না- এমন হত্যাকা- দেখার জন্য তো এই দেশ স্বাধীন হয়নি? আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল, রণদীপম বসু, তারেক রহিম- এদের যারা কোপালো তাদের কি ধরা গেছে? না, যায়নি? কেন যায়নি?

এদিকে লেখালেখির ক্ষেত্রে সরকারের কোন বিধি-নিষেধ না থাকার কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেছেন, ‘লেখালেখি বন্ধ করতে বলা হয়নি, লেখালেখিতে সতর্ক করা হয়নি। লেখালেখিতে সতর্ক হওয়া আর কিছুই না, কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না দিয়ে যেন লেখালেখি হয়।’

এখানে আমার একটি প্রশ্ন আছে। ড. আনিসুজ্জামান, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ আরও কয়েকজনকে তাহলে কেন হুমকি দেয়া হলো? বিষয়টা অন্যখানে। ‘ব্লগার’ হত্যায় পার পেয়ে গেলেই এরা মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের বুদ্ধিজীবীদের আক্রমণ করবে। এটাই তাদের ঠিকঠাক করা মতলব। কারণ এরা মূলত একাত্তরের পরাজয়ের শোধ নেবার জন্যই মাঠে আছে। এদের প্রতিহত করতে হলে বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক ঐক্যবদ্ধ জাগরণ ঘটাতে হবে। প্রজন্মকে আগুয়ান হতে হবে একাত্তরের চেতনায়।

শায়লা শারমিন ঈশিতা

শিক্ষার্থী

চরম সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ। চলছে ভয়াবহ সিরিজ হত্যা। বরাবরের মতো হত্যা সংঘটনের কিছুদিন উত্তেজনা থাকে এবং ধীরে ধীরে নৃশংসতার এক ভয়াবহ গল্প হারিয়ে যেতে থাকে। কাছের মানুষগুলো শুধু ভয়ে বেদনায় কষ্টে নীল থাকে। নিজেদের ওপর ঝামেলা এসে না পড়লে কেন যেন আমরা কোন কিছুতেই জড়াতে চাই না। আর এভাবেই নিজেদের হয়ত গভীর অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছি। এই জনবহুল দেশে আর যা কিছুরই অভাব থাকুক, সমস্যার কোন কমতি নেই। তারপরও আমাদের ভাল থাকার চেষ্টা করে যাওয়া। এই সব হত্যাকারী আসলে কি চাচ্ছে? তারা কি কোন সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করেছে? তারা কি কোন মানুষের সাহায্যার্থে এগিয়ে যাবার গল্প শোনাতে পারে? তারা কি কখনও জনসংখ্যা সমস্যার সমাধান কী হতে পারে তা নিয়ে ভাবে? ট্রাফিক জ্যাম কিভাবে এড়ানো যায়- এই ব্যাপারে কোন উদ্যোগ কি আছে তাদের? শিশুমৃত্যুর হার নিয়ে কোন কাজ বা শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কিছু করেছে? যৌন নিপীড়ন ঠেকাতে কোন ক্যাম্পেন করছে? এমন হাজারো প্রশ্ন আসে- যার উত্তর হবে ‘না’। তারা একটি তালিকা বড় করছে, মৃত্যু-তালিকা। বরেণ্য ব্যক্তি, সাধারণ লেখক, এমনকি প্রকাশক- কেউ মুক্তি পাচ্ছে না তাদের হাত থেকে। আর আমরা চুপ করে আছি। ব্যাপারটা এমন হচ্ছে, তারা যা ঠিক করে দেবে লেখক তাই লিখবেন। তারা যা ঠিক করে দেবে পাঠক তাই পড়বে। তারা যা ঠিক করে দেবে দৃষ্টি দিয়ে শুধু তাই দেখা যাবে। এসব হত্যাকারী মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করছে না, ঘুষ নির্মূলে কাজ করছে না, দারিদ্র্য নির্মূলে কাজ করছে না। তারা যা করছে, তা হলো নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের এক ভয়াবহ চেষ্টা। কোনভাবেই তাদের এই প্রচেষ্টা সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। সরকারের একান্ত সহযোগিতায় রাজন, রাকিব যোগ্য বিচার পেয়েছে। সরকারের সদিচ্ছাই পারে এমন ভয়াবহ নিকৃষ্ট এক অধ্যায়ের ইতি ঘটাতে।